জাতীয় ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ
২১ লাখ টাকা লোপাট: সিরাজগঞ্জে ভুয়া ‘জ্বীনের বাদশা’ গ্রেপ্তার
প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং মানুষের সরলতার সুযোগ নিয়ে অভিনব প্রতারণার এক নজিরবিহীন ঘটনার সন্ধান পাওয়া গেছে সিরাজগঞ্জে। মোবাইলে সোলার প্রকল্পের নামে বিনিয়োগ এবং অ্যাপসের মাধ্যমে দ্বিগুণ মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে শতাধিক সাধারণ মানুষের কাছ থেকে প্রায় ২১ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে মো. আব্দুল হামিদ (৩৩) নামে এক প্রতারককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। চাঞ্চল্যকর এই প্রতারক কেবল টাকা আত্মসাৎ করেই ক্ষান্ত হয়নি, বরং টাকা ফেরত চাইলে নিজেকে ‘জ্বীনের বাদশা’ পরিচয় দিয়ে ভুক্তভোগীদের ভয়ভীতি প্রদর্শন ও পরিবারের ধ্বংসের হুমকি দেওয়ার মতো ভয়াবহ অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে। মঙ্গলবার (২ জুন) সিরাজগঞ্জ সদর থানায় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) নাজরান রউফ বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন।
প্রতারণার অভিনব কৌশল: সোলার প্রকল্প থেকে জিনের বাদশাগিরি
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, গ্রেপ্তারকৃত আব্দুল হামিদ উল্লাপাড়া উপজেলার সলঙ্গা থানার বনবাড়িয়া গ্রামের মৃত আব্দুল করিমের ছেলে। সে প্রথমে ‘ইকো ভোল্ট (Eco Volt)’ নামক একটি ভুয়া সোলার প্রকল্পভিত্তিক অ্যাপস চালু করে। এই অ্যাপের মাধ্যমে সে সাধারণ মানুষকে অধিক মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে বিনিয়োগে উদ্বুদ্ধ করতে থাকে। সাধারণ মানুষ যখন তার ফাঁদে পা দেয়, তখন সে ‘সিইএফ (CEF)’ নামে আরেকটি ভুয়া অ্যাপসের মাধ্যমে পুনরায় বিনিয়োগ করতে বাধ্য করে। সহজ-সরল মানুষ লাভের আশায় বিকাশ, নগদ ও রকেটের মতো মোবাইল ব্যাংকিং সেবার মাধ্যমে তার ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠাতে শুরু করে।
আরও পড়ুন: রামিসা হত্যা: সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ, বুধবার আত্মপক্ষ সমর্থন
এভাবে শতাধিক গ্রাহকের কাছ থেকে কৌশলে প্রায় ২১ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পর হামিদ অ্যাপস দুটি বন্ধ করে দিয়ে আত্মগোপনে চলে যায়। বিনিয়োগকারীরা যখন তাদের কষ্টার্জিত অর্থ ফেরত পাওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করতে থাকে, তখন সে প্রতারণার আরেকটি স্তর উন্মোচন করে। সে ‘Hamkail Moakael’ নামে একটি টেলিগ্রাম আইডি খুলে নিজেকে অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন ‘জ্বীনের বাদশা’ হিসেবে দাবি করতে থাকে। এই পরিচয়ে সে গ্রাহকদের ভয় দেখাতে শুরু করে যে, তারা যদি পুনরায় টাকা দাবি করে, তবে সে তার ‘জ্বীনের শক্তি’ দিয়ে তাদের পুরো পরিবার ধ্বংস করে দেবে।
আইনি অভিযান ও গ্রেপ্তার
ভুক্তভোগীদের মধ্যে কালিয়া কান্দাপাড়া গ্রামের মমতাজ বেগম নামে এক নারী বাদী হয়ে গত ১ জুন সিরাজগঞ্জ সদর থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলার পর অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের নির্দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাঠে নামে। প্রযুক্তিগত অনুসন্ধানের মাধ্যমে সোমবার রাতে নিজ এলাকা থেকে এই প্রতারককে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয় পুলিশ। অভিযানের সময় পুলিশ তার কাছ থেকে প্রতারণার কাজে ব্যবহৃত একটি ডিজিটাল ট্যাব, একটি স্মার্টফোন এবং গ্রাহকদের আকৃষ্ট করার জন্য তৈরি করা বিপুল পরিমাণ লিফলেট জব্দ করেছে।
পুলিশের সতর্কবার্তা ও পরবর্তী পদক্ষেপ
গ্রেপ্তারকৃত আব্দুল হামিদ প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তার বিরুদ্ধে আনীত সকল অভিযোগ এবং প্রতারণার বিষয়টি পুলিশের কাছে স্বীকার করেছে। মঙ্গলবার তাকে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নাজরান রউফ জানিয়েছেন, এই প্রতারণা চক্রের সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার জন্য তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে দেশের সাধারণ মানুষকে অনলাইন বিনিয়োগ অ্যাপস বা চটকদার মুনাফার প্রলোভনে প্রলুব্ধ না হওয়ার কঠোর সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। কোনো পরিচিতিহীন ব্যক্তি বা অনলাইন প্ল্যাটফর্মে টাকা বিনিয়োগ করার আগে তার বৈধতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
দিগন্ত বাংলা নিউজের পর্যবেক্ষণ
ডিজিটাল বাংলাদেশে যেমন সুযোগ বাড়ছে, তেমনি প্রযুক্তির অপব্যবহার করে অপরাধীদের নতুন নতুন কৌশলও বাড়ছে। ‘জ্বীনের বাদশা’ সেজে ভয়ভীতি প্রদর্শনের মতো কর্মকাণ্ড আমাদের অন্ধবিশ্বাসের জায়গাটিতেই আঘাত করে। রামিসা হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনায় বিচারিক প্রক্রিয়া যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সাইবার অপরাধের বিরুদ্ধে এই ধরনের দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণও সামাজিক নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য। প্রতারক হামিদের এই গ্রেপ্তার কেবল ভুক্তভোগীদের কিছুটা স্বস্তি দেবে না, বরং যারা প্রতারণার ফাঁদে পা দেওয়ার কথা ভাবছেন, তাদের জন্যও এটি একটি সতর্কবার্তা। আমরা আশা করি, তদন্তে প্রতারণা চক্রের মূল হোতাদের পাশাপাশি সহযোগীদেরও মুখোশ উন্মোচিত হবে।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।