বাকৃবিতে মহানবীকে অবমাননার অভিযোগ: শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ মিছিল

বাকৃবিতে মহানবীকে অবমাননার অভিযোগ: শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ মিছিল
ছবি: সংগৃহীত

প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ

ময়মনসিংহে অবস্থিত বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যায়লে (বাকৃবি) ইসলামী আকীদার প্রতি চরম অবমাননা ও বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যের অভিযোগকে কেন্দ্র করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও চরম অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। ফুড ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি অনুষদের ৬৩তম ব্যাচের শিক্ষার্থী এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী হলের আবাসিক শিক্ষার্থী মুবিন খান গৌরবের বিরুদ্ধে এই আপত্তিকর অভিযোগটি উঠেছে। বিতর্কিত উক্ত ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর থেকেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এক অনাকাঙ্ক্ষিত ও থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছে। মহানবী (সা.)-এর পবিত্র শানে এহেন কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যের প্রতিবাদে ফুঁসে উঠেছেন ক্যাম্পাসের ধর্মপ্রাণ ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা, যা পরবর্তীতে এক বিশাল প্রতিবাদী কর্মসূচিতে রূপ নেয়।

প্রতিবাদের অংশ হিসেবে গত সোমবার বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ প্রাঙ্গণ থেকে এক সুবিশাল বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি ক্যাম্পাসের প্রধান প্রধান সড়ক ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক এলাকা প্রদক্ষিণ করে ধীরে ধীরে প্রক্টর কার্যালয়ে গিয়ে সমবেত হয়। বিক্ষোভ মিছিলে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদ ও দূর-দূরান্তের আবাসিক হলগুলো থেকে হাজার হাজার সাধারণ শিক্ষার্থী এসে উপস্থিত হন। তারা মহানবীর মর্যাদার ওপর যেকোনো আঘাতের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ স্লোগান দেন এবং অভিযুক্তের দৃষ্টান্তমূলক ও ত্বরিত শাস্তি নিশ্চিতকরণের দাবিতে পুরো ক্যাম্পাস মুখরিত করে তোলেন। উপস্থিত আন্দোলনকারীদের দৃঢ় অবস্থান ক্যাম্পাসের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

আরও পড়ুন: কিশোরগঞ্জে কনেকে তুলে নেওয়ার পর তামান্নার ভিডিও বার্তা

প্রক্টর কার্যালয়ের সামনে আয়োজিত সংক্ষপ্তি সমাবেশে উপস্থিত ছাত্রনেতারা ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা অভিযোগের নিরপেক্ষ, সুসংগঠিত এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে সুষ্ঠু তদন্ত সম্পন্ন করার জোর দাবি উত্থাপন করেন। তারা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন যে, কোনো অপরাধীকে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা বিনষ্ট হবে। কৃষি অনুষদের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মুহাম্মদ মাহাদি তার বক্তব্যে বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মতো পবিত্র অঙ্গনে এ ধরনের ঘটনাকে কেবল একটি বিচ্ছিন্ন অনভিপ্রেত ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে আরও যোগ করেন যে, ক্যাম্পাসের অসাম্প্রদায়িক ও শান্ত পরিবেশ বিনষ্ট করার উদ্দেশ্যে এবং ধর্মপ্রাণ শিক্ষার্থীদের ঈমানি অনুভূতিতে আঘাত হেনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পেছনে কোনো সুনির্দিষ্ট চক্রান্তকারী গোষ্ঠী কাজ করছে কিনা, তাও প্রশাসনকে গভীরভাবে খতিয়ে দেখতে হবে।

