ভারতে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র উত্থান: তরুণদের নতুন রাজনৈতিক লড়াই

ভারতে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র উত্থান: তরুণদের নতুন রাজনৈতিক লড়াই
ছবি: সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ

ভারতের রাজনীতিতে এক অভাবনীয় পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা চিরাচরিত রাজনীতির ধারার বাইরে এসে দেশটির তরুণ প্রজন্ম এখন এক নতুন পথ খুঁজে নিয়েছে। ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা ‘সিজেপি’ (CJP) নামে একটি অপ্রথাগত রাজনৈতিক আন্দোলন বর্তমানে গোটা ভারতকে নাড়িয়ে দিয়েছে। ব্যঙ্গ ও ঠাট্টার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এই আন্দোলন আজ ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপির জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আন্দোলনের নেপথ্যের গল্প:

ভারতের ১৪০ কোটি জনসংখ্যার বিশাল এক অংশ তরুণ। দেশের প্রায় অর্ধেক মানুষের বয়স ২৫ বছরের নিচে। কিন্তু এই বিপুল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ বেকারত্ব, প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো ভয়াবহ সমস্যা এবং শিক্ষা বোর্ডের অসংগতি নিয়ে দীর্ঘকাল ধরে ক্ষুব্ধ ছিল। এই ক্ষোভ থেকেই অভিজিৎ দীপকে নামে যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া এক ভারতীয় শিক্ষার্থীর হাত ধরে সিজেপির জন্ম।

ভারতের প্রধান বিচারপতির একটি বিতর্কিত মন্তব্য এই আন্দোলনের স্ফুলিঙ্গ হিসেবে কাজ করেছিল। তিনি একদল বেকার তরুণকে ‘তেলাপোকা’ বা ‘ককরোচ’ বলে সম্বোধন করেছিলেন, যা যুবসমাজকে দারুণভাবে অপমানিত করে। এর প্রতিক্রিয়ায় অভিজিৎ দীপকে এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেলে একটি শক্তিশালী প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছিলেন: ‘যদি সব তেলাপোকা একসঙ্গে জড়ো হয়, তাহলে কী হবে?’ এই একটি প্রশ্ন মুহূর্তের মধ্যে ইন্টারনেটে ভাইরাল হয়ে যায় এবং জন্ম দেয় ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র।

যন্তর মন্তরে তেলাপোকাদের হুংকার:

দিল্লির যন্তর মন্তরে জড়ো হওয়া শত শত তরুণ-তরুণী প্রমাণ করেছেন যে, তাঁরা কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দেওয়া প্রজন্ম নন। আন্দোলনের মূল দাবি একটাই—ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ।

আরও পড়ুন: শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা: সোহেল ও সপ্নার মৃত্যুদণ্ড

আরও পড়ুন: শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা: সোহেল ও সপ্নার মৃত্যুদণ্ড

আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী সৌরভ কুশওয়াহার মতো হাজারো তরুণ যারা মধ্যপ্রদেশ কিংবা দূর-দূরান্ত থেকে ট্রেনযোগে দিল্লিতে এসেছেন, তাঁদের কণ্ঠে আজ একই স্লোগান। তাঁরা মনে করেন, বর্তমান সরকার জনগণের ভোটে ক্ষমতায় এলেও এখন জনগণের মৌলিক সমস্যাগুলোর প্রতি পুরোপুরি উদাসীন। শিক্ষাব্যবস্থায় জালিয়াতি, প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং উত্তরপত্রে ডিজিটাল মূল্যায়নের অনিয়ম তাঁদের ভবিষ্যৎকে অন্ধকারে ঠেলে দিচ্ছে।

ব্যঙ্গ থেকে বাস্তবতায় সিজেপি:

অনেকেই শুরুতে এটিকে নিছক মজা মনে করেছিলেন। কিন্তু ইনস্টাগ্রামে অভিজিৎ দীপকের অনুসারীর সংখ্যা ২ কোটি ২০ লাখ ছাড়িয়ে যাওয়ার পর পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন মোড় নেয়। এই অনুসারীর সংখ্যা ২০১৪ সাল থেকে ক্ষমতায় থাকা বিজেপির অফিসিয়াল সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেলের প্রায় দ্বিগুণ। দীপকে যখন নয়াদিল্লির প্রচণ্ড গরমের মধ্যে মাইক্রোফোন হাতে নেন, তখন জনতা একযোগে আওয়াজ তোলে—‘লজ্জা, লজ্জা!’

অভিজিৎ দীপকে তাঁর বক্তব্যে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন, “এ দেশের প্রতিটি মা–ই ভয় পান যে তাঁর সন্তান যদি রাজনীতি নিয়ে কথা বলে, যদি সরকারের সমালোচনা করে, তাহলে তাকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে।” এই ভয়ের সংস্কৃতি ভাঙার ডাক দিয়েছেন তিনি।

কেন তরুণরা রাস্তায় নেমেছে?

শিক্ষার্থী মোহাম্মদ আফতাব, যিনি জীবিকা নির্বাহের জন্য মুদি পণ্য সরবরাহ করেন, তিনি বলেন, “আমি স্কুল শেষ করতে পারিনি। কিন্তু লাখো শিক্ষার্থী আছে যারা রাত জেগে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়েছে। তাদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের দায়িত্ব।” এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি ভারতের তরুণ প্রজন্মের এক গভীর সংকটের বহিঃপ্রকাশ।

ভবিষ্যৎ রাজনীতির ইঙ্গিত:

সমালোচকদের মতে, ২০১৪ সাল থেকে মোদি সরকার ভিন্নমত দমনে অত্যন্ত কঠোর। কিন্তু সিজেপির মতো একটি নতুন শক্তির উত্থান প্রমাণ করে যে, দমন-পীড়ন দিয়ে মানুষের ক্ষোভ চিরকাল চাপা রাখা সম্ভব নয়। যদি শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি বাস্তবায়িত হয়, তবে তা হবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ১২ বছরের শাসনামলে ঘটা এ ধরনের প্রথম ঘটনা।

উপসংহার:

তেলাপোকার মুখোশ পরে, গোলাপ ফুল আর বই হাতে নিয়ে তরুণরা আজ দিল্লিতে সমবেত হয়েছে। তাঁদের বার্তা পরিষ্কার—তাঁরা শুধু স্লোগান দিয়ে চলে যাবে না। তাঁরা তেলাপোকার মতো অদম্য এবং যতক্ষণ না পর্যন্ত জবাবদিহিতা নিশ্চিত হচ্ছে, ততক্ষণ এই আন্দোলন চলবে। দিগন্ত বাংলা নিউজ এই আন্দোলনের প্রতিটি মুহূর্ত পর্যবেক্ষণ করছে।

 

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন