জাতীয় সংসদের পবিত্রতা ও মন্ত্রীদের দায়িত্বশীলতার বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে। সংসদের ফ্লোরে দাঁড়িয়ে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে ব্যর্থ হওয়ায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুকে কঠোর সতর্ক করেছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ। কোনো বিষয় সংসদে উত্থাপন বা প্রতিশ্রুতি দেওয়ার আগে মন্ত্রীদের আরও সতর্ক ও পর্যালোচনা করে আসার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
ঘটনার সূত্রপাত যেভাবে:
রবিবার সংসদ অধিবেশনে আশুগঞ্জ সার কারখানায় গ্যাস সরবরাহ সংক্রান্ত একটি সম্পূরক প্রশ্ন উত্থাপন করেন সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। তিনি জ্বালানিমন্ত্রীর বিগত সময়ের একটি প্রতিশ্রুতির প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। রুমিন ফারহানা বলেন, “মাননীয় মন্ত্রী এই মহান সংসদে দাঁড়িয়ে আমাকে আশ্বস্ত করেছিলেন যে, পহেলা মে-এর মধ্যে আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজার কারখানায় গ্যাসের সংযোগ প্রদান করা হবে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় হলো, প্রতিশ্রুত সেই মে মাস পেরিয়ে জুন মাসেরও বেশ কয়েকদিন অতিবাহিত হয়ে গেছে, তবুও আমরা এখনো আশুগঞ্জ সার কারখানায় গ্যাসের কোনো সংযোগ পাইনি।”
তিনি মন্ত্রীর কাছে জানতে চান, ঠিক কবে নাগাদ উক্ত সার কারখানায় গ্যাসের সংযোগ পাওয়া সম্ভব হবে।
জ্বালানিমন্ত্রীর বক্তব্য ও গ্যাসের সীমাবদ্ধতা:
সংসদ সদস্যের প্রশ্নের জবাবে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু দেশের বর্তমান জ্বালানি পরিস্থিতি ও সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “দেশে গ্যাসের সংকট রয়েছে, এটি অস্বীকার করার উপায় নেই। বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমাদের অগ্রাধিকার দিতে হচ্ছে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে। কারণ, বিদ্যুৎ উৎপাদন সচল রাখতে গ্যাস সরবরাহ অপরিহার্য।”
আরও পড়ুন: ২০২৬ বিশ্বকাপে চার্জযোগ্য স্মার্ট বল ‘ট্রাইওন্ডা’: প্রযুক্তির নতুন চমক
মন্ত্রী আরও বলেন, “সংসদ সদস্য যেমন সার কারখানায় গ্যাস চাচ্ছেন, তেমনি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোও নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস পাওয়ার দাবি জানাচ্ছে। কিন্তু গ্যাসের সীমাবদ্ধতার কারণে চাইলেই সব জায়গায় সমানভাবে সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না।”
খনন ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা:
সার কারখানা সচল করার বিষয়ে মন্ত্রী আশা প্রকাশ করে বলেন, “গত ১৭ বছরে দেশে নতুন করে কোনো ড্রিলিং বা গ্যাস কূপ খনন করা হয়নি। বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথমবারের মতো খনন কাজ শুরু করেছে। আমরা আশা করছি, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নতুন গ্যাস পাওয়া যাবে। নতুন গ্যাস পাওয়ার পরপরই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আশুগঞ্জ সার কারখানার মতো গুরুত্বপূর্ণ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সংযোগ প্রদান করা হবে।”
স্পিকারের কঠোর অবস্থান ও পরামর্শ:
মন্ত্রীর জবাবের পর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বিষয়টি নিয়ে কিছুটা অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি মন্ত্রীকে মনে করিয়ে দিয়ে বলেন, “মাননীয় মন্ত্রী, আপনি কিন্তু সংসদে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে মে মাসের এক তারিখ থেকেই গ্যাস সরবরাহ শুরু হবে। সেটি এখনো বাস্তবায়ন করা হয়নি।”
স্পিকার ভবিষ্যতে কোনো প্রতিশ্রুতি দেওয়ার ক্ষেত্রে মন্ত্রীদের আরও বেশি দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন: ১. দায়িত্বশীলতা: সংসদে যখন কোনো মন্ত্রী প্রতিশ্রুতি দেবেন, তখন সেটি যেন দায়িত্বশীল জায়গা থেকেই হয়। ২. বিশদ পর্যালোচনা: প্রতিশ্রুতির আগে ড্রিলিং সক্ষমতা, গ্যাসের মজুদ এবং আনুষঙ্গিক বিষয়গুলো ভালোভাবে স্টাডি বা পর্যালোচনা করে তবেই প্রতিশ্রুতি দেওয়া উচিত। ৩. সংসদের মর্যাদা: অসম্পূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে সংসদে কোনো কথা বলে সংসদকে বিভ্রান্ত করা অনুচিত।
আমাদের বিশ্লেষণ:
সংসদীয় গণতন্ত্রে মন্ত্রীদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি বা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এটি জনগণের প্রত্যাশা ও সরকারের কাজের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে। স্পিকারের এই সতর্কবার্তা শুধু জ্বালানিমন্ত্রী নয়, বরং সমগ্র মন্ত্রীপরিষদের জন্য একটি বার্তা যে, সংসদে প্রতিটি বাক্য উচ্চারণের আগে যথাযথ প্রস্তুতি প্রয়োজন। আশুগঞ্জ সার কারখানার মতো একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের ক্ষেত্রে বিলম্ব হওয়ার কারণ এবং এর প্রতিকারের বিষয়ে স্বচ্ছ তথ্য দেওয়া একান্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।