জাতীয় ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ
নামের বানান ভুল: বরখাস্ত জাতীয় চিড়িয়াখানার কিউরেটর
একটি বিরল প্রজাতির সাদা মহিষ, যার নাম রাখা হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’। এই মহিষটি নিয়ে দেশজুড়ে যেমন কৌতূহল ছিল, তেমনি ছিল ব্যাপক আলোচনা। তবে সেই মহিষের নামের বানান ভুল লেখাকে কেন্দ্র করে এবার বড় ধরনের প্রশাসনিক শাস্তির মুখে পড়লেন মিরপুর জাতীয় চিড়িয়াখানার কিউরেটর ডা. মো. আতিকুর রহমান। সরকারি দায়িত্বে অবহেলা এবং অসদাচরণের অভিযোগে তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে, যা বর্তমানে প্রশাসনিক মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত যেভাবে
বিরল অ্যালবিনো বা সাদা মহিষটি তার শারীরিক বৈশিষ্ট্য এবং মাথার সোনালি চুলের কারণে ঈদুল আজহার সময় কোরবানির হাটে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। প্রায় ৭০০ কেজি ওজনের এই মহিষটি দেখতে গোলাপি-সাদা রঙের ছিল, যার ফলে খামারিরা কৌতুকবশত এর নাম রাখেন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’। মহিষটির জনপ্রিয়তা ও ক্রেতার ভিড় সামলাতে এবং দর্শনার্থীদের কৌতূহল মেটাতে সরকার প্রাণীটিকে সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত নেয়। পরবর্তীকালে কেরানীগঞ্জ মডেল থানা পুলিশের মধ্যস্থতায় মহিষটিকে জাতীয় চিড়িয়াখানায় স্থানান্তর করা হয়।
চিড়িয়াখানায় মহিষটি প্রদর্শনের জন্য একটি তথ্যফলক বা নেমপ্লেট তৈরি করা হয়েছিল। সেখানে ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ নামের জায়গায় ভুলবশত ‘ডোনাল্ড ট্টাম্প’ লেখা হয়। এই বানান বিভ্রাটটি অত্যন্ত দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়। মুহূর্তের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে নেটিজেনরা ট্রল ও ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য শুরু করেন, যা পরবর্তীতে সরকারের উচ্চপর্যায়ের নজরে আসে।
আরও পড়ুন: দিল্লিতে ৫ তলা ভবন ধস: শতাধিক আটকা
মন্ত্রণালয়ের কঠোর সিদ্ধান্ত
বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় ডা. মো. আতিকুর রহমানের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়। শনিবার মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. দেলোয়ার হোসেন স্বাক্ষরিত একটি প্রজ্ঞাপনে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করার আদেশ জারি করা হয়। প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয় যে, সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর বিধি ৩(খ) অনুযায়ী অসদাচরণের দায়ে তাকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। সাময়িক বরখাস্তকালীন সময়ে তিনি সরকারি নিয়ম অনুযায়ী কেবল খোরপোষ ভাতা পাবেন।
যদিও নামের বানান ভুলের বিষয়টি প্রজ্ঞাপনে মুখ্য কারণ হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে, তবে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সূত্রগুলো জানিয়েছে, ডা. আতিকুর রহমানের বিরুদ্ধে আরও একাধিক প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে, যা তার বরখাস্তের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে।
নতুন নেতৃত্বের আগমন
বরখাস্তের পরপরই মন্ত্রণালয় থেকে পৃথক একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে ডা. আতিকুর রহমানকে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিচালক (সমমান) পদে বদলি করা হয়। তাকে ঢাকাস্থ লাইভস্টক, ভেটেরিনারি অ্যান্ড ডেইরি ডেভেলপমেন্ট (এলভিডিডি) রিভাইভড প্রকল্পের পরিচালক হিসেবে নতুন দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে ওই প্রকল্পে কর্মরত জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. হাবিবুর রহমানকে জাতীয় চিড়িয়াখানার নতুন কিউরেটর হিসেবে নিয়োগ প্রদান করা হয়েছে।
বিতর্ক ও সংশোধন
প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার আগেই চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ সমালোচনার মুখে পড়েছিল। ভুল বানানটি সামনে আসার পর নামফলকটি দ্রুত পরিবর্তন করা হয়। সেই সময় প্রদর্শনী বোর্ডে প্রাণীটির নাম পরিবর্তন করে শুধু ‘সাদা মহিষ’ লিখে দেওয়া হয়েছিল। তবুও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায় এড়াতে পারেননি তৎকালীন কিউরেটর।
দিগন্ত বাংলা নিউজের পর্যবেক্ষণ
সরকারি প্রতিষ্ঠানে তথ্যের সঠিক উপস্থাপন অত্যন্ত জরুরি। আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত কোনো প্রাণীর পরিচিতি বোর্ডে বানান ভুল হওয়া প্রশাসনিক দায়বদ্ধতার অভাবকেই নির্দেশ করে। তবে এটি কেবল নামের বানান ভুলের শাস্তি নাকি এর পেছনে অন্য কোনো বড় প্রশাসনিক ত্রুটি রয়েছে, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন থেকেই যায়। আশা করা যায়, নতুন কিউরেটরের নেতৃত্বে জাতীয় চিড়িয়াখানার ব্যবস্থাপনা ও তথ্য প্রদর্শনীতে আরও সতর্কতা ও পেশাদারিত্ব বজায় থাকবে।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।