নেত্রকোনায় দুপুরের খাবার দিতে বিলম্ব, মায়ের মাথায় ক্ষিপ্ত সন্তানের শাবলের আঘাত ও মৃত্যু

নেত্রকোনায় দুপুরের খাবার দিতে বিলম্ব, মায়ের মাথায় ক্ষিপ্ত সন্তানের শাবলের আঘাত ও মৃত্যু
ছবি: সংগৃহীত

 সারাদেশ ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ

পারিবারিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় এবং মাদকের ভয়াবহ থাবার এক নির্মম ও হৃদয়বিদারক দৃষ্টান্ত দেখল নেত্রকোনাবাসী। ক্ষুধার্ত পেটে সামান্য ভাত দিতে দেরি হওয়াকে কেন্দ্র করে জন্মদাত্রী মায়ের মাথায় লোহার ভারী শাবল দিয়ে আঘাত করে হত্যা করেছে এক নিজ সন্তান। নেত্রকোনা সদর উপজেলায় ঘটে যাওয়া এই লোমহর্ষক ও অনাকাঙ্ক্ষিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সমগ্র জেলা জুড়ে তীব্র ক্ষোভ, নিস্তব্ধতা এবং গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। ঘটনার পর পরই স্থানীয় উত্তেজিত ও beachfront জনতা ঘাতক ছেলেকে ধাওয়া করে আটক করে এবং পরবর্তীতে তাকে মডেল থানা পুলিশের হাতে সোপর্দ করে।

নিহত ওই ভাগ্যহীন মায়ের নাম আবুনি রাজভর ওরফে রুক্সী (৫০)। তিনি নেত্রকোনা সদর উপজেলার বাসিন্দা শ্যাম লাল রাজভরের স্ত্রী ছিলেন। অন্যদিকে, জন্মদাত্রী মাকে নির্মমভাবে হত্যাকারী ওই পাষণ্ড ছেলের নাম श्यामল রাজভর (২৪)। স্থানীয়দের মতে, মাদকের মরণনেশা কীভাবে একটি সুস্থ পরিবারকে ধ্বংস করে দিতে পারে এবং একজন সন্তানকে পিশাচে পরিণত করতে পারে, এই ঘটনা তার এক জ্বলন্ত ও বেদনাদায়ক প্রমাণ।

घटनाর পটভূমি ও ভৌগোলিক বিবরণ

স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী এবং পুলিশ প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, নেত্রকোনা সদর উপজেলার চল্লিশা ইউনিয়ন পরিষদ সংলগ্ন এবং মগড়া নদীর তীরবর্তী এলাকায় একটি সাধারণ টিনশেড ঘরে পরিবার নিয়ে দীর্ঘ দিন ধরে বসবাস করে আসছিলেন শ্যাম লাল রাজভর ও আবুনি রাজভর দম্পতি। নদী তীরবর্তী এই প্রান্তিক পরিবারটির জীবনযাত্রা ছিল অত্যন্ত সাধারণ এবং কষ্টসাধ্য। এই দম্পতির সন্তান শ্যামল রাজভর বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে মারাত্মকভাবে মাদকাসক্ত ছিলেন।

এলাকাবাসীর তথ্যমতে, নিয়মিত বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্য সেবনের কারণে শ্যামল মানসিকভাবেও বিপর্যস্ত ও ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছিলেন। মাদকের টাকার জন্য প্রায়শই সে ঘরের আসবাবপত্র ভাঙচুর করত এবং নিজের বাবা-মায়ের ওপর চড়াও হতো। লোকলজ্জার ভয়ে পরিবারটি অনেক সময় এই অভ্যন্তরীণ অশান্তির কথা বাইরে প্রকাশ করত না। কিন্তু এই মাদকাসক্তি যে শেষ পর্যন্ত এমন একটি নৃশংস ও রক্তক্ষয়ী ট্র্যাজেডিতে রূপ নেবে, তা কেউই কখনো কল্পনা করতে পারেনি।

যেভাবে ঘটল সেই নির্মম হত্যাকাণ্ড

হত্যাকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট বিবরণ দিয়ে পুলিশ জানায়, আজ মঙ্গলবার দুপুর আনুমানিক আড়াইটার দিকে এই নৃশংস ঘটনার সূত্রপাত হয়। ঘাতক শ্যামল রাজভর বাইরে থেকে ঘরে ফিরে অত্যন্ত ক্ষুধার্ত অবস্থায় তার মা আবুনি রাজভরের কাছে তাৎক্ষণিকভাবে দুপুরের ভাত চায়। এ সময় রান্নাঘরের কাজে ব্যস্ত থাকা মা আবুনি রাজভর ছেলেকে স্নেহভরে কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে বলেন এবং জানান যে ভাত পরিবেশন করতে সামান্য কিছু সময় লাগবে।

আরও পড়ুন: অনলাইনে অশ্লীল ছবি ছড়ানোর অভিযোগে যুবক গ্রেপ্তার

অনলাইনে অশ্লীল ছবি ছড়ানোর অভিযোগে যুবক গ্রেপ্তার

কিন্তু মাদকের প্রভাবে বিকৃত মস্তিষ্কের অধিকারী এবং উগ্র স্বভাবের শ্যামল এই সামান্য অপেক্ষাটুকু মেনে নিতে পারেনি। মায়ের মুখে অপেক্ষা করার কথা শুনে সে প্রচণ্ডভাবে ক্ষিপ্ত ও উত্তেজিত হয়ে ওঠে এবং মায়ের সাথে তুমুল বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে রাগ ও হিংস্রতার বশবর্তী হয়ে সে ঘরের কোণে থাকা মাটি খোঁড়ার একটি ভারী লোহার শাবল হাতে তুলে নেয়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই শ্যামল তার মায়ের মাথার পেছনে ও মাঝখানে সজোরে আঘাত করে। লোহার শাবলের সেই মারাত্মক ও প্রচণ্ড আঘাতে আবুনি রাজভরের মাথার খুলি ফেটে যায় এবং তিনি রক্তাক্ত অবস্থায় ঘরের মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন।

ঘটনাস্থলে এলাকাবাসীর তৎপরতা ও মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়া

চিৎকার ও ধস্তাধস্তির শব্দ পেয়ে আশেপাশের টিনশেড ঘরের বাসিন্দারা এবং নদীর তীরে থাকা স্থানীয় লোকজন দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। তারা ঘরের ভেতরে আবুনি রাজভরকে রক্তাক্ত এবং অচেতন অবস্থায় মাটিতে পড়ে থাকতে দেখেন। স্থানীয় বাসিন্দারা তাৎক্ষণিকভাবে অত্যন্ত মানবিকতার সাথে রক্তাক্ত মাকে উদ্ধার করে দ্রুত স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেন। কিন্তু আঘাতটি এতটাই গুরুতর ছিল এবং অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পূর্বেই, অর্থাৎ ঘটনাস্থলেই আবুনি রাজভর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

মায়ের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর উপস্থিত এলাকাবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভের আগুন জ্বলে ওঠে। ঘাতক ছেলে শ্যামল রাজভর ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে চারদিক থেকে ঘেরাও করে বিক্ষুব্ধ জনতা তাকে হাতেনাতে আটক করে। এরপর স্থানীয় চল্লিশা ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে নেত্রকোনা মডেল থানা পুলিশকে বিষয়টি অবহিত করা হয়।

পুলিশ প্রশাসনের দ্রুত পদক্ষেপ ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের পরিদর্শন

হত্যাকাণ্ডের খবর পাওয়ার পর পরই নেত্রকোনা জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নেন। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) সজল কুমার সরকার এবং নেত্রকোনা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আল মামুন সরকার বিশাল পুলিশ ফোর্সসহ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছান। তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন, আলামত সংগ্রহ করেন এবং সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেন।

পুলিশের উপস্থিতিতে উত্তেজিত জনতা আটককৃত ঘাতক ছেলে শ্যামল রাজভরকে প্রশাসনের হাতে তুলে দেয়। পুলিশ তাকে কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে থানা হেফাজতে নিয়ে যায়, যেন উত্তেজিত জনতা কোনো ধরনের আইন নিজের হাতে তুলে নিতে না পারে।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সজল কুমার সরকার সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে জানান, নিহতের মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের আনুষ্ঠানিকতার জন্য নেত্রকোনা ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালের মর্গে প্রেরণ করা হয়েছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট আসার পর আঘাতের তীব্রতা ও মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ আরও স্পষ্টভাবে জানা যাবে। তিনি আরও জানান, অভিযুক্ত ছেলেকে ইতিমধ্যেই আটক করা হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে মামলার প্রস্তুতি চলছে।

মাদকের করাল গ্রাস ও সামাজিক অবক্ষয়ের করুণ চিত্র

নেত্রকোনার এই মর্মান্তিক ঘটনাটি কেবল একটি সাধারণ হত্যাকাণ্ড নয়, বরং এটি আমাদের সমাজব্যবস্থায় মাদকের ভয়াবহ বিস্তারের এক ভয়ঙ্কর অ্যালার্ম বা সতর্কবার্তা। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, যুবসমাজের মধ্যে মাদকের সহজলভ্যতা এবং পারিবারিক পর্যায়ে সচেতনতার অভাবের কারণে এই ধরনের নৃশংস অপরাধ ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। মাদকের নেশা মানুষের স্বাভাবিক চিন্তাভাবনা এবং আবেগ-অনুভূতিকে সম্পূর্ণভাবে অবশ করে দেয়, যার ফলে একজন সন্তান তার নিজের জন্মদাত্রী মায়ের বুকেও অস্ত্র বা শাবল চালাতে দ্বিধাবোধ করে না। মগড়া নদীর তীরের এই শান্ত এলাকায় শান্তিকামী মানুষেরা এখন এই মাদকাসক্ত ঘাতকের সর্বোচ্চ এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছেন, যেন ভবিষ্যতে আর কোনো মায়ের কোল এভাবে খালি না হয় এবং কোনো সন্তান যেন এমন পিশাচ না হতে পারে।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন