ইসরায়েলকে কালো তালিকাভুক্ত করল জাতিসংঘ: ক্ষোভে উত্তাল তেল আবিব, মহাসচিবের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন

ইসরায়েলকে কালো তালিকাভুক্ত করল জাতিসংঘ: ক্ষোভে উত্তাল তেল আবিব, মহাসচিবের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ

​জাতিসংঘের ঐতিহাসিক চড়: এবার যৌন সহিংসতার দায়ে ইসরায়েলকে ‘কালো তালিকাভুক্ত’ করল বিশ্ব সংস্থা, ইহুদিবিদ্বেষী ও ভণ্ড বলে ক্ষোভে ফেটে পড়লেন বেনি গান্টজ, মহাসচিব গুতেরেসের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন তেল আবিবের

​মধ্যপ্রাচ্যের গাজা উপত্যকায় দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিকদের ওপর বর্বরোচিত আগ্রাসনের জেরে বিশ্বমঞ্চে আবারও বড় ধরনের কূটনৈতিক ও নৈতিক ধাক্কা খেল ইসরায়েল। সংঘাতপূর্ণ ও যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকায় ভয়াবহ যৌন সহিংসতার দায়ে এবার দখলদার ইসরায়েলি বিভিন্ন সংস্থাকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘কালো তালিকাভুক্ত’ (Blacklist) করেছে জাতিসংঘ (UN)। বৈশ্বিক এই শীর্ষ সংস্থার বার্ষিক প্রতিবেদনে ইসরায়েলের নাম এই লজ্জাজনক তালিকায় যুক্ত হওয়ার পর বিশ্ব রাজনীতিতে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে ইসরায়েলি কারাগারগুলোতে ফিলিস্তিনি বন্দীদের ওপর পদ্ধতিগত নির্যাতন ও যৌন নিপীড়নের ভূরি ভূরি প্রমাণ সামনে আসার পরেই জাতিসংঘ এই কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।  

​এদিকে জাতিসংঘের এই ঐতিহাসিক ও নজিরবিহীন সিদ্ধান্তের খবরটি প্রকাশ্যে আসার পর ইসরায়েলের রাজনৈতিক, সামরিক এবং কূটনৈতিক মহলে তীব্র ক্ষোভ, হতাশা ও চরম প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। তেল আবিব এই সিদ্ধান্তকে সম্পূর্ণ ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ এবং ‘বাস্তবতা বিবর্জিত’ বলে আখ্যায়িত করেছে। ক্ষোভের চরম বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে ইসরায়েল সরকার জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এবং তাঁর কার্যালয়ের সাথে সমস্ত কূটনৈতিক সম্পর্ক তাৎক্ষণিকভাবে ছিন্ন করার ঘোষণা দিয়েছে, যা দুই পক্ষের মধ্যকার বৈরিতাকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে গেল।  

​কেন কালো তালিকায় ইসরায়েল? ঘটনার নেপথ্য কারণ ও মূল সময়রেখা

​আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল জাজিরা ও দ্য জেরুজালেম পোস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংঘাতপূর্ণ এলাকায় যুদ্ধকালীন যৌন সহিংসতার দায়ে অভিযুক্ত দেশ এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বার্ষিক তালিকায় এবার যুক্ত হয়েছে ইসরায়েলি সংস্থাগুলোর নাম। বিশেষ করে, তালিকায় নির্দিষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে ইসরায়েলি কারা কর্তৃপক্ষ বা প্রিজন সার্ভিসকে (Israeli Prison Service)। এছাড়া দেশটির সামরিক বাহিনীর আরও কয়েকটি সংস্থাকে কঠোর নজরদারির (Monitoring Framework) আওতায় রাখা হয়েছে, যাদেরকেও আগামীতে এই তালিকায় চূড়ান্তভাবে যুক্ত করা হতে পারে।  

পুরো ঘটনার ধারাবাহিক সময়রেখা (Timeline) নিচে সাধারণ টেক্সট আকারে দেওয়া হলো:

  • ​২০২৩ সালের অক্টোবর: গাজায় ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরু এবং ফিলিস্তিনি বন্দীদের আটকের হার বৃদ্ধি।  
  • ​২০২৫ সালের আগস্ট: হামাস ও অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সংঘাতকালীন যৌন সহিংসতার অভিযোগে জাতিসংঘের এই তালিকায় প্রথম যুক্ত করা হয়।  
  • ২০২৬ সালের মে মাসের মাঝামাঝি: নিউইয়র্ক টাইমসসহ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ইসরায়েলি ডিটেনশন সেন্টারগুলোতে ফিলিস্তিনিদের ওপর চালানো ব্যাপক যৌন নির্যাতন, ধর্ষণ ও অমানবিক আচরণের সচিত্র তথ্যচিত্র প্রকাশ।  
  • ​২৮ মে (বৃহস্পতিবার): জাতিসংঘ কর্তৃক ইসরায়েলি কারা কর্তৃপক্ষসহ বিভিন্ন সংস্থাকে আনুষ্ঠানিকভাবে যৌন সহিংসতার বিশ্ব কালো তালিকায় অন্তর্ভুক্তি।  
  • ​২৮ মে (বৃহস্পতিবার) রাতে: ক্ষুব্ধ ইসরায়েল সরকারের পক্ষ থেকে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের কার্যালয়ের সাথে সমস্ত আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক বর্জনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা।  

'এটি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত' — জাতিসংঘে ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূতের দাবি

​জাতিসংঘের এই সিদ্ধান্তটি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন জাতিসংঘে নিযুক্ত ইসরায়েলের স্থায়ী রাষ্ট্রদূত ড্যানি দানন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক অত্যন্ত কড়া ও আক্রমণাত্মক পোস্টে তিনি এই পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা জানান। দানন অভিযোগ করে বলেন, "ইসরায়েলকে এই কালো তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে জাতিসংঘ একটি চরম নোংরা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা মাঠপর্যায়ের মূল তথ্য এবং বাস্তব সত্য থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। আমরা এই বানোয়াট প্রতিবেদনের জবাব দিতে এবং আমাদের অবস্থান পরিষ্কার করতে জাতিসংঘের কাছে সমস্ত অকাট্য তথ্য ও প্রমাণ জমা দিয়েছিলাম। কিন্তু মহাসচিব উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তা এড়িয়ে গেছেন।"  

আরও পড়ুন: ওমানকে উড়িয়ে দেওয়ার হুমকি ট্রাম্পের: মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধাবস্থা, হরমুজ প্রণালি নিয়ে চরম উত্তেজনা

ওমানকে উড়িয়ে দেওয়ার হুমকি ট্রাম্পের: মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধাবস্থা, হরমুজ প্রণালি নিয়ে চরম উত্তেজনা

​তিনি আরও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "যে জাতিসংঘ ইসরায়েলকে হামাস, আইএসআইএস (ISIS) কিংবা বিশ্বের সবচেয়ে জঘন্যতম সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর সাথে একই কাতারে এনে দাঁড় করায়, সেই সংস্থার কোনো নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা বা বিশ্বস্ততা অবশিষ্ট নেই। এটি জাতিসংঘের ইতিহাসের একটি অন্যতম কালো অধ্যায় এবং চরম নৈতিক স্খলন।"  

​'জাতিসংঘ একটি ইহুদিবিদ্বেষী ও ভণ্ড প্রতিষ্ঠান' — বেনি গান্টজের তোপ

​জাতিসংঘের এই বিশ্বজনীন চপেটাঘাত সহ্য করতে না পেরে ইসরায়েলের প্রভাবশালী রাজনীতিক, যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভার সাবেক সদস্য এবং সাবেক সেনাপ্রধান বেনি গান্টজ অত্যন্ত আপত্তিকর ভাষা ব্যবহার করে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। তিনি এক বিবৃতিতে বলেন:  

​"জাতিসংঘ এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বিশ্বমঞ্চে আবারও প্রমাণ করল যে, এটি মূলত একটি ইহুদিবিদ্বেষী (Antisemitic), দুর্নীতিগ্রস্ত এবং ভণ্ড প্রতিষ্ঠান। এই সংস্থাটি দীর্ঘদিন ধরে ভয়াবহ রকমের নৈতিক অন্ধত্বে ভুগছে। আইডিএফ (ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী) এবং স্বাধীন ইসরায়েল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে জাতিসংঘের এই ধরণের মিথ্যা অপবাদ, কুৎসা ও নোংরা প্রচারণা আমাদের আত্মরক্ষার পথ থেকে কখনোই বিচ্যুত করতে পারবে না।"

  

​একই সুর মেলালেন জাতিসংঘে নিযুক্ত ইসরায়েলের সাবেক রাষ্ট্রদূত গিলাদ এরদানও। তিনি বলেন, জাতিসংঘ একটি সম্পূর্ণ বিকৃত ও ক্ষয়িষ্ণু প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে, যাদের কাছ থেকে কোনো ধরণের নিরপেক্ষতা আশা করা বোকামি। তবে এরদান স্বীকার করেছেন যে, এই কালো তালিকাভুক্তির ফলে বিশ্বজুড়ে ইসরায়েলের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং এই কূটনৈতিক ক্ষতি মোকাবিলায় ইসরায়েল সরকারকে বৈশ্বিক যোগাযোগ বাড়াতে হবে।  

ফিলিস্তিনিদের ওপর যৌন নির্যাতন ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর রিপোর্ট

​আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা এবং খোদ জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধিদের অনুসন্ধান অনুযায়ী, গাজায় পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিক ও বন্দীদের ওপর ইসরায়েলি বাহিনীর যৌন নির্যাতন, লাঞ্ছনা ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার অভিযোগ জ্যামিতিক হারে বেড়েছে।  

আন্তর্জাতিক রিপোর্টের তথ্যাদি নিচে তুলে ধরা হলো:

  • ​কারাগারে অমানবিক নির্যাতন: ইসরায়েলের নেগেভ মরুভূমি ও অন্যান্য ডিটেনশন সেন্টারে হাজার হাজার ফিলিস্তিনিকে নগ্ন করে রাখা, চোখে পট্টি বেঁধে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মারধর এবং গুরুতর যৌন নিপীড়নের শত শত প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগীর জবানবন্দি নথিবদ্ধ করা হয়েছে।  
  • ​নারী ও চিকিৎসকদের লাঞ্ছনা: গাজার বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া ফিলিস্তিনি নারী, এতিম শিশু, মানবাধিকার কর্মী এবং চিকিৎসকদের ওপরও ইসরায়েলি গোয়েন্দা ও রক্ষীরা ভয়াবহ মানসিক ও শারীরিক যৌন হয়রানি চালিয়েছে বলে জাতিসংঘের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।  
  • ​সমতার নীতি বা সিমেট্রি: এর আগে ২০১৫ সালে হওয়া সংঘর্ষের প্রেক্ষিতে এবং পরবর্তীতে ২৫ সালের আগস্টে হামাসকে এই তালিকায় নেওয়া হয়েছিল। এবার ইসরায়েলকেও অন্তর্ভুক্ত করায় আন্তর্জাতিক আইনের নিরপেক্ষতা বজায় থাকল বলে মনে করছেন বিশ্ব মানবাধিকার কর্মীরা।  

​উপসংহার

​জাতিসংঘের পক্ষ থেকে ইসরায়েলকে যুদ্ধকালীন যৌন সহিংসতার কালো তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা বৈশ্বিক মানবাধিকার রক্ষার লড়াইয়ে একটি বড় মাইলফলক। তেল আবিব যতই একে ইহুদিবিদ্বেষ বা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বলে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করুক না কেন, আন্তর্জাতিক মহলে তাদের অপরাধের মাত্রা যে আড়াল করা যাচ্ছে না—জাতিসংঘের এই পদক্ষেপই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। ইসরায়েল কর্তৃক জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত কেবল তাদের একগুঁয়েমি ও আন্তর্জাতিক রীতিনীতির প্রতি অবজ্ঞাকেই ফুটিয়ে তোলে। বিশ্ব সম্প্রদায়ের এখন উচিত কেবল তালিকাভুক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে, গাজা ও ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে চলমান এই বর্বরোচিত যুদ্ধাপরাধ বন্ধে ইসরায়েলের ওপর কঠোর অর্থনৈতিক ও সামরিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা।

 

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন