গ্রেপ্তারের ৪ দিনের মাথায় জামিন পেলেন আ. লীগ নেতা মঞ্জু মোল্লা

গ্রেপ্তারের ৪ দিনের মাথায় জামিন পেলেন আ. লীগ নেতা মঞ্জু মোল্লা
ছবি: সংগৃহীত

জাতীয় ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ

গ্রেপ্তারের ৪ দিনের মাথায় জামিন পেলেন আ. লীগ নেতা মঞ্জু মোল্লা: বরিশালের রাজনীতিতে নতুন মোড়

বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলার স্থানীয় রাজনীতিতে অত্যন্ত প্রভাবশালী ও পরিচিত মুখ, টানা তিনবারের (হ্যাটট্রিক) বিজয়ী সাবেক পৌর মেয়র এবং উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম সালেহ্ মঞ্জু মোল্লা আদালত থেকে জামিন পেয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার ঠিক চার দিনের মাথায় আইনি লড়াই শেষে তিনি আদালত থেকে মুক্ত হলেন।

আজ বুধবার (১০ জুন, ২০২৬) দুপুর ১টার দিকে বরিশাল অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিজ্ঞ বিচারক মো. নাহিদ ইসলাম উভয় পক্ষের দীর্ঘ আইনি শুনানি শেষে তাঁর জামিন মঞ্জুর করেন। মঞ্জু মোল্লার এই জামিনের খবরের পর তাঁর আইনিজীবী প্যানেল এবং স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

মধ্যরাতে নিজ বাসা থেকে যেভাবে গ্রেপ্তার হন সাবেক মেয়র

আইনি ও পুলিশি সূত্র থেকে জানা গেছে, গত ৬ জুন (২০২৬) দিবাগত রাত তথা গভীর রাতে এক ঝটিকা অভিযান চালায় স্থানীয় থানা পুলিশ। রাত আনুমানিক দেড়টার দিকে বানারীপাড়া পৌর শহরের ৪ নম্বর ওয়ার্ডে অবস্থিত বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম সালেহ্ মঞ্জু মোল্লার নিজস্ব বাসভবন ঘেরাও করে পুলিশ প্রশাসন। এরপর চিরুনি অভিযান চালিয়ে তাঁর শয়নকক্ষ থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।

মধ্যরাতে একজন প্রবীণ রাজনীতিবিদ এবং বীর মুক্তিযোদ্ধাকে গ্রেপ্তারের এই খবরটি মুহূর্তের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং স্থানীয় বানারীপাড়া ও সমসাময়িক বরিশাল জেলা রাজনীতিতে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। গ্রেপ্তারের পর তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশের পক্ষ থেকে মামলার সুনির্দিষ্ট কারণ সাধারণ মানুষের সামনে খোলাসা করা হয়নি, যা নিয়ে এক ধরনের রহস্যের দানা বেঁধেছিল।

অজ্ঞাতনামা আসামি হিসেবে আদালতে প্রেরণ: মামলার নেপথ্য কাহিনী

গত ৬ জুন মধ্যরাতে গ্রেপ্তারের পরদিন, অর্থাৎ ৭ জুন (২০২৬) সকালে গোলাম সালেহ্ মঞ্জু মোল্লাকে আনুষ্ঠানিকভাবে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি করা হয়। পুলিশ প্রশাসন উপজেলার চাখার ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মনির সরদারের দায়ের করা একটি পুরোনো রাজনৈতিক মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখায়।

মামলার এজাহার অনুযায়ী, এটি একটি বিস্ফোরক দ্রব্য আইন এবং ঘরপোড়া (অগ্নিসংযোগ) সংক্রান্ত অত্যন্ত স্পর্শকাতর মামলা। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, মূল মামলার এজাহারে গোলাম সালেহ্ মঞ্জু মোল্লার নাম সরাসরি উল্লেখ ছিল না। মনির সরদারের দায়ের করা ওই মামলায় তিনি ছিলেন একজন সম্পূর্ণ 'অজ্ঞাতনামা আসামি'।

আরও পড়ুন: ইরান সমর্থকদের সব টিকিট বাতিল করল ফিফা: বিশ্বকাপে রাজনৈতিক ছায়া

ইরান সমর্থকদের সব টিকিট বাতিল করল ফিফা: বিশ্বকাপে রাজনৈতিক ছায়া

তদন্তকারী কর্মকর্তার প্রাথমিক প্রতিবেদন ও সন্দেহের ওপর ভিত্তি করে ৭ জুন সকালে তাঁকে অজ্ঞাতনামা আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার দেখিয়ে কঠোর পুলিশি পাহারায় বরিশাল জেলা আদালতে পাঠানো হয়। সেদিন বিজ্ঞ আদালত জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন।

আদালত প্রাঙ্গণে আইনজীবীদের যুক্তি ও দীর্ঘ শুনানি

আজ বুধবার (১০ জুন) জামিন শুনানির দিন ধার্য থাকায় সকাল থেকেই বরিশাল অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত প্রাঙ্গণে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়। দুপুর ১টার দিকে মামলার মূল নথিপত্র পর্যালোচনা করে শুনানির কাজ শুরু করেন বিচারক মো. নাহিদ ইসলাম।

শুনানিতে আসামিপক্ষের প্রবীণ ও বিজ্ঞ আইনজীবীরা যুক্তি দেখান যে, গোলাম সালেহ্ মঞ্জু মোল্লা একজন বয়োবৃদ্ধ মানুষ এবং দেশের একজন সম্মানিত বীর মুক্তিযোদ্ধা। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার বানিয়ে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে দায়ের করা একটি মামলায় অজ্ঞাতনামা হিসেবে তাঁর নাম জড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এজাহারে তাঁর সুনির্দিষ্ট কোনো অপরাধের বিবরণ বা প্রমাণ নেই। তাছাড়া তাঁর শারীরিক অসুস্থতার বিষয়টিও আদালতের সামনে গুরুত্বের সাথে তুলে ধরা হয়।

অন্যদিকে, রাষ্ট্রপক্ষ ও বাদীপক্ষের আইনজীবীরা জামিনের তীব্র বিরোধিতা করে যুক্তি উপস্থাপন করেন। উভয় পক্ষের দীর্ঘ সওয়াল-জওয়াব এবং আইনি বিতর্ক বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞ বিচারক মো. নাহিদ ইসলাম সাবেক মেয়র মঞ্জু মোল্লার বয়স, সামাজিক মর্যাদা ও বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দেশের প্রতি তাঁর অবদানের কথা বিবেচনা করে জামিনের আদেশ জারি করেন।

গোলাম সালেহ্ মঞ্জু মোল্লার আইনি ও রাজনৈতিক প্রোফাইল:

বিষয়বিবরণ ও তথ্য
পূর্ণ নামবীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম সালেহ্ মঞ্জু মোল্লা
রাজনৈতিক পদবীসাবেক সভাপতি, বানারীপাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগ
জনপ্রতিনিধিত্বসাবেক পৌর মেয়র (টানা ৩ বার বিজয়ী)
গ্রেপ্তারের তারিখ৬ জুন, ২০২৬ (রাত ১:৩০ মিনিট)
জামিনের তারিখ১০ জুন, ২০২৬ (দুপুর ১:০০ টা)
আদালতের নামবরিশাল অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত

বানারীপাড়ার স্থানীয় রাজনীতিতে মঞ্জু মোল্লার প্রভাব

বরিশাল জেলার বানারীপাড়া উপজেলার রাজনীতিতে গোলাম সালেহ্ মঞ্জু মোল্লা এক পরিচিত ও প্রাচীন নাম। তিনি শুধু উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতিই নন, বরং দীর্ঘ সময় ধরে বানারীপাড়া পৌরসভার মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। স্থানীয় নির্বাচনে টানা তিনবার মেয়র নির্বাচিত হয়ে তিনি 'হ্যাটট্রিক মেয়র' হিসেবে এক অনন্য রাজনৈতিক রেকর্ড গড়েছিলেন।

পৌরসভার উন্নয়ন, গ্রামীণ অবকাঠামো নির্মাণ এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্থানীয় জনগণের একটি বড় অংশের মাঝে তাঁর ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হলেও, এই প্রথম কোনো বিস্ফোরক মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার হতে হয়েছিল। স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তাঁর এই ৪ দিনের কারাবাস ও পরবর্তীতে দ্রুত জামিন লাভ বানারীপাড়ার আগামী দিনের রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করবে।

মামলার বাদী ও এজাহারের বিস্তারিত বিবরণ

যে মামলার ওপর ভিত্তি করে এই প্রবীণ নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, তার বাদী হলেন চাখার ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মনির সরদার। গত রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় বানারীপাড়া ও চাখার এলাকায় ঘটা বিভিন্ন সহিংস ঘটনা, ককটেল বিস্ফোরণ এবং বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এই মামলাটি দায়ের করা হয়েছিল।

বাদীপক্ষের দাবি, তৎকালীন সময়ে স্থানীয় আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের ইশারা ও মদদেই বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীদের ওপর হামলা ও ঘরপোড়া দেওয়া হয়েছিল। তবে আসামিপক্ষের রাজনৈতিক সহকর্মীদের দাবি, মনির সরদার সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির ফায়দা লুটতে এবং প্রবীণ এই নেতাকে হয়রানি করতেই অজ্ঞাতনামা কোটায় তাঁর নাম ঢুকিয়ে দিয়েছেন।

জামিন পরবর্তী প্রতিক্রিয়া ও আইন-শৃঙ্খলার পরিস্থিতি

আদালত কর্তৃক জামিন মঞ্জুর করার পর আইনি প্রক্রিয়া শেষে আজ বিকেলের মধ্যেই গোলাম সালেহ্ মঞ্জু মোল্লা বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্ত হতে পারেন বলে তাঁর পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে। জামিনের খবরটি বানারীপাড়ায় পৌঁছানোর পর তাঁর সমর্থক ও অনুসারীদের মাঝে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও, কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

বানারীপাড়া থানা পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, মহামান্য আদালতের আদেশের প্রতি তাঁরা সম্পূর্ণ শ্রদ্ধাশীল। জামিনের কাগজ কারাগারে পৌঁছালে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হবে। তবে এলাকার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং যেকোনো ধরনের রাজনৈতিক উত্তেজনা প্রতিরোধে পুলিশি টহল জোরদার করা হয়েছে।

দেশের জাতীয়, আঞ্চলিক ও স্থানীয় রাজনীতির যেকোনো ব্রেকিং এবং নির্ভরযোগ্য আপডেট সবার আগে পেতে নিয়মিত ভিজিট করুন দিগন্ত বাংলা নিউজ পোর্টালে।

 

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন