আন্তর্জাতিক ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এক চরম সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এক জটিল রাজনৈতিক গোলকধাঁধার মুখে পড়েছেন। একদিকে দেশের ভেতরে সামরিক অভিযানের পক্ষে জনমত, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবল কূটনৈতিক চাপ—এই দুইয়ের ভারসাম্য বজায় রাখতে গিয়েই মূলত যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করার কৌশল গ্রহণ করেছেন কি না, তা নিয়ে শুরু হয়েছে তুমুল বিতর্ক।
নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভাবমূর্তি ও চ্যালেঞ্জ
ইসরায়েলের রাজনীতিতে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে একজন ‘আপসহীন লৌহমানব’ বা ‘মিস্টার সিকিউরিটি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তার সমর্থক গোষ্ঠীর কাছে তিনি এমন এক নেতা, যিনি ইসরায়েলের অস্তিত্ব রক্ষায় প্রয়োজনে শক্তিশালী মিত্র দেশগুলোর সাথেও মতপার্থক্য তৈরি করতে দ্বিধা করেন না। কিন্তু সাম্প্রতিক ইরান ও লেবানন পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে তার এই ভাবমূর্তি কিছুটা নড়বড়ে হয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
আরও পড়ুন: সিরাজগঞ্জে ব্রিজের নিচ থেকে অজ্ঞাতপরিচয় বৃদ্ধের মরদেহ উদ্ধার
সম্প্রতি গণমাধ্যমে ফাঁস হওয়া ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর ফোনালাপ ইসরায়েলি রাজনীতির অন্দরমহলে বড় ধরনের উত্তাপ ছড়িয়েছে। খবর অনুযায়ী, ডোনাল্ড ট্রাম্প সামরিক অভিযান সীমিত রাখতে এবং বৈরুতে বড় ধরনের হামলা না চালানোর পরামর্শ দিয়েছিলেন। ট্রাম্পের এই পরামর্শ যদি সত্য হয়, তবে এটি ইসরায়েলিদের একাংশের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি করেছে যে, তাদের প্রধানমন্ত্রী হয়তো বিদেশি শক্তির চাপের কাছে নতি স্বীকার করছেন। নিজের সমর্থকদের কাছে এই ধারণাটি নেতানিয়াহুর জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
যুদ্ধ কেন দীর্ঘায়িত করার কৌশল?
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, নেতানিয়াহু উপলব্ধি করছেন যে, এখনই যুদ্ধবিরতি বা সামরিক অভিযান সীমিত করলে তা তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের জন্য হিতে বিপরীত হতে পারে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করার পেছনে বেশ কিছু কৌশলগত ও অভ্যন্তরীণ কারণ রয়েছে:
১. জাতীয় ঐক্য ও ক্ষমতায় টিকে থাকা: সংঘাতময় পরিস্থিতিতে সাধারণত দেশপ্রেমের জোয়ার তৈরি হয়, যা ক্ষমতাসীন সরকারকে অভ্যন্তরীণ সমালোচনা থেকে আড়াল করতে সাহায্য করে। নির্বাচন ও জনসমর্থনের হিসাব-নিকাশে এটি একটি পরীক্ষিত রাজনৈতিক কৌশল। ২. স্ট্র্যাটেজিক লক্ষ্য অর্জন: ইসরায়েলের অনেক নাগরিক বিশ্বাস করেন, ইরানকে দুর্বল করার এটিই মোক্ষম সুযোগ। পারমাণবিক কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক আধিপত্য নিয়ন্ত্রণে ইসরায়েল এখন সামরিক শক্তিতে তাদের লক্ষ্য অর্জনে মরিয়া। ৩. যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব মোকাবিলা: যদিও যুক্তরাষ্ট্র নিয়মিত উত্তেজনা প্রশমনের আহ্বান জানাচ্ছে, কিন্তু নেতানিয়াহু হয়তো দেখাতে চাইছেন যে ইসরায়েল নিজের নিরাপত্তার বিষয়ে কারো নির্দেশ মানতে বাধ্য নয়।
অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জটিল হিসাব
ইসরায়েলের অভ্যন্তরে জনমত বিভক্ত। দেশটির একাংশ মনে করে, ইরানের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস না করা পর্যন্ত শান্তি সম্ভব নয়। অন্যদিকে, ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক চাপ এবং দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের ক্লান্তি থেকে সাধারণ মানুষ দ্রুত সমাধান চায়। নেতানিয়াহুর সিদ্ধান্তের ওপর ভিত্তি করেই নির্ধারণ হচ্ছে তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ। যদি যুদ্ধ সফলভাবে শেষ করা যায়, তবে তিনি ইতিহাসের পাতায় বীর হিসেবে জায়গা করে নেবেন। আর ব্যর্থ হলে ক্ষমতার মসনদ থেকে বিদায় নেওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র।
কূটনৈতিক কৌশলে পরিবর্তন
ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনাকে ব্যর্থ করার পেছনেও নেতানিয়াহুর কৌশলগত মদদ রয়েছে বলে অনেকের ধারণা। তার সরকারের মতে, ইরানকে কোনো অবস্থাতেই পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জন করতে দেওয়া যাবে না। এই লক্ষ্য অর্জনে তিনি আন্তর্জাতিক মহলের সমর্থন হারানো বা সমালোচিত হওয়াকেও বড় করে দেখছেন না।
উপসংহার: বর্তমান সংঘাত শুধু রকেট হামলা বা পাল্টা আক্রমণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এটি এখন নেতানিয়াহুর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক অস্তিত্বের লড়াই। তিনি যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করছেন ঠিকই, কিন্তু এর মাধ্যমে তিনি শেষ পর্যন্ত ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবেন কি না—সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। ‘দিগন্ত বাংলা নিউজ’ এই গভীর সংঘাতের প্রতিটি রাজনৈতিক মোড় বিশ্লেষণ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমাদের সাথে যুক্ত থাকুন।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।