জাতীয় ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ
বিদ্যুতের দাম বাড়ল: গ্রাহক পর্যায়ে নতুন দর তালিকা ও বিস্তারিত বিশ্লেষণ
বাংলাদেশে বিদ্যুৎ খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন এলো। দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) পাইকারি ও গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের নতুন মূল্য নির্ধারণ করেছে। বুধবার (০৩ জুন) রাজধানীর রমনায় অবস্থিত ইন্সটিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইইবি) ভবনের বিইআরসি কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে এই নতুন মূল্য তালিকা ঘোষণা করা হয়। কমিশন জানিয়েছে, এই সিদ্ধান্তটি গত ১ জুন থেকে কার্যকর হয়েছে। সামগ্রিক বিবেচনায় পাইকারি পর্যায়ে ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ এবং গ্রাহক পর্যায়ে গড়ে ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে।
কেন এই মূল্যবৃদ্ধি?
দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ, আমদানিকৃত জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং সঞ্চালন ব্যবস্থার আধুনিকায়নের প্রয়োজনে কমিশন এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকির চাপ কমাতে এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতেই এই সমন্বয় করা হয়েছে। বিইআরসি চেয়ারম্যান এক প্রেস ব্রিফিংয়ে উল্লেখ করেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের অস্থিরতা এবং ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হারের প্রভাব বিদ্যুৎ খাতের খরচে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে
আরও পড়ুন: অপু বিশ্বাসের হাতে সোনার কলস: নেপথ্যের অজানা কাহিনী
গ্রাহক পর্যায়ে নতুন দর তালিকা (ইউনিটপ্রতি)
বিদ্যুতের ব্যবহারের স্তরের ওপর ভিত্তি করে গ্রাহকদের নতুন এই মূল্য তালিকা নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:
| ব্যবহারের ক্যাটাগরি | পূর্বের মূল্য (টাকা) | বৃদ্ধি (টাকা) | নতুন মূল্য (টাকা) |
| লাইফ লাইন (৫০ ইউনিট পর্যন্ত) | ৪.৬৩ | ০.৬৯ | ৫.৩২ |
| ০-৭৫ ইউনিট | ৫.২৬ | ০.৯২ | ৬.১৮ |
| ৭৬-২০০ ইউনিট | ৭.২০ | ১.৩০ | ৮.৫০ |
| ২০১-৩০০ ইউনিট | ৭.৫৯ | ১.৫১ | ৯.১০ |
| ৩০১-৪০০ ইউনিট | ৮.০২ | ১.৬০ | ৯.৬২ |
| ৪০১-৬০০ ইউনিট | ১২.৬৭ | ২.৩৪ | ১৫.০১ |
| ৬০০ ইউনিটের ওপরে | ১৪.৬১ | ২.৭৪ | ১৭.৩৫ |
সেক্টরাল মূল্য সমন্বয়
সাধারণ আবাসিক গ্রাহকের পাশাপাশি বিভিন্ন বাণিজ্যিক ও সেবা খাতের জন্যও নতুন মূল্য কার্যকর হয়েছে:
কৃষি সেচ: বর্তমানে কৃষি সেচে প্রতি ইউনিটে ৬ টাকা ০৪ পয়সা ধার্য করা হয়েছে, যা আগে ছিল ৫ টাকা ২৫ পয়সা।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত: শিক্ষা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ খরচ ৭ টাকা ৫৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৯ টাকা ০৫ পয়সা করা হয়েছে।
বাণিজ্যিক ও অফিস: বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহৃত বিদ্যুতের দাম ১৩ টাকা ০১ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১৫ টাকা ৩৬ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে।
শিল্প ও নির্মাণ: ক্ষুদ্রশিল্পে ১২ টাকা ৭৩ পয়সা এবং নির্মাণশিল্পে ১৮ টাকা ০৯ পয়সা ইউনিটপ্রতি মূল্য নির্ধারিত হয়েছে।
অন্যান্য: রাস্তার বাতি ও পানির পাম্পের জন্য ১১ টাকা ৪৬ পয়সা এবং বৈদ্যুতিক গাড়ি বা ব্যাটারি চার্জিং স্টেশনের জন্য ১১ টাকা ৩৬ পয়সা ইউনিটপ্রতি মূল্য কার্যকর করা হয়েছে।
বিশ্লেষণ ও প্রভাব
বিদ্যুতের এই মূল্য সমন্বয় দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে কিছুটা প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা। তবে সরকারের দাবি, মানসম্মত সেবা ও সিস্টেম লস কমানোর জন্য এই আধুনিকায়ন অপরিহার্য। বিশেষ করে শিল্পায়নের গতি ধরে রাখা এবং সেচ মৌসুমে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ বজায় রাখাই মূল লক্ষ্য। নতুন এই মূল্যতালিকা প্রকাশের পর সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিলেও দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ খাতের স্থিতিশীলতা রক্ষায় এটি একটি সাহসী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
উপসংহার
দেশকে একটি টেকসই বিদ্যুৎ ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে নিতে সরকার নিয়মিত ব্যবধানে মূল্য সমন্বয় করে থাকে। গ্রাহকদের উচিত এখন বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতির ব্যবহার বৃদ্ধি করা এবং অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ অপচয় রোধে সচেতন হওয়া। কমিশনের পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হয়েছে, যেন গ্রাহকরা তাদের ব্যবহৃত ইউনিট অনুযায়ী নতুন বিল পরিশোধের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।