সালমান শাহের লাশ কবর থেকে তোলার নির্দেশ, ৩০ বছর পর ময়নাতদন্ত

সালমান শাহের লাশ কবর থেকে তোলার নির্দেশ, ৩০ বছর পর ময়নাতদন্ত
ছবি: সংগৃহীত

বিনোদন ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ

সালমান শাহের লাশ কবর থেকে তোলার ঐতিহাসিক নির্দেশ: দীর্ঘ ৩০ বছর পর আবারও হবে ময়নাতদন্ত ও সুরতহাল

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসের আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তার এক অবিসংবাদিত নাম সালমান শাহ (চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন)। তাঁর অকাল ও রহস্যজনক মৃত্যুর দীর্ঘ তিন দশক (৩০ বছর) পর, সেই মৃত্যুর আসল সত্য ও জট খুলতে এক ঐতিহাসিক ও নজিরবিহীন নির্দেশ দিয়েছেন দেশের বিজ্ঞ আদালত। সালমান শাহের মৃত্যুর অন্তরালে থাকা মূল রহস্য এবং এটি আত্মহত্যা নাকি সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড—তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তাঁর মরদেহ কবর থেকে উত্তোলনের আনুষ্ঠানিক অনুমতি দেওয়া হয়েছে। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত বিজ্ঞ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের প্রত্যক্ষ উপস্থিতিতে কবর থেকে লাশ উত্তোলন, নতুন করে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি এবং আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে পুনরায় ময়নাতদন্ত (Autopsy) সম্পন্ন করা হবে।

রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানার আদালত গত ২৪ মে (২০২৬) এই চাঞ্চল্যকর ও যুগান্তকারী আদেশ প্রদান করেছেন। এই মামলার বর্তমান তদন্তকারী কর্মকর্তার সুনির্দিষ্ট ও যুক্তিযুক্ত আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতেই আদালত দীর্ঘ আইনি পর্যালোচনা শেষে এই বড় সিদ্ধান্তটি গ্রহণ করেন। আদালতের এই নির্দেশের পর সারা দেশের কোটি কোটি সালমান ভক্ত এবং চলচ্চিত্র অঙ্গনে এক নতুন আশার আলো ও ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

সিআইডির আবেদন এবং আদালতের সবুজ সংকেত

মামলার নথিপত্র এবং আদালত সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের ২০ মে (২০২৬) সিআইডির (Criminal Investigation Department) পরিদর্শক জিয়াউল মোর্শেদ সালমান শাহের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানের স্বার্থে আদালতে একটি লিখিত আবেদন দাখিল করেন। তিনি তাঁর আবেদনপত্রে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করেন যে, বিগত দিনে এই মৃত্যুর বিষয়ে নানা ধরনের অস্পষ্টতা ও ধোঁয়াশা রয়ে গেছে। তাই এই কথিত আত্মহত্যার আসল সত্য এবং যদি এটি হত্যাকাণ্ড হয়ে থাকে তবে তার সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক প্রমাণ ও কারণ উদঘাটনের স্বার্থে সালমান শাহ’র মরদেহ পুনরায় উত্তোলন করে আধুনিক ফরেনসিক ল্যাবে পরীক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি।

আরও পড়ুন: আমি ক্ষমতা চাই না, কিন্তু জনগণের প্রতি দায়িত্ব অস্বীকার করতে পারি না: শেখ হাসিনা

আমি ক্ষমতা চাই না, কিন্তু জনগণের প্রতি দায়িত্ব অস্বীকার করতে পারি না: শেখ হাসিনা

বিজ্ঞ আদালত সিআইডির এই আবেদনটি সম্পূর্ণ যৌক্তিক হিসেবে বিবেচনা করে তা মঞ্জুর করেন। তদন্তকারী কর্মকর্তা জিয়াউল মোর্শেদ জানিয়েছেন, আদালতের লিখিত কপি পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও স্থানীয় জেলা প্রশাসনের সমস্ত আইনি ও দাফন সংক্রান্ত কার্যক্রম সম্পন্ন করা হচ্ছে। খুব দ্রুতই নির্ধারিত তারিখে ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে মরদেহ উত্তোলন ও পরবর্তী ময়নাতদন্তের প্রক্রিয়া শুরু করা হবে।

১৯৯৬ সালের সেই অভিশপ্ত সেপ্টেম্বর: অপমৃত্যু মামলার ইতিহাস

ফুটবল বা অন্য যেকোনো ক্রীড়া বা বিনোদনের চেয়েও সালমান শাহের ট্র্যাজেডি এ দেশের মানুষের হৃদয়ে গভীর ক্ষত তৈরি করেছিল। মামলার মূল নথি ও ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সকালে ঢাকার নিউ ইস্কাটন রোডের নিজ ফ্ল্যাটে সালমান শাহকে অত্যন্ত আশঙ্কাজনক ও অসুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। এরপর তাঁকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন।

তৎকালীন সময়ে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঢাকাসহ সারা দেশে এক অভূতপূর্ব শোকের ছায়া নেমে আসে। ঘটনার পর পরই ঢাকার রমনা থানায় একটি অপমৃত্যু (ইউডি) মামলা দায়ের করা হয়েছিল। পরবর্তীতে আইনি প্রক্রিয়া শেষে অত্যন্ত গোপনীয়তা ও নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে সিলেটের হজরত শাহজালাল (রহ.) মাজার সংলগ্ন কবরস্থানে তাঁকে সমাহিত বা দাফন করা হয়। তখন থেকেই সালমান শাহের পরিবার, বিশেষ করে তাঁর মা নীলা চৌধুরী দাবি করে আসছিলেন যে তাঁর ছেলেকে সুপরিকল্পিতভাবে খুন করা হয়েছে।

সালমান শাহ হত্যা মামলার টাইমলাইন ও বর্তমান পরিস্থিতি:

ঘটনার বিবরণ ও ধাপসুনির্দিষ্ট তারিখ ও সময়সংশ্লিষ্ট স্থান ও আইনি ধারাবর্তমান আইনি অবস্থা
রহস্যজনক মৃত্যু৬ সেপ্টেম্বর, ১৯৯৬নিউ ইস্কাটন রোড, ঢাকাঅপমৃত্যু মামলা দায়ের (রমনা থানা)
দাফন ও সমাধিসেপ্টেম্বর, ১৯৯৬শাহজালাল (রহ.) মাজার, সিলেটদীর্ঘ ৩০ বছর ধরে সমাহিত
মামলার রূপান্তর২০ অক্টোবর, ২০২৪ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজঅপমৃত্যু থেকে সরাসরি হত্যা মামলায় রূপান্তর
আনুষ্ঠানিক হত্যা মামলা২১ অক্টোবর, ২০২৪রমনা থানা, ঢাকাদণ্ডবিধি ৩০২/৩৪ ধারা (মূল আসামি সামীরা ও আজিজ মোহাম্মদ ভাই)
লাশ তোলার নির্দেশ২৪ মে, ২০২৬ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতনির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের অধীনে পুনরায় ময়নাতদন্তের আদেশ

অপমৃত্যু থেকে হত্যা মামলায় রূপান্তর: কাঠগড়ায় সামীরা ও আজিজ মোহাম্মদ ভাই

দীর্ঘ বছর ধরে এই মামলার তদন্তভার বিভিন্ন সংস্থার হাত বদল হয়েছে। পিবিআই (Police Bureau of Investigation) থেকে শুরু করে জুডিশিয়াল ইনকোয়ারি—সব জায়গাতেই এটিকে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে বলে সালমান শাহের পরিবারের অভিযোগ। তবে দীর্ঘ তদন্ত, আইনি লড়াই এবং রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও নতুন আইনি প্রক্রিয়ার পর ২০২৪ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত এই মামলাটিকে অপমৃত্যুর তালিকা থেকে সম্পূর্ণ পরিবর্তন করে একটি নিয়মিত ‘হত্যা মামলা’ হিসেবে গ্রহণ করার ঐতিহাসিক নির্দেশ দেন।

আদালতের এই কঠোর আদেশের পর দিন, অর্থাৎ ২০২৪ সালের ২১ অক্টোবর সালমান শাহ’র আপন মামা মো. আলমগীর বাদী হয়ে ঢাকার রমনা থানায় দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪ (সুপরিকল্পিত হত্যা ও অপরাধমূলক সহায়তা) ধারায় একটি সুনির্দিষ্ট হত্যা মামলা দায়ের করেন। এই মামলায় সালমান শাহের তৎকালীন স্ত্রী সামীরা হক, দেশের বিতর্কিত শিল্পপতি ও চলচ্চিত্র প্রযোজক আজিজ মোহাম্মদ ভাইসহ চলচ্চিত্র ও পারিবারিক মণ্ডলীর একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তিকে সরাসরি আসামি করা হয়েছে। মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, এই আসামিরা পরস্পরের যোগসাজশে সালমান শাহকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে পরবর্তীতে ফ্যানের সাথে ঝুলিয়ে আত্মহত্যার নাটক সাজিয়েছিল।

সন্দেহজনক পরিস্থিতি ও আঘাতের চিহ্ন: কেন আবার ময়নাতদন্ত?

দীর্ঘ ৩০ বছর পর একটি মৃতদেহের কঙ্কাল বা অবশেষ থেকে কীভাবে মৃত্যুর কারণ জানা সম্ভব—এমন প্রশ্ন অনেকের মনেই জাগতে পারে। তবে আধুনিক ফরেনসিক বিজ্ঞান ও হাড়ের ডিএনএ (DNA) টেস্টের মাধ্যমে অনেক পুরোনো হত্যার রহস্যও উন্মোচন করা সম্ভব। মামলার নতুন এজাহারে ও সিআইডির অভিযোগে বলা হয়েছে, ১৯৯৬ সালে সালমান শাহ’র মৃত্যুর পর সুরতহাল রিপোর্টে তাঁর শরীরে বেশ কিছু সন্দেহজনক পরিস্থিতি এবং সূক্ষ্ম শারীরিক আঘাতের চিহ্ন থাকার কথা উল্লেখ ছিল, যা তৎকালীন সময়ে রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাবে ধামাচাপা দেওয়া হয়েছিল।

ঘটনাস্থলের নানা অসঙ্গতি, ঘরের আসবাবপত্রের অবস্থান এবং ময়নাতদন্তের প্রথম রিপোর্টের চরম গরমিল এই নতুন তদন্তের প্রয়োজনীয়তা তৈরি করেছে। সিআইডির ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আধুনিক থ্রিডি স্ক্যানিং ও হাড়ের রাসায়নিক পরীক্ষার মাধ্যমে সালমান শাহের গলায় কোনো ফাঁসের বা বিষপ্রয়োগের আলামত ছিল কিনা, তা এই ৩০ বছর পরও খুঁজে বের করা সম্ভব। আর এই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ বৈজ্ঞানিকভাবে নিশ্চিত করতেই আদালত পুনরায় ময়নাতদন্তের এই যুগান্তকারী উদ্যোগকে অনুমোদন দিয়েছেন।

চলচ্চিত্র অঙ্গন ও ভক্তদের মাঝে তোলপাড়: জট খুলবে কি অমর নায়কের মৃত্যুর?

১৯৯৩ সালে ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বড় পর্দায় পা রাখা সালমান শাহ মাত্র ৪ বছরের ক্যারিয়ারে ২৭টি ব্লকবাস্টার সিনেমা উপহার দিয়েছিলেন। ফ্যাশন, অভিনয় শৈলী আর ড্যাশিং লুক দিয়ে তিনি কোটি মানুষের হৃদয়ে অমর হয়ে আছেন। তাঁর মৃত্যুর পর ৩০ বছর কেটে গেলেও আজও এ দেশের মানুষ তাঁকে ভোলেনি।

নতুন করে আদালতের এই লাশ তোলার এবং ময়নাতদন্তের নির্দেশ আসার পর সালমান শাহের বৃদ্ধ মা নীলা চৌধুরী এক আবেগঘন বার্তায় আদালত ও তদন্ত সংস্থার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। চলচ্চিত্র বোদ্ধাদের মতে, যদি এই তদন্তের মাধ্যমে সালমান শাহের মৃত্যুর সঠিক সত্য বেরিয়ে আসে, তবে তা বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার ইতিহাসে একটি মাইলফলক হিসেবে গণ্য হবে এবং অপরাধীরা যত প্রভাবশালীই হোক না কেন, তাদের বিচারের মুখোমুখি হতে হবে।

উপসংহার: সত্যের অপেক্ষায় পুরো বাংলাদেশ

সালমান শাহ শুধু একজন নায়ক ছিলেন না, তিনি ছিলেন একটি প্রজন্মের আবেগ। দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে ঝুলে থাকা এই রহস্যের জট এবার হয়তো সত্যি সত্যিই খুলতে চলেছে। কবর থেকে লাশ তোলার পর সিআইডি এবং ফরেনসিক মেডিকেল বোর্ড কী রিপোর্ট দেয়, তার ওপরই নির্ভর করছে এই মামলার ভবিষ্যৎ। দেশের কোটি কোটি চলচ্চিত্রপ্রেমী মানুষ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে সেই দিনের জন্য, যেদিন তাদের প্রিয় নায়কের মৃত্যুর আসল সত্যটি সবার সামনে উন্মোচিত হবে। বিনোদন দুনিয়ার এমন সব এক্সক্লুসিভ, ইনসাইড স্টোরি এবং আদালতের ব্রেকিং খবরের লাইভ আপডেট সবার আগে পেতে নিয়মিত ভিজিট করুন আপনাদের প্রিয় পোর্টাল দিগন্ত বাংলা নিউজ-এ।

 

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন