মায়ের মৃত্যুতে শোকে স্তব্ধ সন্তান: একই দিনে বিদায় নিলেন দুজনেই

মায়ের মৃত্যুতে শোকে স্তব্ধ সন্তান: একই দিনে বিদায় নিলেন দুজনেই
ছবি: সংগৃহীত
 জাতীয় ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মমতা ও আশ্রয়ের নাম ‘মা’। সন্তানের ওপর মায়ের ভালোবাসার কোনো তুলনা হয় না। সেই মমতাময়ী মাকে হারিয়ে কোনো সন্তান যে এভাবে পৃথিবী ছেড়ে চলে যাবেন, তা হয়তো কেউই ভাবেননি। কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলায় এমন এক হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছে, যা পুরো এলাকাকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে দিয়েছে। মায়ের মৃত্যুর সংবাদ সহ্য করতে না পেরে মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে প্রাণ হারিয়েছেন ছেলেও। শেষ পর্যন্ত মা ও ছেলেকে একই কবরস্থানে পাশাপাশি চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়েছে ।

ঘটনার প্রেক্ষাপট ও আকস্মিক শোক:

ঘটনাটি ঘটেছে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার আচমিতা ইউনিয়নের অগ্রেরকোনা গ্রামে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মৃত হারিছ মিয়ার স্ত্রী জুলেখা খাতুন (৬৫) গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় নিজ বাড়িতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মায়ের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পরপরই ঢাকায় কর্মরত তার সন্তান আবু বাক্কার ছিদ্দিক (৩৫) দ্রুত বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন ।

পরিবার ও স্থানীয়রা জানান, আবু বাক্কার ছিদ্দিক ঢাকার একটি প্রতিষ্ঠানে সিকিউরিটি গার্ড হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে ঢাকায় বসবাস করতেন। বৃহস্পতিবার দুপুরে আবু বাক্কারের স্ত্রী শরিফা আক্তারকে ফোন করে জানানো হয় যে, তার শাশুড়ি জুলেখা খাতুন গুরুতর অসুস্থ ।

না বলা সত্যের পরিণাম:

পরিবারের সদস্যদের ভাষ্যমতে, আবু বাক্কার ছিদ্দিক তাঁর মাকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন। মায়ের প্রতি তাঁর এই গভীর ভালোবাসার কথা পরিবারের সবারই জানা ছিল। তাই আবু বাক্কারের শারীরিক অবস্থা এবং মানসিক চাপের কথা চিন্তা করে পরিবারের লোকজন তাকে মায়ের মৃত্যুর খবরটি সরাসরি না জানিয়ে শুধু গুরুতর অসুস্থতার কথা বলেছিলেন। পরিবারের সবার একটাই লক্ষ্য ছিল, কোনোভাবে যেন তাকে দ্রুত বাড়িতে আনা যায় ।

আরও পড়ুন: কালো টাকা বৈধ করার সুযোগ বন্ধের আহ্বান টিআইবির

কালো টাকা বৈধ করার সুযোগ বন্ধের আহ্বান টিআইবির

বিকেলে বাড়িতে পৌঁছে আবু বাক্কার ছিদ্দিক তাঁর মায়ের নিথর দেহ দেখে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। মায়ের মৃত্যু সংবাদটি তাঁর জন্য ছিল অসহনীয়। মায়ের লাশ দেখে তিনি চিৎকার দিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। মুহূর্তের মধ্যে তাঁর শারীরিক অবস্থা অবনতি হতে থাকলে স্বজনরা দ্রুত তাকে কটিয়াদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। কিন্তু নিয়তির পরিহাস, হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন ।

স্বজনদের আর্তনাদ ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা:

মৃত আবু বাক্কারের স্ত্রী শরিফা আক্তার শোকে পাথর হয়ে গেছেন। তিনি জানান, তাঁর স্বামী মাকে কতটা ভালোবাসতেন তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, “মায়ের মৃত্যু তিনি সহ্য করতে পারবেন না—এই আশঙ্কায় আমরা সরাসরি মৃত্যুর খবর দিইনি। কিন্তু বাড়িতে এসে মায়ের লাশ দেখে তিনি আর সামলাতে পারেননি।”

কান্নাজড়িত কণ্ঠে শরিফা আরও বলেন, “আমার স্বামীই ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। এখন আমি দুই সন্তান নিয়ে কীভাবে সংসার চালাব?” তাঁর এই আর্তনাদ স্থানীয় এলাকাবাসীর হৃদয়কেও স্পর্শ করেছে ।

শেষ বিদায় ও দাফন:

একই রাতে মা জুলেখা খাতুনের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরদিন শুক্রবার সকাল ১০টায় আবু বাক্কার ছিদ্দিকের জানাজা সম্পন্ন হয়। এরপর কটিয়াদীর পারিবারিক কবরস্থানে মা ও ছেলেকে পাশাপাশি দাফন করা হয়। এই মর্মান্তিক দৃশ্য দেখে এলাকার শত শত মানুষ চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি ।

কটিয়াদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডা. মিঠুন রানা জানান, আবু বাক্কার ছিদ্দিককে হাসপাতালে আনার আগেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে প্রাথমিক ধারণা করা হচ্ছে। পরবর্তীতে ইসিজি রিপোর্ট দেখে তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে ।

উপসংহার:

মায়ের প্রতি সন্তানের ভালোবাসা অসীম ও শাশ্বত। মা ও ছেলের এই অকাল প্রয়াণ স্থানীয় জনমনে গভীর শোকের ছায়া ফেলেছে। দিগন্ত বাংলা নিউজ এই শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছে। আমরা আশা করি, মহান আল্লাহ এই মা ও সন্তানকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করবেন এবং পরিবারের সদস্যদের ধৈর্য ধারণ করার শক্তি দেবেন।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন