কালো টাকা বৈধ করার সুযোগ বন্ধের আহ্বান টিআইবির

কালো টাকা বৈধ করার সুযোগ বন্ধের আহ্বান টিআইবির
প্রতীকী ছবি
 জাতীয় ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে সামনে রেখে সরকার ‘কালো টাকা’ বৈধ করার যে উদ্যোগ গ্রহণ করতে যাচ্ছে, তার তীব্র বিরোধিতা করেছে সংস্থাটি। টিআইবি মনে করে, এই ধরনের সিদ্ধান্ত দেশের অর্থনীতি এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে চলমান লড়াইকে দুর্বল করে দেবে।

হতাশাজনক উদ্যোগের নেপথ্যে:

টিআইবি তাদের সাম্প্রতিক বিবৃতিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে যে, বিনা প্রশ্নে কালো টাকা বৈধ করার সুযোগ প্রদান এবং বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার নামে ‘নিঃশর্ত ক্ষমা’ দেওয়ার আলোচনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সংস্থাটি মনে করে, যারা অবৈধ উপায়ে অর্থ উপার্জন করেছেন, তাদের এই সুযোগ দেওয়া মূলত সৎ করদাতাদের অবমাননা করার শামিল।

কেন এই সিদ্ধান্ত আত্মঘাতী?

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান অত্যন্ত জোরালো ভাষায় জানিয়েছেন যে, যেকোনো অজুহাতেই হোক—চাই সেটি আবাসন খাতের উন্নয়ন বা শিল্পায়ন—কালো টাকা বৈধ করার সুযোগ দেওয়া সরকারের জন্য একটি ‘আত্মঘাতী’ পদক্ষেপ। তাঁর বিশ্লেষণ অনুযায়ী:

  • দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিক রূপ: কালো টাকা বৈধ করার সুযোগ দিলে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় দুর্নীতি ও অনিয়ম স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। এটি দুর্নীতিবাজদের আরও উৎসাহিত করে।

  • সৎ করদাতাদের নিরুৎসাহ: যারা নিয়মিত আয়কর দিয়ে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখছেন, তাদের জন্য এই ধরনের সুযোগ চরম বৈষম্যমূলক ও নিরুৎসাহজনক।

  • সাংবিধানিক চেতনার পরিপন্থী: ড. ইফতেখারুজ্জামানের মতে, স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সরকার এই ভুল চর্চা চালিয়ে আসছে, যা আমাদের সংবিধানের ২০(২) অনুচ্ছেদের মূল চেতনার সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।

জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও বর্তমান সরকারের দায়িত্ব:

ড. ইফতেখারুজ্জামান তাঁর বক্তব্যে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ইতিবাচক ভূমিকার প্রশংসা করেছেন, যারা শুরুতে এই কালো টাকা সাদা করার বিতর্কিত বিধান বন্ধ করেছিল। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, এখন পুনরায় এই পথ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা যেন ‘এক ধাপ এগিয়ে দুই ধাপ পিছিয়ে পড়ার’ মতো।

আরও পড়ুন: শর্তসাপেক্ষে ইরানকে ভিসা দিল যুক্তরাষ্ট্র: বিশ্বকাপে অংশ নেবে ইরান

শর্তসাপেক্ষে ইরানকে ভিসা দিল যুক্তরাষ্ট্র: বিশ্বকাপে অংশ নেবে ইরান

তিনি আরও বলেন, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সংস্কারের সুপারিশে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, কালো টাকা সাদা করার সুযোগ চিরতরে বন্ধ করতে হবে। এই সুপারিশে বিএনপিসহ সকল রাজনৈতিক দল ও জোট পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছে। এমতাবস্থায়, আবাসন খাতের লবির চাপে পড়ে যদি সরকার আবার এই পথ অনুসরণ করে, তবে তা জনমতের প্রতিফলন ঘটবে না।

পাচার হওয়া অর্থ ও সাধারণ ক্ষমা:

বিদেশ থেকে অর্থ ফেরত আনার বিষয়ে টিআইবি বেশ কিছু যৌক্তিক ও সতর্কতামূলক পরামর্শ দিয়েছে:

১. সত্যিকারের অপরাধী শনাক্তকরণ: যারা অবৈধভাবে অর্থ পাচার করেছেন, তারা যেন এই ‘সাধারণ ক্ষমা’র সুযোগ নিতে না পারেন, তা নিশ্চিত করতে হবে। ২. আইনি জবাবদিহিতা: যাদের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই অর্থ পাচারের কারণে আইনি প্রক্রিয়া চলছে, তাদের কোনোভাবেই ক্ষমা করা যাবে না। তাদের অবশ্যই কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে। ৩. অতীতের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা: অতীতে এই পদ্ধতি অনুসরণ করেও রাজস্ব আদায়ে কোনো উল্লেখযোগ্য সাফল্য পাওয়া যায়নি। তাই এটি একটি প্রমাণিত ‘ব্যর্থ প্রচেষ্টা’ মাত্র।

উপসংহার ও প্রত্যাশা:

সরকার ইতোমধ্যেই বিভিন্ন কার্যক্রমে ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে। দিগন্ত বাংলা নিউজ বিশ্বাস করে, কালো টাকা বৈধ করার মতো একটি বিতর্কিত ও অনৈতিক পথ এড়িয়ে সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাদের অবস্থানের যথার্থতা প্রমাণ করবে। স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর চেয়ে দেশের দীর্ঘমেয়াদী কল্যাণই হওয়া উচিত সরকারের প্রধান বিবেচ্য বিষয়।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন