ইসলামী ব্যাংক বিএনপির হাতে শতভাগ নিরাপদ: অর্থমন্ত্রী

ইসলামী ব্যাংক বিএনপির হাতে শতভাগ নিরাপদ: অর্থমন্ত্রী
ছবি: সংগৃহীত

 জাতীয় ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ

দেশের অন্যতম শীর্ষ এবং বৃহৎ আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের সামগ্রিক স্থায়িত্ব, গ্রাহকদের আমানতের নিরাপত্তা এবং দেশের ব্যাংকিং খাতের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে জাতীয় সংসদে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও নীতিনির্ধারণী বক্তব্য এসেছে। দেশের আর্থিক খাতের বিশৃঙ্খলা দূর করে সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে সরকারের দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে। বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংকের ভবিষ্যৎ ও এর কোটি কোটি গ্রাহকের স্বার্থ সুরক্ষায় দেশের বর্তমান রাজনৈতিক নেতৃত্বের সক্ষমতা ও ঐতিহাসিক সফলতার প্রসঙ্গটি সংসদ অধিবেশনে জোরালোভাবে উত্থাপিত হয়েছে।

আজ মঙ্গলবার বিকেলে জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় (বাজেট) অধিবেশনে ৬৮ বিধির আওতায় আয়োজিত একটি সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী দেশের ব্যাংকিং খাতের সমসাময়িক চ্যালেঞ্জ এবং রাজনৈতিক অপতৎপরতা নিয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করেন। তিনি দৃঢ়তার সাথে দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে বলেন, ইসলামী ব্যাংকের ভবিষ্যৎ বিএনপির হাতে শতভাগ নিরাপদ। দেশের অতিত অর্থনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে এই দাবির সত্যতা পাওয়া যাবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

ম্যাক্রো ইকোনমিক স্ট্যাবিলিটি ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

বাজেট অধিবেশনের সাধারণ আলোচনায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বিগত বছরগুলোর দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির বিগত সরকারগুলোর অর্থনৈতিক ট্র্যাক রেকর্ড বা ইতিহাস লক্ষ্য করলেই স্পষ্ট বোঝা যায় যে, সেই সময়গুলোতে দেশের 'ম্যাক্রো ইকোনমিক স্ট্যাবিলিটি' বা সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা সবচেয়ে বেশি সতেজ ও শক্তিশালী ছিল।

অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, একটি দেশের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড মূলত নির্ভর করে তার ব্যাংকিং খাত এবং আর্থিক শৃঙ্খলার ওপর। বিগত দিনে দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে যে কাঠামোগত দুর্বলতা বা অনিয়ম তৈরি হয়েছিল, বর্তমান প্রশাসন অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তা সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। যেকোনো মূল্যে দেশের হারিয়ে যাওয়া আর্থিক শৃঙ্খলা এবং নীতিগত স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতেই সরকার দিনরাত কাজ করে যাচ্ছে। ফলে কোনো নির্দিষ্ট ব্যাংকের ভবিষ্যৎ নিয়ে সাধারণ গ্রাহকদের আতঙ্কিত বা বিভ্রান্ত হওয়ার কোনো অবকাশ নেই।

সংসদীয় প্রস্তাব এবং বিরোধীদলীয় নেতার দাবি

আজকের বিশেষ সংসদ অধিবেশনটি স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রমের সভাপতিত্বে পরিচালিত হয়। অধিবেশনে ‘দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি, ব্যাংকিং খাতের দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা এবং কোটি কোটি সাধারণ গ্রাহকের আমানতের স্বার্থ রক্ষা করার লক্ষ্যে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের শেয়ারসমূহ বৈধ ও প্রকৃত মালিকদের নিকট প্রত্যর্পণ এবং ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় সকল প্রকার অন্যায্য ও অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ অনতিবিলম্বে বন্ধ’ করার দাবিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার প্রস্তাব উত্থাপন করেন বিরোধীদলীয় নেতা ড. শফিকুর রহমান।

আরও পড়ুন: নেত্রকোনায় দুপুরের খাবার দিতে বিলম্ব, মায়ের মাথায় ক্ষিপ্ত সন্তানের শাবলের আঘাত ও মৃত্যু

নেত্রকোনায় দুপুরের খাবার দিতে বিলম্ব, মায়ের মাথায় ক্ষিপ্ত সন্তানের শাবলের আঘাত ও মৃত্যু

বিরোধী দলের পক্ষ থেকে উত্থাপিত এই পিটিশন বা প্রস্তাবের ওপর সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করতেই অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ৬৮ বিধিতে বক্তব্য প্রদান করেন। তিনি বিরোধী দলের উদ্বেগ এবং প্রস্তাবকে সাধুবাদ জানিয়ে সামগ্রিক পরিস্থিতি সংসদ ও দেশবাসীর সামনে অত্যন্ত স্বচ্ছভাবে ব্যাখ্যা করেন।

রাজনৈতিক ফায়দা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণার সমালোচনা

বক্তব্য প্রদানকালে অর্থমন্ত্রী অত্যন্ত ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দেশের একটি বিশেষ মহল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ইসলামী ব্যাংককে এক ধরনের কৃত্রিম সংকটে বা বিপদে ফেলার চেষ্টা করছে। এই অপচেষ্টার মূল উদ্দেশ্য হলো ব্যাংকটিকে কেন্দ্র করে দেশের সাধারণ মানুষের মনে আতঙ্ক তৈরি করা এবং তার আড়ালে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করা।

বিশ্বের ব্যাংকিং ইতিহাসের উদাহরণ টেনে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, কোনো ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ বা চেয়ারম্যান পরিবর্তনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার কারণে সাধারণ গ্রাহকেরা দলে দলে ব্যাংক থেকে আমানত বা টাকা তুলে নিয়ে যাচ্ছেন—এমন কোনো নজির বা উদাহরণ পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। একজন সচেতন গ্রাহক মূলত দেখেন ব্যাংকে রাখা তার আমানতের সুদের হার (বা প্রফিট), আর্থিক নিরাপত্তা এবং ব্যাংকের স্থায়ী ভিত্তি কেমন।

তিনি অভিযোগ করে বলেন, একটি বিশেষ চক্র সম্পূর্ণ গুজব ও অপপ্রচার চালিয়ে সাধারণ গ্রাহকদের বিভ্রান্ত করেছে এবং কৃত্রিমভাবে টাকা উত্তোলনের একটি জোয়ার তৈরি করতে চেয়েছে। এই মহলের একমাত্র লক্ষ্য হলো ইসলামী ব্যাংককে দেউলিয়া বা 'ফেইল' করিয়ে বিশ্ব দরবারে এবং দেশের ভেতরে এটি প্রমাণ করা যে, বর্তমানে দেশে কোনো আর্থিক শৃঙ্খলা অবশিষ্ট নেই।

রাজনীতিতে 'আনআর্নড ইনকাম' বা বিনা পরিশ্রমের টাকার ক্ষতিকর প্রভাব

অর্থনৈতিক সংস্কারের পাশাপাশি দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির শুদ্ধকরণের ওপরও জোর দেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বিগত নির্বাচনগুলোর একটি নেতিবাচক দিক তুলে ধরে বলেন, বিগত নির্বাচনগুলোতে বিভিন্ন নির্বাচনি এলাকায় প্রার্থীদের অবিশ্বাস্য এবং অস্বাভাবিক রকমের টাকা খরচ করার প্রবণতা দেখা গেছে।

তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, এমন অনেক প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন যাদের আয়ের কোনো দৃশ্যমান বা বৈধ উৎস জানা নেই, অথচ তারাও নির্বাচনী প্রচারণায় ৫০ থেকে ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত অকাতরে খরচ করেছেন। অর্থমন্ত্রী অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেন, এই যে ‘আনআর্নড ইনকাম’ বা বিনা পরিশ্রমে অর্জিত অবৈধ কালো টাকা যখন সরাসরি রাজনীতি এবং ক্ষমতার বলয়ে প্রবেশ করে, তখন তা দেশের অর্থনীতি এবং সামগ্রিক সমাজব্যবস্থার জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর রূপ ধারণ করে। এই কালো টাকার মালিকেরাই দেশের আর্থিক খাতকে অস্থিতিশীল করার নেপথ্য কারিগর হিসেবে কাজ করে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদন ও চূড়ান্ত আশ্বাস

বিরোধী দলের উত্থাপিত পিটিশনের সুনির্দিষ্ট জবাব দিতে গিয়ে অর্থমন্ত্রী দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি তদন্ত রিপোর্টের তথ্য সংসদে পেশ করেন। তিনি জানান, বাংলাদেশ ব্যাংক অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান ব্যবস্থাপনা ও নতুন চেয়ারম্যানের নিয়োগ সংক্রান্ত বিষয়ে একটি নিবিড় ও নিরপেক্ষ তদন্ত পরিচালনা করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সেই আনুষ্ঠানিক তদন্তে বর্তমান চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে বেআইনি বা আর্থিক অনিয়মের কোনো প্রমাণ বা কিছুই পাওয়া যায়নি।

অর্থমন্ত্রী পুনরুল্লেখ করেন যে, যারা সাময়িকভাবে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নিয়ে গেছেন বা নেওয়ার চেষ্টা করছেন, তারা মূলত না বুঝেই এই চক্রের পাতা ফাঁদে পা দিচ্ছেন। এর পেছনে দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক বিশেষ কোনো শক্তির হাত রয়েছে, যারা দেশের ব্যাংকিং খাতকে ধ্বংস করে রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে চায়। তবে সরকার ও দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক যৌথভাবে ইসলামী ব্যাংকের মূল ভিত্তি ধরে রাখতে শতভাগ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং প্রকৃত ও বৈধ মালিকদের স্বার্থ সুরক্ষায় সমস্ত আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করছে।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন