স্বাস্থ্য খাতে ইতিহাসের সর্বোচ্চ বাজেট ঘোষণা করবে বিএনপি সরকার: স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী

স্বাস্থ্য খাতে ইতিহাসের সর্বোচ্চ বাজেট ঘোষণা করবে বিএনপি সরকার: স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী
ছবি: সংগৃহীত

জাতীয় ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ

স্বাস্থ্য খাতে ইতিহাসের সর্বোচ্চ বাজেট ঘোষণা করবে বিএনপি সরকার: জাতীয় প্রেসক্লাবে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন এবং সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় আধুনিক চিকিৎসা সেবা পৌঁছে দিতে এক যুগান্তকারী ও ঐতিহাসিক ঘোষণা দিয়েছে বর্তমান বিএনপি সরকার। আগামী জাতীয় বাজেটে দেশের স্বাস্থ্য খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এবং রেকর্ড পরিমাণ বাজেট বরাদ্দ করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। দেশের প্রতিটি নাগরিকের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এবং বৈষম্যহীন চিকিৎসা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে এই মেগা বাজেট ঘোষণা করা হবে।

আজ বুধবার (১০ জুন, ২০২৬) সকালে রাজধানী ঢাকার জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত এই ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা, বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর উত্তমের ৪৫তম শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে এই বিশেষ আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দূরদর্শী নেতৃত্ব ও স্বাস্থ্য ভাবনা

আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার আধুনিকায়নে বর্তমান সরকারের রূপরেখা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, "মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের স্বাস্থ্য খাতকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। সুস্বাস্থ্যের বাংলাদেশ গড়ার যে স্বপ্ন তিনি দেখছেন, তা বাস্তবায়নে অর্থের কোনো ঘাটতি থাকবে না। আর সেই লক্ষ্যেই আগামী জাতীয় বাজেটে ইনশাআল্লাহ আমাদের বিএনপি সরকার স্বাস্থ্য খাতে ইতিহাসের সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করতে যাচ্ছে।"

তবে শুধু বিশাল অঙ্কের বাজেট বরাদ্দ করলেই যে স্বাস্থ্য খাতের সংকট দূর হবে না, সে কথাও অকপটে স্বীকার করেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি দেশের চিকিৎসক, নার্স এবং মাঠ পর্যায়ের সকল স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রতি একযোগে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, "একটি বড় বাজেট ঘোষণা করাই আমাদের একমাত্র লক্ষ্য নয়। চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের সম্মিলিত প্রয়াসে এই বিশাল বাজেটকে শতভাগ স্বচ্ছতা ও সততার সাথে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় বাস্তবায়ন করতে হবে। তবেই দেশের দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত মানুষ প্রকৃত চিকিৎসা সেবার সুফল ভোগ করতে পারবে।"

ই-হেলথ কার্ড: ডিজিটাল হেলথ সিস্টেমের নতুন বিপ্লব

বক্তব্যের এক পর্যায়ে ড. এম এ মুহিত সরকারের একটি অত্যন্ত আধুনিক ও বৈপ্লবিক স্বাস্থ্য কর্মসূচির ঘোষণা দেন। তিনি জানান, বর্তমান সরকার দেশের প্রতিটি নাগরিককে একটি একক ছাতার নিচে এনে একটি সমন্বিত ও যুগোপযোগী ‘ডিジタル হেলথ সিস্টেম’ বা ডিজিটাল স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে কাজ করছে। এই মহাপরিকল্পনার মূল চাবিকাঠি হলো ‘ই-হেলথ কার্ড’ (e-Health Card)।

আরও পড়ুন: গ্রেপ্তারের ৪ দিনের মাথায় জামিন পেলেন আ. লীগ নেতা মঞ্জু মোল্লা

গ্রেপ্তারের ৪ দিনের মাথায় জামিন পেলেন আ. লীগ নেতা মঞ্জু মোল্লা

এই কার্ডের মাধ্যমে দেশের প্রতিটি প্রান্তের মানুষের স্বাস্থ্যের সমস্ত ডেটা বা তথ্য একটি কেন্দ্রীয় সার্ভারে সংরক্ষিত থাকবে।

ই-হেলথ কার্ডের প্রধান সুবিধা ও বৈশিষ্ট্যসমূহ:

  • তথ্য সংরক্ষণ: একজন রোগীর পূর্বের রোগ, ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন, চিকিৎসার ইতিহাস এবং ল্যাব টেস্টের সমস্ত রিপোর্ট এই কার্ডে ডিজিটাল পদ্ধতিতে সংরক্ষিত থাকবে।

  • অপ্রয়োজনীয় টেস্ট বন্ধ: অনেক সময় রোগীকে একই টেস্ট বারবার করাতে হয়। এই কার্ড থাকলে দেশের যেকোনো হাসপাতালের ডাক্তার এক ক্লিকেই আগের রিপোর্ট দেখতে পারবেন, যা অপ্রয়োজনীয় ও অতিরিক্ত টেস্ট করানোর প্রবণতা বন্ধ করবে।

  • ওষুধের অপচয় রোধ: রোগীর পূর্বের প্রেসক্রিপশন দেখে সুনির্দিষ্ট ওষুধ প্রদান করা যাবে, ফলে যত্রতত্র ও অতিরিক্ত ওষুধ সেবনের মানসিকতা দূর হবে এবং সাধারণ মানুষের পকেটের টাকা বাঁচবে।

উপজেলা হাসপাতালগুলোকে ১০১ বেডে উন্নীতকরণের মহাপরিকল্পনা

গ্রামীণ এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একটি বড় ঘোষণা দেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, দেশের গ্রামীণ মানুষ যেন সামান্য চিকিৎসার জন্য রাজধানী ঢাকা বা বিভাগীয় শহরের মেডিকেল কলেজগুলোতে ভিড় না করতে হয়, সেজন্য দেশের প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের শয্যা সংখ্যা বাড়িয়ে ন্যূনতম ১০১ বেডে উন্নীত করা হবে।

চিকিৎসা ব্যবস্থার এই আধুনিকায়নে শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন বা নতুন ভবন নির্মাণই শেষ কথা নয়, এর পাশাপাশি জনবল সংকট দূর করাকে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে সরকার। কারণ, হাসপাতাল বড় হলেও যদি পর্যাপ্ত ডাক্তার ও নার্স না থাকে, তবে সাধারণ মানুষ সেবা পাবে না। এই বিষয়টিকে মাথায় রেখেই সরকার ব্যাপক জনবল নিয়োগের প্রস্তুতি গ্রহণ করছে।

তৃণমূল পর্যায়ে ১ লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ: ৮০ হাজারই নারী

দেশের তৃণমূল পর্যায়ে তথা গ্রাম-গঞ্জে স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রাথমিক চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে এক বিশাল নিয়োগের ঘোষণা দিয়েছেন ড. এম এ মুহিত। তিনি জানান, খুব দ্রুত তৃণমূল পর্যায়ে কাজ করার জন্য ১ লাখ (১,০০,০০০) নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে।

এই নিয়োগ প্রক্রিয়ার সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও ইতিবাচক দিক হলো নারীর ক্ষমতায়ন। সরকার এই ১ লাখ পদের মধ্যে ৮০ হাজার (৮০,০০০) পদই নারীদের জন্য সংরক্ষিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অর্থাৎ, মোট নিয়োগপ্রাপ্ত স্বাস্থ্যকর্মীদের ৮০ শতাংশই হবেন নারী। এই নারী স্বাস্থ্যকর্মীরা প্রত্যন্ত অঞ্চলের মা ও শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা, প্রসবকালীন সেবা এবং সাধারণ পুষ্টি সচেতনতা বাড়াতে সরাসরি ভূমিকা পালন করবেন।

সরকারের প্রস্তাবিত স্বাস্থ্য খাতের নতুন সংস্কারসমূহ:

কর্মসূচির নামলক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকর্মসংস্থান/সুবিধা
ই-হেলথ কার্ডডিজিটাল স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গঠনঅপ্রয়োজনীয় টেস্ট ও ওষুধের অপচয় রোধ
হাসপাতাল আধুনিকায়নউপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালের শয্যা বৃদ্ধিপ্রতিটি হাসপাতালে ন্যূনতম ১০১ বেড
তৃণমূল স্বাস্থ্যকর্মীগ্রামীণ স্বাস্থ্য সচেতনতা ও সেবা বৃদ্ধি১ লাখ নতুন কর্মী (৮০ হাজারই নারী)
ডাক্তার ও নার্স নিয়োগআন্তর্জাতিক মানদণ্ড অর্জনচিকিৎসকদের ঘাটতি মেটাতে মেগা নিয়োগ

নতুন ডাক্তার ও নার্স নিয়োগের প্রস্তুতি: ঘুচবে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের ব্যবধান

বাংলাদেশের চিকিৎসা খাতের দীর্ঘদিনের একটি বড় সমস্যা হলো জনসংখ্যা অনুযায়ী ডাক্তার ও নার্সের চরম ঘাটতি। এই ঘাটতি দূর করতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বড় আকারের নতুন চিকিৎসক নিয়োগের জন্য একটি বিশেষ খসড়া তৈরি করেছে। দ্রুতই এই মেগা নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হবে বলে আশ্বস্ত করেছেন প্রতিমন্ত্রী।

তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী একজন ডাক্তারের বিপরীতে যে পরিমাণ নার্স থাকা প্রয়োজন, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় সেই অনুপাতের একটি বড় ব্যবধান বা ঘাটতি রয়েছে। এই আইনি ও পেশাদারী ব্যবধান ঘুচিয়ে দেশের নার্সিং সেবার মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যেতে নার্সদের উচ্চতর প্রশিক্ষণ এবং নতুন পদ সৃষ্টির মাধ্যমে নার্সিং সেবার পরিধি ব্যাপকভাবে বাড়ানো হবে।

আলোচনা সভার প্রধান অতিথি ও অন্যান্য শীর্ষ নেতৃবৃন্দের বক্তব্য

জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এই স্মরণসভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সরকারের মাননীয় স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তিনি তাঁর প্রধান অতিথির বক্তব্যে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করে বলেন, "শহীদ জিয়ার ১৯ দফা কর্মসূচির অন্যতম মূল স্তম্ভ ছিল দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা। আজ তাঁরই সুযোগ্য উত্তরসূরি তারেক রহমানের নেতৃত্বে এই বিএনপি সরকার সেই স্বপ্নকেই বাস্তবে রূপ দিতে কাজ করে যাচ্ছে।"

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব)-এর সাবেক মহাসচিব বিশিষ্ট চিকিৎসক ডা. মো. আব্দুস সালাম। আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন ড্যাবের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অধ্যাপক ডা. মো. আবুল কেনান। পুরো অনুষ্ঠানটির সার্বিক তত্ত্বাবধান ও পরিচালনায় ছিলেন সংগঠনটির দূরদর্শী মহাসচিব ডা. মো. জহিরুল ইসলাম শাকিল। সভায় বক্তারা সকলেই দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার এই নতুন রূপরেখাকে স্বাগত জানান এবং এর সফল বাস্তবায়নে চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন।

উপসংহার: সুস্বাস্থ্যের বাংলাদেশের অভিমুখে এক নতুন যাত্রা

একটি দেশের সার্বিক উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি হলো একটি সুস্থ ও সবল জাতি। স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিতের এই দূরদর্শী বক্তব্য ও বাজেট ঘোষণার আশ্বাস প্রমাণ করে যে, দেশের স্বাস্থ্য খাতকে ঢেলে সাজাতে বর্তমান বিএনপি সরকার সম্পূর্ণ নতুন এবং বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করছে। ই-হেলথ কার্ড চালু, ১ লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ এবং উপজেলা হাসপাতালগুলোর আধুনিকায়ন সম্পন্ন হলে বাংলাদেশের চিকিৎসা ক্ষেত্রে একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে।

সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা—তারা যেন নিজ এলাকাতেই স্বল্পমূল্যে এবং হয়রানিমুক্তভাবে উন্নত চিকিৎসা পান। সরকারের এই মেগা পরিকল্পনা ও ইতিহাসের সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে সুস্বাস্থ্যের বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন আর বেশি দূরে নয়। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের এমন সব গুরুত্বপূর্ণ ও বস্তুনিষ্ঠ খবরের ব্রেকিং আপডেট সবার আগে পেতে নিয়মিত ভিজিট করুন দিগন্ত বাংলা নিউজ পোর্টালে।

 

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন