প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ
উত্তরবঙ্গের ঠাকুরগাঁও জেলার পীরগঞ্জ উপজেলায় ঘটে গেল এক অত্যন্ত হৃদয়বিদারক ও মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। মেঘলা আকাশে প্রকৃতির আকস্মিক তাণ্ডবে ঝরে গেল এক তাজা প্রাণ। মোবাইল ফোনে স্বজন বা পরিচিত কারো সাথে কথা বলার এক অস সতর্ক মুহূর্তেই ঘাতক বজ্রপাত প্রাণ কেড়ে নিল রুনা আক্তার (২২) নামের এক তরুণী গৃহবধূর। আকস্মিক এই ট্র্যাজেডিতে সেনুয়া ডাঙীবস্তি গ্রাম জুড়ে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। নিহত গৃহবধূর পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে এলাকার বাতাস।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পীরগঞ্জ উপজেলার অন্তর্গত ভোমরাদহ ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্ভুক্ত সেনুয়া ডাঙীবস্তি গ্রামে রোববার দুপুরে এই অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনাটি ঘটে। নিহত রুনা আক্তার ওই এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা নমির উদ্দিনের কন্যা এবং স্থানীয় যুবক নয়ন আলীর সহধর্মিনী ছিলেন। দৈনন্দিন গৃহস্থালি কাজের ফাঁকে তিনি নিজ ঘরের ভেতরের জানালার ধারে দাঁড়িয়ে মুঠোফোনে কথা বলছিলেন। সে সময় বাইরে হালকা ও মাঝারি ধরনের বৃষ্টিপাতের সাথে সাথে হঠাৎ বিকট শব্দে সংলগ্ন স্থানে এক শক্তিশালী বজ্রপাত ঘটে।
আরও পড়ুন: শাহজাদপুরে ১৩ বছরের জমি বিরোধের অবসান: দুই পরিবারের মুখে হাসির ঝিলিক
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্বজনদের ভাষ্যমতে, জানালার পাশেই বজ্রপাতের প্রচণ্ড আলো ও বিদ্যুৎ তরঙ্গ তাকে মারাত্মকভাবে আঘাত করে। মুহূর্তের মধ্যে রুনা আক্তারের শরীরের ডান দিকের সিংহভাগ অংশ গভীরভাবে দগ্ধ ও ঝলসে যায়। বিকট আওয়াজ ও বজ্রের প্রচণ্ড আঘাতে তিনি সাথে সাথেই জ্ঞান হারিয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন। ঘরের ভেতরের ধোঁয়া ও বিকট শব্দ শুনে পরিবারের সদস্যরা দ্রুত ভেতরে ছুটে আসেন এবং তাকে আশঙ্কাজনক ও অচেতন অবস্থায় মেঝের ওপর পড়ে থাকতে দেখেন।
দুর্ঘটনার তাৎক্ষণিক পরিস্থিতিতে স্বজনেরা কোনো বিলম্ব না করে দ্রুত স্থানীয় একটি রিকশাভ্যানে করে উদ্ধারকৃত গৃহবধূকে পীরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করেন। কিন্তু কপাল মন্দ, হাসপাতালের পথেই তার শারীরিক অবস্থার দ্রত অবনতি ঘটতে থাকে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পৌঁছানোর পূর্বেই পথিমধ্যে ভেলাতৈল নামক স্থানে এসে তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। পরবর্তী সময়ে হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে দায়িত্বরত চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে মৃত ঘোষণা করেন। চিকিৎসা পাওয়ার পূর্বেই পথিমধ্যে তার জীবনের ইতি ঘটায় শোকে বিহ্বল হয়ে পড়েন স্বজনেরা। পরে কান্নায় ভেঙে পড়া স্বজনেরা তার মরদেহ নিজ বাসস্থানে ফিরিয়ে নিয়ে আসেন।
আরও পড়ুন: হেজবুত তাওহিদ নিষিদ্ধের দাবি: মাইজদীর মহাসম্মেলন সফলতার আশাবাদ
ঘটনার খবর পেয়ে পীরগঞ্জ থানা পুলিশের একটি দল দ্রুত দুর্ঘটনাস্থল ও নিহতের বাড়িতে উপস্থিত হয়। সরেজমিনে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও প্রাথমিক সুরতহাল তদন্ত শেষে আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করে পুলিশ। ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে পীরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইকবাল হোসেন প্রামানিক গণমাধ্যমকে জানান, ঘটনাটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক। খবর পাওয়া মাত্রই আমাদের থানা পুলিশের তদন্তকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। কোনো ধরনের অভিযোগ না থাকায় এবং বিষয়টি প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত দুর্ঘটনা হওয়ায় নিয়ম অনুযায়ী প্রাথমিক তদন্ত শেষে মৃতদেহ নিহতের পরিবারের নিকট আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়েছে।
এদিকে, বর্ষা মৌসুমে উত্তরবঙ্গের এই অঞ্চলে বজ্রপাতের প্রকোপ দিন দিন উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের মতে, মেঘাচ্ছন্ন আবহাওয়ায় কিংবা বজ্রপাতের আশঙ্কা দেখা দিলে মেটাল বা ধাতব পদার্থের কাছাকাছি অবস্থান করা এবং ইলেকট্রনিক ডিভাইস বিশেষ করে মোবাইল ফোন ব্যবহারের ক্ষেত্রে চরম সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। জানালার গ্রিল বা মেটাল কাঠামোর পাশে দাঁড়িয়ে মোবাইলে কথা বলা অত্যন্ত বিপজ্জনক হতে পারে। অসচেতনতার কারণে যেন এমন অকালমৃত্যুর পুনরাবৃত্তি আর না ঘটে, সে বিষয়ে এলাকার সর্বস্তরের মানুষের মাঝে ব্যাপক সচেতনতা সৃষ্টির দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।