আমি ক্ষমতা চাই না, কিন্তু জনগণের প্রতি দায়িত্ব অস্বীকার করতে পারি না: শেখ হাসিনা

আমি ক্ষমতা চাই না, কিন্তু জনগণের প্রতি দায়িত্ব অস্বীকার করতে পারি না: শেখ হাসিনা
ছবি: সংগৃহীত

জাতীয় ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ

আমি ক্ষমতা চাই না, কিন্তু জনগণের প্রতি আমার দায়িত্ব অস্বীকার করতে পারি না: ‘এই সময়’ পত্রিকাকে দেওয়া দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পটপরিবর্তন এবং ক্ষমতাচ্যুতির পর প্রথমবারের মতো নিজের অবস্থান, ৫ আগস্টের সেই নাটকীয় মুহূর্ত এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে মুখ খুলেছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। ভারতের কলকাতার অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ও জনপ্রিয় দৈনিক পত্রিকা ‘এই সময়’-কে দেওয়া একটি দীর্ঘ ও অত্যন্ত এক্সক্লুসিভ একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে নিজের দৃষ্টিভঙ্গি পরিষ্কার করেছেন। শেখ হাসিনা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, ব্যক্তিগতভাবে ক্ষমতার কোনো মোহ বা লোভ তাঁর নেই, তবে এ দেশের সাধারণ মানুষের প্রতি তাঁর যে ঐতিহাসিক ও পারিবারিক দায়বদ্ধতা রয়েছে, তাকে তিনি কোনো অবস্থাতেই অস্বীকার বা এড়িয়ে যেতে পারেন না।

দীর্ঘ সময় ধরে অন্তরালে থাকার পর শেখ হাসিনার এই বিস্ফোরক সাক্ষাৎকারটি প্রকাশ পাওয়ার সাথে সাথেই তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক বিশাল ঝড় তুলেছে। এই সাক্ষাৎকারে তিনি ৫ আগস্ট গণভবন ছাড়ার পেছনের সত্য, জুলাই-আগস্টের আন্দোলন নিয়ে তাঁর মূল্যায়ন এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়সহ বিভিন্ন বিতর্কিত বিষয়ে অত্যন্ত খোলাখুলি কথা বলেছেন।

৫ আগস্টের সেই ভীতিকর ও আকস্মিক মুহূর্ত: ‘জানতামই না দেশের বাইরে যাচ্ছি’

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি অভূতপূর্ব দিন হিসেবে চিহ্নিত। সেই দিনটির স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে শেখ হাসিনা সাক্ষাৎকারে জানান, মুহূর্তটি ছিল অত্যন্ত ভীতিকর, চরম উদ্বেগজনক এবং সম্পূর্ণ আকস্মিক। ছাত্র-জনতার লং মার্চ টু ঢাকা কর্মসূচির মুখে গণভবন ছাড়ার সেই ক্ষণটিকে বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, "আমি টুঙ্গিপাড়ায় (বঙ্গবন্ধুর সমাধিস্থল) চলে যাব বলে সম্পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। প্রকৃতপক্ষে আমি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত জানতামই না যে আমি দেশের বাইরে বা অন্য কোনো রাষ্ট্রে যাচ্ছি।"

আরও পড়ুন: পাকিস্তানে সামরিক হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত, সকল আরোহীর মর্মান্তিক মৃত্যু

পাকিস্তানে সামরিক হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত, সকল আরোহীর মর্মান্তিক মৃত্যু

তিনি দাবি করেন, ৫ আগস্ট দুপুরের দিকে ঢাকার নিরাপত্তা পরিস্থিতি এতটাই চরম ও বিপজ্জনক আকার ধারণ করেছিল যে গণভবন সরাসরি আক্রমণের মুখে পড়েছিল। তৎকালীন নিরাপত্তা বাহিনীর প্রধান ও উপদেষ্টারা তাঁকে দ্রুত স্থান ত্যাগ করার জন্য চাপ দিতে থাকেন। শেখ হাসিনা জানান, উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে পদত্যাগপত্র তৈরি করার মতো ন্যূনতম বা আনুষ্ঠানিক সময়টুকুও তিনি পাননি। অত্যন্ত তড়িঘড়ি করে তাঁকে সামরিক হেলিকপ্টারে করে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়, যা পরবর্তীতে ভারতের মাটিতে এসে শেষ হয়।

ক্ষমতার লোভ নয়, জনগণের উন্নয়নই ছিল রাজনীতির ব্রত

ক্ষমতা হারানো বা পদ-পদবি ফিরে পাওয়ার কোনো ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা তাঁর নেই উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, "আমি দেশের মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য, তাদের মুখে অন্ন তুলে দেওয়ার জন্য এবং একটি উন্নত-সমৃদ্ধ জীবন নিশ্চিত করার জন্য দীর্ঘ দিন ধরে দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করেছি। ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট বাংলাদেশের যে রূপরেখা আমি তৈরি করেছিলাম, তা ছিল মানুষের কল্যাণের জন্য।"

তিনি অত্যন্ত আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, "নিজে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য এ দেশের মানুষের জীবনের বিনিময় বা রক্তপাত আমি কখনওই চাইনি এবং এমন চিন্তা আমি কখনও করিও না।" তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, বর্তমানের এই চরম প্রতিকূল ও বৈরী পরিস্থিতিতেও তিনি বাংলাদেশের মানুষের পাশে থাকার মানসিকতা পোষণ করেন এবং দূর প্রবাসে থেকেও দেশের মানুষের প্রতিটি সংকটে তিনি মানসিকভাবে যুক্ত আছেন।

জুলাই-আগস্টের আন্দোলন স্বতঃস্ফূর্ত ছিল না, এটি ছিল পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র

জুলাই এবং আগস্ট মাস জুড়ে বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনকে ‘স্বতঃস্ফূর্ত’ বা সাধারণ কোনো গণঅভ্যুত্থান হিসেবে মানতে সম্পূর্ণ নারাজ শেখ হাসিনা। তাঁর মতে, কোটা সংস্কারের আড়ালে এটি ছিল নির্বাচিত সরকার পরিবর্তনের একটি সুগভীর ও সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র। এই মহাপরিকল্পনার পেছনে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বেশ কিছু স্বার্থান্বেষী এবং প্রভাবশালী মহল সরাসরি জড়িত ছিল বলে তিনি দাবি করেন।

আন্দোলনের পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সমন্বয়ক ও রাজনৈতিক নেতাদের দেওয়া নানা মন্তব্য ও ভিডিওর প্রসঙ্গ টেনে শেখ হাসিনা তাঁর সাক্ষাৎকারে বলেন, "আন্দোলন চলাকালীন যেভাবে নির্বিচারে পুলিশ হত্যা করা হয়েছে, রাষ্ট্রীয় সম্পদ যেমন মেট্রোরেল, বিটিভি ভবন ও বিভিন্ন সরকারি স্থাপনায় সুপরিকল্পিতভাবে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে—তা কোনো সাধারণ শিক্ষার্থীর কাজ হতে পারে না। দেশকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করা এবং একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করাই ছিল এই আন্দোলনের নেপথ্যে থাকা মাস্টারমাইন্ডদের আসল পরিকল্পনা।"

শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকারের প্রধান প্রধান দাবি ও পয়েন্টসমূহ:

বিষয়ের বিবরণশেখ হাসিনার বক্তব্য ও দাবি
ব্যক্তিগত লক্ষ্যক্ষমতার মোহ নেই, তবে জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা আজীবন থাকবে।
৫ আগস্টের ঘটনাটুঙ্গিপাড়া যাওয়ার প্রস্তুতি ছিল, দেশ ছাড়ার বা পদত্যাগের সময় পাননি।
জুলাই-আগস্ট আন্দোলনস্বতঃস্ফূর্ত ছিল না; দেশী-বিদেশী মহলের সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র ছিল।
আইসিটি ট্রাইব্যুনালের রায়সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রতিশোধমূলক এবং আইনি ভিত্তিহীন।
জাতিসংঘের তদন্ত প্রতিবেদনবর্তমান অবৈধ সরকারের আমন্ত্রণে গঠিত, তাই এটি নিরপেক্ষ নয়।

আইসিটি ট্রাইব্যুনালের রায়কে 'রাজনৈতিক প্রতিশোধ' আখ্যা

বাংলাদেশে পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (ICT) কর্তৃক জুলাই-আগস্টের গণহত্যার দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে যে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়েও তিনি মুখ খুলেছেন। সাক্ষাৎকারে তিনি এই বিচারিক প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ অবৈধ এবং "রাজনৈতিক প্রতিশোধ" হিসেবে অভিহিত করেছেন।

একইসঙ্গে বাংলাদেশে সফর করে যাওয়া জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনের (OHCHR) ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং তদন্ত প্রতিবেদন নিয়েও তীব্র প্রশ্ন তুলেছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি। শেখ হাসিনা বলেন, "যারা সম্পূর্ণ অসাংবিধানিক ও অবৈধ উপায়ে দেশের ক্ষমতা দখল করেছে, তাদের আমন্ত্রণে এবং তাদেরই নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত কোনো তদন্ত প্রতিবেদন কখনোই স্বাধীন, নিরপেক্ষ এবং বস্তুনিষ্ঠ হতে পারে না।" তিনি দাবি করেন, প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করে কেবল তাঁর দল ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বলির পাঁঠা বানাতেই এই ধরনের একপাক্ষিক তদন্ত রিপোর্ট তৈরি করা হয়েছে।

অবসরে যাওয়ার সম্ভাবনা নাকচ: সত্যের জয় নিশ্চিত

সাক্ষাৎকারের একেবারে শেষ অংশে নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং অবসরে যাওয়ার গুঞ্জন নিয়ে কথা বলেন শেখ হাসিনা। তিনি স্পষ্ট করে জানিয়ে দেন যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে তাঁর রাজনীতি থেকে অবসরে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা বা পরিকল্পনা নেই। দেশের জনগণের এই চরম দুঃসময়ে এবং দেশের ভেতরের এই অরাজক পরিস্থিতিতে তিনি নিজেকে রাজনীতি থেকে গুটিয়ে নিতে চান না।

তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বলেন, "আমি বিশ্বাস করি, সত্যের পথ সবসময় অত্যন্ত কঠিন এবং কণ্টকাকীর্ণ হয়। তবে যতই বাধা আসুক না কেন, সত্য শেষ পর্যন্ত জয়ী হবেই।" বাংলাদেশের মানুষের কল্যাণ এবং তাদের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়াই তাঁর রাজনৈতিক জীবনের একমাত্র এবং শেষ ব্রত বলে তিনি সাক্ষাৎকারে পুনর্ব্যক্ত করেন।

উপসংহার: বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন আলোচনার খোরাক

ক্ষমতাচ্যুতির পর দীর্ঘ নীরবতা ভেঙে শেখ হাসিনার এই দীর্ঘ এবং বিস্তারিত সাক্ষাৎকার বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তাঁর এই বক্তব্য একদিকে যেমন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মাঝে নতুন করে আশার সঞ্চার করতে পারে, অন্যদিকে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের সপক্ষে থাকা দলগুলোর পক্ষ থেকে এর তীব্র প্রতিক্রিয়া আসার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এটি স্পষ্ট যে, শেখ হাসিনার এই সাক্ষাৎকার আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমীকরণ ও কূটনৈতিক টানাপোড়েনকে আরও বেশি গতিশীল ও বিতর্কিত করে তুলবে। বাংলাদেশের জাতীয়, আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় রাজনীতির যেকোনো বস্তুনিষ্ঠ এবং ব্রেকিং নিউজ সবার আগে পড়তে নিয়মিত ভিজিট করুন আপনাদের প্রিয় পোর্টাল দিগন্ত বাংলা নিউজ-এ।

 

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন