আন্তর্জাতিক ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ
বিশ্বকাপ শুরুর মাত্র ১ দিন আগে বড় ধাক্কা: ইরান সমর্থকদের সমস্ত টিকিট বাতিল করল ফিফা
বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং মর্যাদাপূর্ণ ক্রীড়া উৎসব 'ফিফা বিশ্বকাপ' শুরু হতে বাকি আর মাত্র ১ দিন। যখন বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের মাঝে টানটান উত্তেজনা আর উন্মাদনা বিরাজ করছে, ঠিক তখনই আন্তর্জাতিক ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ামক সংস্থা ফিফা (FIFA) থেকে এলো এক চরম বিতর্কিত ও হতাশাজনক সিদ্ধান্ত। টুর্নামেন্ট শুরুর ঠিক আগ মুহূর্তে আকস্মিকভাবে ইরান জাতীয় ফুটবল দলের সমর্থকদের জন্য বরাদ্দকৃত অফিশিয়াল কোটার সমস্ত টিকিট বাতিল ঘোষণা করেছে ফিফা।
ফিফার এই আকস্মিক ও নজিরবিহীন সিদ্ধান্তের ফলে হাজার হাজার ইরানি ফুটবল সমর্থক, যারা দীর্ঘদিনের ভিসা জটিলতা, চড়া মূল্যের বিমান টিকিট এবং হোটেল বুকিংসহ ভ্রমণের সমস্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছিলেন, তারা এখন স্টেডিয়ামে বসে নিজেদের প্রিয় দলের খেলা দেখা থেকে বঞ্চিত হলেন। বৈশ্বিক এই মহোৎসবের একেবারে দ্বারপ্রান্তে এসে এমন সিদ্ধান্তকে মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশটির ফুটবল ইতিহাসে একটি বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ক্ষোভে ফুঁসছে ইরান ফুটবল ফেডারেশন: তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ
ফিফার এই চরম ও একপাক্ষিক সিদ্ধান্তের পর তীব্র প্রতিক্রিয়া ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে ইরানের ফুটবল ফেডারেশন (FFIRI)। গতকাল মঙ্গলবার (৯ জুন, ২০২৬) ইরান ফুটবল ফেডারেশনের পক্ষ থেকে একটি অত্যন্ত কঠোর ও আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রকাশ করা হয়েছে, যেখানে এই তথ্যটি নিশ্চিত করা হয়।
ইরানি ফেডারেশন তাদের বিবৃতিতে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে যে, বিশ্বকাপের মতো একটি বৈশ্বিক ও নিরপেক্ষ মঞ্চে টুর্নামেন্ট শুরুর মাত্র ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা আগে এমন বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ফেডারেশনের মতে, ফিফার এই পদক্ষেপ সম্পূর্ণভাবে ফুটবলের মূল চেতনা এবং বিশ্ব ফুটবলের ভ্রাতৃত্ববোধের পরিপন্থী। তারা এটিকে আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে "নোংরা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ" এবং পশ্চিমা শক্তির চাপিয়ে দেওয়া এজেন্ডা হিসেবে আখ্যায়িত করে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দা জানিয়েছে।
ফিফার নিজস্ব নিয়মের লঙ্ঘন? কী বলছে কোটা নীতি?
আন্তর্জাতিক ফুটবল ফেডারেশনের (FIFA) অফিশিয়াল নিয়ম এবং গাইডলাইন অনুযায়ী, বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী প্রতিটি রাষ্ট্র বা জাতীয় ফুটবল ফেডারেশন তাদের দলের প্রতিটি ম্যাচের মোট ধারণক্ষমতার বা মোট টিকিটের ন্যূনতম ৮ শতাংশ (8%) অফিশিয়াল কোটা হিসেবে পেয়ে থাকে। এই কোটার মূল উদ্দেশ্য হলো—যাতে অংশগ্রহণকারী দেশের ফুটবল ফেডারেশনগুলো তাদের নিজস্ব নাগরিকদের এবং কট্টর সমর্থকদের মাঝে টিকিটগুলো সুশৃঙ্খলভাবে বণ্টন করতে পারে।
আরও পড়ুন: আর্জেন্টিনার ৬৮ বছরের পুরনো রেকর্ড ভাঙলেন মেসি, অনন্য উচ্চতায় এলএমটেন
ইরান ফুটবল ফেডারেশন (FFIRI) যথানিয়মে ফিফার সমস্ত লিগ্যাল এবং অফিশিয়াল প্রটোকল বা প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই টিকিটের আবেদন করেছিল এবং সাধারণ ইরানি সমর্থকদের মাঝে তা বিক্রির প্রক্রিয়াও প্রায় শেষ করে এনেছিল।
ফেডারেশন তাদের বিবৃতিতে ক্ষোভ প্রকাশ করে জানায়:
"অফিশিয়াল এবং আইনি প্রক্রিয়া অত্যন্ত নিখুঁতভাবে অনুসরণ করে অসংখ্য ইরানি ফুটবল সমর্থক টিকিট সংগ্রহ করেছিলেন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ম্যাচ দেখার জন্য তাদের জীবনযাত্রার সমস্ত পরিকল্পনা সাজিয়েছিলেন। এর পরও শেষ মুহূর্তে এসে তাদের টিকিট অবৈধভাবে বাতিল করা হয়েছে। ইরানি নাগরিকদের তাদের এই আইনসম্মত এবং অফিশিয়াল অধিকার থেকে বঞ্চিত করা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার মূল সমতার নীতি এবং মানবাধিকারের পরিপন্থী।"
নেপথ্যে কি চলমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা?
ইরানি ফেডারেশন তাদের আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে সরাসরি কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা সংস্থার নাম উল্লেখ না করলেও, তাদের ইঙ্গিতে পরিষ্কার যে এই সিদ্ধান্তের পেছনে আন্তর্জাতিক রাজনীতির কূটচাল ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ জড়িত রয়েছে।
উল্লেখ্য, চলতি বছরের (২০২৬) ফেব্রুয়ারির শেষের দিক থেকে মধ্যপ্রাচ্যের পারমাণবিক পরাশক্তি ইরানের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের চরম সামরিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনা চলছে। এই ত্রিদেশীয় যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং ভূ-রাজনৈতিক উত্তাপের কালো ছায়া এবার সরাসরি এসে পড়েছে ফুটবলের সবুজ মাঠে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই বিশ্বকাপে ইরানি নাগরিকদের ব্যাপক সমাগম ঠেকাতেই নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক অজুহাতে ফিফাকে দিয়ে এই কাজটি করানো হয়ে থাকতে পারে।
গ্রুপ 'জি' (Group G)-তে ইরানের ম্যাচের সময়সূচি ও ভেন্যু:
| তারিখ (২০২৬) | প্রতিপক্ষ দল | ম্যাচ ভেন্যু (শহর) | বর্তমান পরিস্থিতি |
| ১৫ জুন | নিউজিল্যান্ড | লস অ্যাঞ্জেলেস, যুক্তরাষ্ট্র | ইরানি সমর্থক নিষিদ্ধ |
| ২১ জুন | বেলজিয়াম | টেক্সাস/মেক্সিকো সীমান্ত | ইরানি সমর্থক নিষিদ্ধ |
| ২৬ জুন | মিশর | সিয়াটল, যুক্তরাষ্ট্র | ইরানি সমর্থক নিষিদ্ধ |
বেস ক্যাম্প পরিবর্তন: অ্যারিজোনা থেকে মেক্সিকোর টিজুয়ানাতে ইরান দল
চলমান রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অস্থিরতার কারণে শুধু সমর্থকরাই নন, স্বয়ং ইরান জাতীয় ফুটবল দলকেও চরম ভোগান্তির শিকার হতে হয়েছে। বিশ্বকাপের মূল প্রস্তুতি পর্বের জন্য ইরান দল প্রথমে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা অঙ্গরাজ্যে তাদের অফিশিয়াল বেস ক্যাম্প স্থাপন করার পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে চরম নিরাপত্তা কড়াকড়ি এবং ভিসা সংক্রান্ত চরম জটিলতা সৃষ্টির কারণে ইরান দল শেষ মুহূর্তে তাদের বেস ক্যাম্প পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়।
তারা আমেরিকার অ্যারিজোনা থেকে তাদের ক্যাম্প সরিয়ে মেক্সিকোর সীমান্ত শহর টিজুয়ানাতে (Tijuana) স্থানান্তর করে। গত ৭ জুন (২০২৬) ইরান দল মেক্সিকোতে এসে পৌঁছায় এবং বর্তমানে সেখানেই তারা বিশ্বকাপের চূড়ান্ত প্রস্তুতি সারছে। একটি বিশ্বকাপ দলের জন্য টুর্নামেন্ট শুরুর মাত্র কয়েকদিন আগে এভাবে ক্যাম্প পরিবর্তন করা মানসিকভাবে কতটা বিপর্যয়কর, তা সহজেই অনুমেয়।
ফুটবলাররা ভিসা পেলেও স্টাফদের নিয়ে জটিলতা বহাল
আন্তর্জাতিক ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন এবং বিভিন্ন মহলের ব্যাপক জলঘোলা এবং কূটনৈতিক চাপাচাপির পর, গত সপ্তাহে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন অবশেষে ইরান দলের মূল স্কোয়াডের সমস্ত ফুটবলারকে আমেরিকার ভিসা প্রদান করতে সম্মত হয়। তবে সেখানেও রয়ে গেছে বড় রকমের বৈষম্য।
দলের মূল খেলোয়াড়রা ভিসা পেলেও, ইরান জাতীয় দলের বেশ কয়েকজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারিগরি স্টাফ, ফিজিও, ট্যাকটিক্যাল অ্যানালিস্ট এবং ম্যানেজমেন্টের প্রধান কর্মকর্তাদের এখনও পর্যন্ত আমেরিকার ভিসা দেওয়া হয়নি। এর ফলে কোচিং স্টাফদের পূর্ণাঙ্গ সহায়তা ছাড়াই ইরান দলকে মাঠে নামতে হতে পারে, যা মাঠের পারফরম্যান্সে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ফুটবল বিশেষজ্ঞরা।
বৈশ্বিক ফুটবল বিশ্লেষকদের প্রতিক্রিয়া: ফুটবলে রাজনীতির আগ্রাসন
ফিফা সবসময়ই নিজেদের একটি অরাজনৈতিক ও স্বাধীন সংস্থা হিসেবে দাবি করে থাকে। ফিফার সংবিধানে স্পষ্ট বলা আছে যে, ফুটবল মাঠের ভেতর কোনো ধরনের রাজনৈতিক, ধর্মীয় বা বর্ণবাদী হস্তক্ষেপ বরদাশত করা হবে না। কিন্তু ইরান সমর্থকদের টিকিট বাতিলের এই ঘটনা ফিফার সেই "রাজনীতিমুক্ত ফুটবল" দাবির মুখে বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে।
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের স্বাধীন ক্রীড়া সাংবাদিক ও বিশ্লেষকরা ফিফার এই দ্বিমুখী নীতির তীব্র সমালোচনা করছেন। তাদের মতে, ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রাশিয়াকে নির্বাসিত করা বা এখন ইরানের সাধারণ সমর্থকদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা প্রমাণ করে যে, ফিফা পশ্চিমা দেশগুলোর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বাইরে যেতে পারে না। সাধারণ ক্রীড়ামোদিদের এভাবে শাস্তি দেওয়া কোনোভাবেই স্পোর্টসম্যানশিপের লক্ষণ নয়।
উপসংহার: মাঠের লড়াইয়ে জবাব দিতে চায় ইরান
সমস্ত প্রতিকূলতা, সমর্থকদের টিকিট বাতিল এবং ভিসা সংক্রান্ত অন্যায্য জটিলতার মাঝেও ইরান দল মানসিকভাবে ভেঙে পড়েনি। মেক্সিকোর টিজুয়ানা ক্যাম্প থেকে আসা খবর অনুযায়ী, দলের খেলোয়াড়রা এই বৈষম্যকে অনুপ্রেরণা হিসেবে নিচ্ছেন। তারা মাঠের পারফরম্যান্স দিয়েই এই অন্যায়ের জবাব দিতে চান।
আগামীকাল বৃহস্পতিবার থেকে বিশ্ব ফুটবলের এই মহাযজ্ঞের পর্দা উঠছে। ইরান খেলছে টুর্নামেন্টের অন্যতম কঠিন গ্রুপ ‘জি’-তে। আগামী ১৫ জুন লস অ্যাঞ্জেলেসে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে ইরান তাদের বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করবে। এরপর ২১ জুন তারা লড়বে শক্তিশালী বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে এবং ২৬ জুন সিয়াটলে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে তাদের প্রতিপক্ষ মিশর। এখন দেখার বিষয়, মাঠের বাইরের এই বিশাল মানসিক চাপ সামলে নিয়ে ইরান দল বিশ্বকাপে কতটা দূর যেতে পারে। বিশ্ব ফুটবলের এমন সব চাঞ্চল্যকর ও ব্রেকিং খবরের আপডেট পেতে নিয়মিত চোখ রাখুন দিগন্ত বাংলা নিউজ পোর্টালে।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।