প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ
বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাসে আজ একটি নতুন অধ্যায় রচিত হয়েছে। দীর্ঘ প্রায় সাড়ে তিন দশক পর জাতীয় সংসদে প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই ঐতিহাসিক নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশের তেইশতম রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন।
বৃহস্পতিবার দুপুর দুইটা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষে ভোটগ্রহণ চলে। ভোট গণনা শেষে বিকেল পাঁচটার পর প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচনী কর্মকর্তা এ এম এম নাসির উদ্দিন আনুষ্ঠানিকভাবে ফলাফল ঘোষণা করেন। তিনি জানান, মোট নিবন্ধিত ভোটার ছিলেন তিনশো ঊনপঞ্চাশ জন। এর মধ্যে তিনশো তেতাল্লিশ জন সংসদ সদস্য তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন।
আরও পড়ুন: স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে জরুরি জনবল নিয়োগ
ঘোষিত ফলাফল অনুসারে বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পেয়েছেন দুইশো পঞ্চাশটি ভোট। অন্যদিকে বিরোধীদলীয় এগারো দলীয় জোটের প্রার্থী কর্নেল অবসরপ্রাপ্ত অলি আহমদ পেয়েছেন আটানব্বইটি ভোট। এই ব্যবধানে বিজয়ী হয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে আসীন হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেন।
ফলাফল ঘোষণার পরপরই সংসদ ভবনের পরিবেশ আনন্দমুখর হয়ে ওঠে। নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে লাল গোলাপ হাতে শুভেচ্ছা জানিয়ে অভিনন্দন প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই মুহূর্তটি দেশের রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচিত হয়েছে। একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিক এখন রাষ্ট্রের প্রতীকী প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্রপতি পদটি মূলত আনুষ্ঠানিক ও সাংবিধানিক। তবে এই পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তি জাতির ঐক্য, সংবিধানের রক্ষক এবং গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতার প্রতীক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। গত তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সাধারণত নির্বিরোধভাবে সম্পন্ন হয়ে আসছিল। এবার দুই প্রার্থীর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হওয়ায় নির্বাচনটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। সংসদ সদস্যদের প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়া গণতান্ত্রিক চর্চার একটি উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ভোটগ্রহণে অধিকাংশ সংসদ সদস্য অংশগ্রহণ করলেও ছয়জন তাদের ভোট প্রয়োগ করেননি। এদের মধ্যে রয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও ঢাকা-৮ আসনের সংসদ সদস্য মির্জা আব্বাস, কিশোরগঞ্জ-৩ আসনের ড. ওসমান ফারুক, চট্টগ্রাম-৩ আসনের মোস্তফা কামাল পাশা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা, সিলেট-৫ আসনের খেলাফত মজলিশের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আবুল হাসান এবং জামায়াতে ইসলামী থেকে নির্বাচিত সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম।
সংসদ সূত্রে জানা যায়, মির্জা আব্বাস দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থতাজনিত কারণে চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। ফলে তিনি এই নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি। গাজী নজরুল ইসলামের ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি বিতর্কিত ভিডিওকে কেন্দ্র করে দল থেকে তাকে বহিষ্কার করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে তার অনুপস্থিতির আলাদা কোনো কারণ প্রকাশ পায়নি। স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার ভোট দেওয়ার সুযোগ থাকলেও ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার আগে পর্যন্ত তাকে ভোটকক্ষে দেখা যায়নি। অন্য তিনজনের অনুপস্থিতির বিষয়েও কোনো স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে প্রথমে ভোট না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও পরে ভোট প্রয়োগ করেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের একমাত্র সংসদ সদস্য মাওলানা মাহমুদুল হোসাইন অলিউল্লাহ। তার এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
নির্বাচনের পুরো প্রক্রিয়া নির্বাচন কমিশনের তত্ত্বাবধানে স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন ফলাফল ঘোষণার সময় উভয় প্রার্থী এবং অংশগ্রহণকারী সংসদ সদস্যদের অভিনন্দন জানান। তিনি বলেন, সর্বোচ্চ সংখ্যক ভোট পাওয়ায় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বৈধভাবে নির্বাচিত হয়েছেন। নির্বাচন কমিশন আজই এই ফলাফল সরকারি গেজেটে প্রকাশ করবে বলে জানানো হয়েছে।
এই নির্বাচনের তাৎপর্য শুধু একজন নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা এবং সংসদীয় গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতার প্রমাণ বহন করে। বিগত তিন দশকের মধ্যে প্রথমবার একাধিক প্রার্থীর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হওয়ায় জনগণের মধ্যে এই প্রক্রিয়া নিয়ে আগ্রহ ও আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে। সংসদ সদস্যদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং ফলাফলের স্বচ্ছতা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে আরও শক্তিশালী করেছে বলে বিশ্লেষকরা মত প্রকাশ করেছেন।
নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় রয়েছেন। তার রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতা, নেতৃত্বের দক্ষতা এবং দেশের বিভিন্ন স্তরের মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তাকে এই পদে যোগ্য করে তুলেছে বলে তার সমর্থকরা মনে করেন। অন্যদিকে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী অলি আহমদের পক্ষেও একটি অংশের সমর্থন ছিল, যা নির্বাচনকে প্রতিযোগিতামূলক করে তোলে।
ফলাফল ঘোষণার পর সংসদ ভবনের ভেতরে এবং বাইরে উভয় ক্ষেত্রেই উৎসবের আমেজ দেখা গেছে। প্রধানমন্ত্রীর শুভেচ্ছা বার্তা এবং সংসদ সদস্যদের করতালিতে নতুন রাষ্ট্রপতির প্রতি সমর্থন প্রকাশিত হয়েছে। আগামী দিনগুলোতে তিনি শপথ গ্রহণ করে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্বভার গ্রহণ করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
রাষ্ট্রপতি পদটি যদিও নির্বাহী ক্ষমতাসম্পন্ন নয়, তবুও এটি দেশের সাংবিধানিক কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। জরুরি পরিস্থিতিতে, সংসদ ভেঙে দিয়ে নতুন নির্বাচন আহ্বান এবং বিভিন্ন সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা অপরিহার্য। নতুন রাষ্ট্রপতির নেতৃত্বে এই দায়িত্বগুলো যথাযথভাবে পালিত হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হচ্ছে।
এই নির্বাচন দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হবে। দীর্ঘ বিরতির পর প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়া গণতন্ত্রের পরিপক্কতার ইঙ্গিত দেয়। সংসদ সদস্যদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষ ভূমিকা এই প্রক্রিয়াকে আরও গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে।
আগামী দিনগুলোতে নতুন রাষ্ট্রপতি দেশের সকল নাগরিকের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করবেন বলে আশা করা হয়। তার নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্য, সামাজিক সম্প্রীতি এবং সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে বলে সংশ্লিষ্ট মহল বিশ্বাস করে। এই নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের গণতান্ত্রিক যাত্রায় একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো, যা ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে সহায়ক হবে।
সূত্র: সংসদ সূত্র ও নির্বাচন কমিশন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।