আর কখনো গানে ফিরবেন না রিংকু: নিভৃতে কাটছে দিন

আর কখনো গানে ফিরবেন না রিংকু: নিভৃতে কাটছে দিন
ছবি: সংগৃহীত

 বিনোদন ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ

বাংলাদেশের লোকসংগীত ও আধুনিক ফোক ধারার এক অনন্য ও জনপ্রিয় নক্ষত্র মশিউর রহমান রিংকু। যার জাদুকরী ও দরাজ কণ্ঠের সুফি ঘরানার গান একসময় কোটি শ্রোতার হৃদয়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল, সেই চিরচেনা সুরের মানুষটি আজ জীবনযুদ্ধের এক কঠিন ও নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি। দীর্ঘ সময় ধরে দেশের মূলধারার সংগীতাঙ্গন থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকা এই গুণী শিল্পী অবশেষে তার ভক্ত ও শ্রোতাকুলকে এক অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও অপ্রিয় সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছেন। শারীরিক অসুস্থতার চরম অবনতি এবং একাধিকবার বড় ধরনের স্ট্রোকের ধকল সামলাতে গিয়ে তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে, আর কখনোই পেশাদার সংগীতে বা গানের চিরচেনা মঞ্চে ফিরবেন না। বর্তমানে কোলাহলময় শহুরে জীবন ছেড়ে নিজ গ্রামের নিভৃত পল্লীতে একাকী ও শান্তিময় সময় পার করছেন এই তারকা কণ্ঠশিল্পী।

কোটি মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়া এই শিল্পীর বর্তমান জীবনযাত্রা আগের চেয়ে আমূল বদলে গেছে। একসময়ের ব্যস্ততম সুরের জাদুকর এখন দিন কাটাচ্ছেন প্রকৃতির সান্নিধ্যে, গ্রামীণ মানুষের ভালোবাসায়। তবে গানের জগৎ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিলেও জীবনের এই শেষ প্রান্তে এসে তার মনের কোণে লুকিয়ে থাকা একমাত্র গভীর আকুতি—তার দীর্ঘ সাধনায় সৃষ্টি হওয়া লোকগানগুলো যেন আগামী প্রজন্মের কাছে হারিয়ে না যায়।

'পথের গল্প' ও রিংকুর হৃদয়ের গভীর আর্তি

দীর্ঘদিনের নীরবতা ভেঙে সম্প্রতি ‘পথের গল্প’ নামের একটি জনপ্রিয় ট্রাভেল ডকুমেন্টারিতে অংশ নেন কণ্ঠশিল্পী রিংকু। সেখানে অত্যন্ত খোলামেলা, আবেগঘন এবং অকপটভাবে নিজের বর্তমান শারীরিক অবস্থা, ফেলে আসা সোনালী সংগীতজীবন, বর্তমান মানসিক অবস্থা এবং ব্যক্তিগত নানা তিক্ত ও মধুর অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলেন তিনি। তার সেই সাক্ষাৎকারটি প্রকাশের পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার কোটি ভক্তদের মাঝে কান্নার রোল পড়ে যায় এবং সহকর্মীদের মাঝে নতুন করে আলোচনার সূত্রপাত হয়।

ডকুমেন্টারিতে নিজের গানে ফেরার অস্পষ্ট সম্ভাবনা নিয়ে রিংকু অত্যন্ত সাহসিকতা ও বাস্তবসম্মতভাবে বলেন, "পুরোপুরিভাবে গানে ফেরার কোনো ইচ্ছা এখন আর আমার নেই। সত্য কথা বলতে, ইচ্ছা থাকলেও সেই শারীরিক সম্ভাবনা বা সক্ষমতা আমার আর অবশিষ্ট নেই। কারণ, আমার শরীরে একে একে চারবার স্ট্রোক আঘাত হেনেছে। এর মধ্যে প্রথম একবার-দুবার যখন মৃদু স্ট্রোক হয়েছিল, তখন তো বাইরের কেউ বা আমার শুভাকাঙ্ক্ষীরা জানতই না। কিন্তু যখন চতুর্থবারের মতো স্ট্রোক হয়ে গেল, তখন আমি নিজের ভেতরের পরিবর্তনটা বুঝতে পারলাম এবং উপলব্ধি করলাম যে আমার সব আশা ও সম্ভাবনা এখানেই শেষ।"

তিনি আরও যোগ করেন, "এই রূঢ় বাস্তবতাকে আমাদের মেনে নিতে হবে, কারণ এটাই চরম সত্য। আসলে আমি অতীত জীবনে যেভাবে পূর্ণ শক্তি ও কণ্ঠ নিয়ে শ্রোতাদের মাঝে ব্যাক করতে বা ফিরে আসতে চাইতাম, শারীরিকভাবে সেভাবে আর কখনোই ফিরে আসা সম্ভব হবে না। আর যদি পরিপূর্ণভাবে নিজের সেরাটা দিয়ে কামব্যাক করতে না পারি, তবে আংশিকভাবে বা দুর্বলভাবে ব্যাক করার কোনো দরকার নেই বলে আমি মনে করি। আমি হয়তো একদিন এই পৃথিবী ছেড়ে মরে যাব, কিন্তু আমার সৃষ্টি করা গানগুলো তো এই বাংলার মাটিতে থেকে যাবে। তাই দেশবাসীর কাছে আমার একটাই আকুল আহ্বান, আমার গানগুলো যেন অবহেলায় নষ্ট বা হারিয়ে না যায়।"

শহুরে মেকি ভালোবাসা ও সম্পর্কের আক্ষেপ

সাক্ষাৎকারে নিজের জীবনের চরম এক সত্য ও বিষাদময় অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে গিয়ে রিংকু ঢাকার শহুরে করপোরেট সংস্কৃতি, স্বার্থপর সম্পর্ক এবং মানুষের মেকি ভালোবাসা নিয়েও তীব্র আক্ষেপ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তার মতে, শহরের জাঁকজমকপূর্ণ জীবনের আড়ালে লুকিয়ে থাকে চরম স্বার্থপরতা।

আরও পড়ুন: ইসলামী ব্যাংক বিএনপির হাতে শতভাগ নিরাপদ: অর্থমন্ত্রী

ইসলামী ব্যাংক বিএনপির হাতে শতভাগ নিরাপদ: অর্থমন্ত্রী

রিংকু তার স্বভাবসুলভ দার্শনিক ভঙ্গিতে বলেন, "শহরের মানুষের ভালোবাসা মূলত হচ্ছে কাজের জন্য ভালোবাসা। মানুষ যতক্ষণ আপনার থেকে সুফল পাবে, ততক্ষণ আপনাকে মাথায় তুলে রাখবে। আর গ্রামীণ সাধারণ মানুষের ভালোবাসা হচ্ছে অকৃত্রিম ও অরিজিনাল, যেখানে কোনো স্বার্থ লুকিয়ে থাকে না। গ্রামের সেই মাটির মানুষগুলোই এখন আমার পরম বন্ধু।" নিজের জীবনের উদাহরণ টেনে তিনি একটি প্রাচীন প্রবাদ উল্লেখ করে বলেন, "একটা কথা আছে না—কাজ করলে কাজী, আর কাজ ফুরালে পাজি! ঠিক তেমনি হচ্ছে শহরের তথাকথিত মানুষের ভালোবাসা। যখন আমি সুস্থ ছিলাম, সবার জন্য গান গাইতাম, তখন চারিদিকে মানুষের অভাব ছিল না। যদি কারো কোনো উপকার বা কাজ করে দিতাম, তবেই তারা আমাকে ভালোবাসত। আর এখন আমি কাজ করতে পারি না, তাই তাদের কাছে আমার কোনো অস্তিত্ব বা গুরুত্ব নেই, বিষয়টি ঠিক এমন আরকি!"

অত্যন্ত দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে এই লোকশিল্পী জানান যে, তার সুসময়ের বা অতীতের তথাকথিত বন্ধুদের কেউ এখন আর তার কোনো খোঁজখবর রাখে না। তবে কারো প্রতি কোনো অভিযোগ না রেখে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, "যদি অতীত জীবনে আমি কারো জন্য কিছু ভালো কাজ বা উপকার করে থাকি, সেটা আমি আমার মন থেকে নিঃস্বার্থভাবে করেছি, বিনিময়ে কিছু পাওয়ার আশা করিনি। তাই এই কঠিন সময়ে এসে আমি কারো করুণা বা সহানুভূতি (Sympathy) চাই না। আমি আমার আত্মসম্মান নিয়ে বেঁচে থাকতে চাই।"

২০২০ সালের সেই কালো অধ্যায় ও বর্তমানের গ্রামীণ জীবন

উল্লেখ্য, ২০২০ সালে প্রথম রিংকু মারাত্মকভাবে স্ট্রোকে আক্রান্ত হন। সেই স্ট্রোকের পর থেকেই তার শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটতে থাকে এবং তিনি দীর্ঘদিন শয্যাশায়ী ছিলেন। স্ট্রোকের প্রভাবে তার শরীরের একপাশ আংশিকভাবে অবশ হয়ে যাওয়ার কারণে তার স্বাভাবিক হাঁটাচলা এবং দৈনন্দিন জীবনযাপনও অত্যন্ত কঠিন ও কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। দীর্ঘ চিকিৎসা এবং থেরাপির পরেও তিনি পুরোপুরি আগের স্বাভাবিক জীবনে আর ফিরতে পারেননি।

তবে এই শারীরিক প্রতিবন্ধকতা এবং জীবনের আকস্মিক থমকে যাওয়াকে অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছেন এই সুফি ঘরানার সাধক। শহরের কৃত্রিম জৌলুস ও স্বার্থপরতার মায়া ত্যাগ করে তিনি এখন স্থায়ীভাবে নিজের গ্রামের মাটির টানে ফিরে গেছেন। সেখানে গ্রামীণ সবুজ প্রকৃতি, সরলমনা মানুষের সান্নিধ্য এবং গ্রামীণ বন্ধুদের ভালোবাসায় নিজের মতো করে শান্তিতে দিন কাটাচ্ছেন। গানের জগত থেকে বিদায় নিলেও কোটি কোটি বাঙালি শ্রোতার হৃদয়ে 'ক্লোজআপ ওয়ান' খ্যাত এই রিংকু তার অনন্য সৃষ্টি ও সুফি ঘরানার লোকগানের মাধ্যমে চিরকাল অমর হয়ে থাকবেন।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন