ওমানকে উড়িয়ে দেওয়ার হুমকি ট্রাম্পের: মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধাবস্থা, হরমুজ প্রণালি নিয়ে চরম উত্তেজনা

ওমানকে উড়িয়ে দেওয়ার হুমকি ট্রাম্পের: মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধাবস্থা, হরমুজ প্রণালি নিয়ে চরম উত্তেজনা

 আন্তর্জাতিক ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ

তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের পদধ্বনি? এবার ওমানকে ‘উড়িয়ে দেওয়ার’ নগ্ন হুমকি দিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে রণপ্রস্তুতি, কাঁপছে বিশ্ব অর্থনীতি

​যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল বনাম ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত ভূ-রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক নৌপথগুলো চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। এই চলমান বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেই এবার ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের অন্যতম প্রধান শান্তিকামী দেশ ওমানকে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে ‘উড়িয়ে দেওয়ার’ নড়বড়ে ও চরম উসকানিমূলক হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ওয়াশিংটনে হোয়াইট হাউজে আয়োজিত মন্ত্রিসভার এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে ট্রাম্প অত্যন্ত কঠোর ভাষায় বলেন, ওমানকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাথে ‘ভদ্র আচরণ’ করতে হবে, অন্যথায় ওয়াশিংটন তাদের বিরুদ্ধে এমন কঠোর সামরিক ব্যবস্থা নেবে যা তারা কল্পনাও করতে পারবে না।

​বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ রুট "হরমুজ প্রণালি" পুনরায় উন্মুক্ত করার জন্য যখন আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা ও আলোচনা চলছে, ঠিক তখনই মার্কিন প্রেসিডেন্টের এমন যুদ্ধংদেহী মন্তব্য পুরো মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্ব রাজনীতিতে এক নতুন আগুনে ঘি ঢেলে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো ট্রাম্পের এই বক্তব্যকে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক আগ্রাসনের হুমকি হিসেবে দেখছে, যা আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন।

আরও পড়ুন: শাহজাদপুরে উৎসবমুখর পরিবেশে পবিত্র ঈদুল আযহা উদযাপিত

শাহজাদপুরে উৎসবমুখর পরিবেশে পবিত্র ঈদুল আযহা উদযাপিত

কেন ওমানের ওপর ক্ষুব্ধ ট্রাম্প? ঘটনার নেপথ্য বিবরণ ও সময়রেখা

​যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর এক বিশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, বিশ্ব বাজারে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণ ও পারস্য উপসাগরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সম্প্রতি ইরান ও ওমানের মধ্যে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। ওই বৈঠকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী সকল আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক ও জ্বালানিবাহী জাহাজের কাছ থেকে যৌথভাবে টোল বা শুল্ক আদায়ের বিষয়ে একটি খসড়া চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে। মূলত এই টোল আদায়ের খবরটি ওয়াশিংটনে পৌঁছানোর পরপরই ক্ষোভে ফেটে পড়েন ডোনাল্ড ট্রাম্প।

​আপনার ওয়েবসাইটে সহজে কপি-পেস্ট করার জন্য পুরো সংকটের ধারাবাহিক সময়রেখা (Timeline) নিচে সাধারণ টেক্সট আকারে দেওয়া হলো:

  • ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহ: ইরান কর্তৃক হরমুজ প্রণালিতে কঠোর নৌ-অবরোধ আরোপ, যার ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে।
  • মার্চ থেকে মে মাসের মাঝামাঝি: যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরান যুদ্ধ পূর্ণাঙ্গ রূপ নেওয়ায় বিশ্বের এই অন্যতম ব্যস্ততম নৌপথটি প্রায় সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়ে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম রেকর্ড পরিমাণ বৃদ্ধি পায়।
  • মে মাসের তৃতীয় সপ্তাহ: সংকটের সুযোগ নিয়ে ইরান ও ওমানের মধ্যে যৌথভাবে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও বাণিজ্যিক জাহাজ থেকে টোল আদায়ের কূটনৈতিক আলোচনা শুরু।
  • ২৭ মে (বুধবার) সকাল: ওমান-ইরান টোল আদায়ের আলোচনার তীব্র বিরোধিতা করে হোয়াইট হাউজের মন্ত্রিসভার বৈঠকে ওমানকে উড়িয়ে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন ট্রাম্প।
  • ২৭ মে (বুধবার) বিকেল: মার্কিন সিনেটের সশস্ত্র বাহিনী বিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান রজার উইকার কর্তৃক ট্রাম্পের ৬০ দিনের সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবকে ‘বিপর্যয়’ বলে আখ্যায়িত।

'সবাই ভদ্র আচরণ করবে, না হলে উড়িয়ে দেব' — মন্ত্রিসভায় ট্রাম্পের হুঙ্কার

​বুধবারের ওই হাই-প্রোফাইল বৈঠকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন, হরমুজ প্রণালির ওপর কোনো একক দেশ বা আঞ্চলিক জোটের একাধিপত্য মেনে নেবে না মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্প বলেন, ‘হরমুজ প্রণালি কোনো নির্দিষ্ট দেশের সম্পত্তি নয়, এটি আন্তর্জাতিক জলসীমার অংশ এবং এটি সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে। কেউ এটি এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। আমরা (যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা) প্রয়োজনে এর তদারকি করব, তবে কোনো একক দেশ একে নিজেদের বাণিজ্যের হাতিয়ার বানাতে পারবে না। এটি আমাদের চলমান কৌশলগত আলোচনার অন্যতম প্রধান অংশ।’

​এরপরই ওমানকে লক্ষ্য করে নিজের স্বভাবসুলভ কূটনৈতিক শিষ্টাচার বহির্ভূত ভাষায় ট্রাম্প বলেন, ‘ওমানকে অন্য সবার মতোই স্বাভাবিক আচরণ করতে হবে। তারা যদি আন্তর্জাতিক আইন অমান্য করে ইরানের সাথে হাত মেলায়, তবে আমাদের তাদের উড়িয়ে দিতে হবে। তারা খুব ভালো করেই আমাদের সামরিক সক্ষমতা সম্পর্কে বোঝে। আমি আশা করি সব ঠিক হয়ে যাবে এবং তারা সঠিক পথেই থাকবে।’

হরমুজ প্রণালির অর্থনৈতিক গুরুত্ব ও বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট

​ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে পারস্য উপসাগর এবং ওমান উপসাগরের মাঝখানে অবস্থিত এই ‘হরমুজ প্রণালি’ (Strait of Hormuz)-কে বিশ্ব অর্থনীতির লাইফলাইন বা প্রধান ধমনী বলা হয়।

​বিশ্ব অর্থনীতির ওপর এর প্রভাবের ৩টি প্রধান দিক নিচে বিশ্লেষণ করা হলো:

  • এক-পঞ্চমাংশ তেল সরবরাহ: বিশ্বের মোট উৎপাদিত ও সরবরাহকৃত খনিজ তেলের প্রায় ২০ শতাংশ বা এক-পঞ্চমাংশ এই সরু প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। সৌদি আরব, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত এবং ইরানের উৎপাদিত তেল এই পথেই এশিয়া, ইউরোপ ও আমেরিকায় পৌঁছায়।
  • ইরানি অবরোধের প্রভাব: গত ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিক থেকে ইরানের কঠোর নৌ-অবরোধ ও খনি পাতার কারণে এই রুটে জাহাজ চলাচল প্রায় স্তিমিত হয়ে পড়েছে। ফলে বিশ্বের বড় বড় শিল্পোন্নত দেশগুলোতে তীব্র জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে।
  • বিশ্ব মন্দার শঙ্কা: তেলের সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় বিশ্বব্যাপী পরিবহন খরচ, কলকারখানার উৎপাদন ব্যয় এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম হু হু করে বাড়ছে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিকে এক দীর্ঘমেয়াদী মন্দার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

ট্রাম্পের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও 'অপারেশন এপিক ফিউরি'

​বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই আকস্মিক গরম বক্তব্যের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন (Midterm Election) বড় ভূমিকা রাখছে। বুধবারের বৈঠকে ট্রাম্প স্বয়ং স্বীকার ও অভিযোগ করেছেন যে, ইরান ইচ্ছা করেই শান্তি চুক্তির আলোচনা দীর্ঘায়িত করছে। তেহরানের মূল লক্ষ্য হলো আলোচনা ঝুলিয়ে রেখে আগামী নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত সময়ক্ষেপণ করা, যাতে ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে যায়।

​এদিকে ট্রাম্পের এই যুদ্ধংদেহী নীতির পক্ষে-বিপক্ষে মার্কিন সিনেটেও তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। মার্কিন সিনেটের সশস্ত্র বাহিনী বিষয়ক কমিটির প্রভাবশালী চেয়ারম্যান রজার উইকার ট্রাম্পের সম্ভাব্য নরম সুরের সমালোচনা করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘গুঞ্জন ওঠা ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি হবে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির জন্য একটি চরম বিপর্যয়।’ তিনি সতর্ক করে বলেন, মার্কিন সামরিক বাহিনীর বিশেষ অভিযান ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ (Operation Epic Fury)-র মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে এ যাবৎকাল যা কিছু অর্জিত হয়েছে, ইরানের সাথে কোনো দুর্বল চুক্তি বা যুদ্ধবিরতি করলে তার সবকিছুই এক নিমেষে বৃথা যাবে।

উপসংহার

​ওমানকে দেওয়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই ‘উড়িয়ে দেওয়ার’ হুমকি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মার্কিন একাধিপত্যবাদের এক নগ্ন বহিঃপ্রকাশ। ওমানের মতো একটি তুলনামূলক শান্ত ও মধ্যস্থতাকারী দেশকে যুদ্ধের মুখোমুখি দাঁড় করানো বিশ্ব শান্তির জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। জাতিসংঘ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের উচিত অবিলম্বে এই সংকটে হস্তক্ষেপ করা। হরমুজ প্রণালিকে একক কোনো দেশের সামরিক তদারকিতে না রেখে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের যৌথ ব্যবস্থাপনায় মুক্ত ঘোষণা করাই হবে বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি সংকট থেকে মুক্তি পাওয়ার একমাত্র যৌক্তিক সমাধান।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন