সারাদেশ ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ
২৪ ঘণ্টায় বরগুনায় লাশের মিছিল: রহস্যময় মৃত্যুতে স্তব্ধ জনপদ
দক্ষিণাঞ্চলের জেলা বরগুনায় গত ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে যে অস্বাভাবিক মৃত্যুগুলো ঘটেছে, তা গোটা দেশের মানুষের মনে গভীর উদ্বেগ ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। শুক্রবার দুপুর থেকে আজ শনিবার বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত বরগুনার বিভিন্ন এলাকা থেকে মোট পাঁচটি মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এই মৃত্যুর ঘটনাগুলোর ধরণ একেক এলাকায় একেক রকম হওয়ায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। সদর, পাথরঘাটা এবং বামনা—এই তিন উপজেলা জুড়ে যেন এক শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
সদর উপজেলার দুই গৃহবধূর রহস্যজনক মৃত্যু বরগুনা সদর উপজেলার আয়লা পাতাকাটা ইউনিয়নের লেমুয়া এলাকায় আজ সকালে মোসা. কনা (৩৪) নামের এক গৃহবধূর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। একই সময় ঢলুয়া ইউনিয়নের নলী এলাকা থেকে ৯৩ বছর বয়সী সালেহা বেগম নামে এক বৃদ্ধার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। কনা এবং সালেহা বেগমের মৃত্যু নিয়ে এলাকায় গুঞ্জন ছড়িয়েছে। বৃদ্ধ বয়সে কেন সালেহা বেগম আত্মহত্যার পথ বেছে নিলেন এবং কনার মৃত্যুর পেছনে কোনো পারিবারিক কলহ বা অন্য কোনো কারণ রয়েছে কি না—সেটি নিয়ে নিবিড় তদন্ত শুরু করেছে সদর থানা পুলিশ।
মাদক কারবারিকে ঘিরে গণপিটুনিতে মৃত্যু শুক্রবার দুপুরে বরগুনা সদরে ঘটে যাওয়া আরেকটি ন্যাক্কারজনক ঘটনা সবাইকে আতঙ্কিত করেছে। মাদক ব্যবসাকে কেন্দ্র করে এক ইউনিয়ন পরিষদ সদস্যকে কুপিয়ে জখম করে স্থানীয় চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী ইব্রাহিম হোসেন (কালু) এবং তাঁর বাহিনী। এই পাশবিকতায় ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী পাল্টা আক্রমণ চালালে কালু বাহিনীর প্রধান ইব্রাহিম হোসেন গণপিটুনিতে ঘটনাস্থলেই নিহত হন। মাদক বিরোধী জনরোষের এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, সাধারণ মানুষ এখন আর অপরাধীদের দৌরাত্ম্য মেনে নিতে প্রস্তুত নয়।
পাথরঘাটায় অটোরিকশাচালকের করুণ পরিণতি পাথরঘাটা পৌরসভা এলাকা থেকে মিজানুর রহমান (৪৫) নামে একজন অটোরিকশাচালকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। শনিবার ভোরে পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের পানি উন্নয়ন বোর্ডের পাশের সড়ক থেকে এই লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার রাতের খাবারের পর মিজানুর নিখোঁজ হন। প্রতিবেশীদের সাথে জমিসংক্রান্ত পূর্ব বিরোধের জের ধরে তাঁকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে বলে নিহতের পরিবার জোরালো অভিযোগ তুলেছে। পাথরঘাটা থানা পুলিশ মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠিয়েছে এবং ঘটনার সাথে জড়িতদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।
আরও পড়ুন: চূড়ান্ত বিজয় না হওয়া পর্যন্ত পিছু হটবে না ইরান: গালিবাফ
বামনায় কলেজছাত্রের অকাল প্রয়াণ শনিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বামনা উপজেলার কলাগাছি এলাকা থেকে এহসান (১৮) নামের এক কলেজছাত্রের ঝুলন্ত মরদেহ পাওয়া গেছে। ঘটনাস্থলে পুলিশ পৌঁছে দেখে, ওই তরুণের কানে হেডফোন লাগানো ছিল। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, প্রেমঘটিত কোনো মানসিক চাপের কারণে এহসান এই চরম পথ বেছে নিয়েছেন। এহসানের মুঠোফোনটি ইতিমধ্যে জব্দ করা হয়েছে এবং ডিটেইলড কল লিস্ট (CDR) যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
সামাজিক অবক্ষয় ও বিশিষ্টজনদের উদ্বেগ বরগুনার এই একের পর এক অস্বাভাবিক মৃত্যুকে নিছক দুর্ঘটনা হিসেবে দেখছেন না সমাজবিজ্ঞানীরা। জেলা পাবলিক পলিসি ফোরামের আহ্বায়ক হাসানুর রহমান বলেন, "সামাজিক অবক্ষয়ের চরম পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আমরা আজ। পারিবারিক মূল্যবোধের অভাব এবং মাদকের সহজলভ্যতা এই পরিস্থিতির জন্য অনেকাংশেই দায়ী। পাড়া-মহল্লায় সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি না করলে এই অকাল মৃত্যুর ধারা রোধ করা কঠিন হবে।"
পুলিশ প্রশাসনের বক্তব্য ঘটনাগুলোর বিষয়ে বরগুনার বিভিন্ন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা (ওসি) জানিয়েছেন, প্রতিটি মৃত্যুকে গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে। কোনোটি আত্মহত্যা, কোনোটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড—এসবের সত্যতা নিশ্চিত করতে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনের জন্য অপেক্ষা করা হচ্ছে। পুলিশ প্রশাসন নিশ্চিত করেছে, যারা হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত, তাদের বিচারের আওতায় আনতে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দিগন্ত বাংলা নিউজ প্রতিনিয়ত বরগুনার এই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রাখছে। আমাদের কাম্য, অপরাধীরা যেন দ্রুত আইনের আওতায় আসে এবং এলাকায় শান্তি ফিরে আসে। এ বিষয়ে সর্বশেষ আপডেটের জন্য আমাদের নিউজ পোর্টালের সঙ্গেই থাকুন।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।