সমাবেশে অন্যান্য শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি হিসেবে আরেক আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী নাহিদুল ইসলাম বলেন, বিশ্বনবীর সম্মান রক্ষা করা প্রত্যেক ধর্মপ্রাণ মানুষের নৈতিক দায়িত্ব এবং যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ধর্মীয় অবমাননা মূলক অপরাধের বিন্দুমাত্র স্থান থাকতে পারে না। তিনি প্রশাসনকে দ্রুত সময়ের মধ্যে অভিযুক্ত ওই শিক্ষার্থীর ছাত্রত্ব স্থায়ীভাবে বাতিল করার পাশাপাশি সর্বোচ্চ আইনগত শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, শিক্ষার্থীরা ইতিমধ্যে তাদের সুনির্দিষ্ট দাবিগুলো প্রক্টর সাহেবের নিকট আনুষ্ঠানিকভাবে পেশ করেছেন এবং অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ দেখতে চান। শিক্ষার্থীরা জানান, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যদি কালক্ষেপণ না করে দৃশ্যমান কোনো কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ না করে, তবে তারা পরবর্তীতে আরও কঠোর ও সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে বাধ্য হবেন।

আরও পড়ুন: সোনারগাঁয়ের রিসোর্ট কাণ্ডে হত্যার চক্রান্তের দাবি মামুনুল হকের

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আনোয়ার হোসাইন উক্ত উদ্ভূত পরিস্থিতি ও হলে ঘটে যাওয়া ঘটনা সম্পর্কে প্রশাসনিক অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। তিনি জানান, মুবিন খান গৌরবের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠে আসার পরপরই হল প্রশাসন অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পদক্ষেপ গ্রহণ করে। উক্ত অভিযুক্ত শিক্ষার্থীকে তাৎক্ষণিকভাবে নিজ কার্যালয়ে ডেকে এনে লিখিত ও মৌখিক জবাবদিহিতা চাওয়া হয়। মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে উক্ত ছাত্র নিজের কৃতকর্মের ভুল স্বীকার করেন এবং তার অপকর্মের জন্য গভীর অনুশোচনা প্রকাশ করে একটি লিখিত মুচলেকা প্রদান করেন। উদ্ভূত উত্তেজনা ও সার্বিক নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে মুচলেকা সম্পাদনের পর পরই উক্ত শিক্ষার্থী হলের আবাসন ছেড়ে সাময়িকভাবে নিরাপদ স্থানে প্রস্থান করেছেন।

সার্বিক বিশৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে বাকৃবির প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো. আবদুল আলীম জানান, বিশ্ববিদ্যালয় একটি উচ্চতর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং এখানে আইনশৃঙ্খলা ও নৈতিকতার সুনির্দিষ্ট নিয়মাবলী বিদ্যমান রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত শৃঙ্খলাবিধিতে যেকোনো ধর্মের প্রতি অবমাননা, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়ানো কিংবা ধর্মীয় অনুভূতির ওপর আঘাত হানার বিরুদ্ধে কঠোর ও স্পষ্ট আইনি অনুশাসন নির্ধারিত আছে। তিনি শিক্ষার্থীদের আশ্বাস দিয়ে বলেন যে, গঠিত তদন্ত কমিটির মাধ্যমে অভিযোগের প্রতিটি সত্যতা নিরপেক্ষভাবে যাচাই-বাছাই করা হবে। তদন্ত প্রতিবেদনে ঘটনার সত্যতা ও অপরাধ প্রমাণিত হলে বিশ্ববিদ্যালয় আইন এবং দেশের প্রচলিত বিধিমালার আওতায় অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ কঠোরতম আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

উচ্চশিক্ষার প্রাঙ্গণে ধর্মীয় সহনশীলতা রক্ষা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার দাবিতে বাকৃবি প্রাঙ্গণ এখন চরম উত্তপ্ত অবস্থায় রয়েছে। ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বাড়তি সতর্কতামূলক অবস্থান গ্রহণ করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে শিগগিরই তদন্ত কমিটি গঠন ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের অপেক্ষায় মুখিয়ে আছেন হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও সচেতন নাগরিক সমাজ। প্রত্যেকেই চান একটি সুষ্ঠু নিরপেক্ষ তদন্তের মধ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক পরিবেশ বজায় থাকুক এবং অপরাধীর উপযুক্ত বিচার নিশ্চিত হোক।

সূত্র: দিগন্ত বাংলা নিউজ ডেস্ক

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন