জাতীয় ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ
ঢাকা: রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বিশেষ ‘লাল টেলিফোন’ বা ‘রেড ফোন’। অত্যন্ত সুরক্ষিত এলাকা হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ সচিবালয়ের অভ্যন্তর থেকে এই লাল টেলিফোনের সংযোগের কপার কেব্ল বা তামার তার চুরির এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে। এই স্পর্শকাতর চুরির মামলায় গ্রেপ্তারকৃত দুই আসামির প্রত্যেককে ৫ দিন করে পুলিশি রিমান্ডের আদেশ দিয়েছেন আদালত।
আজ শুক্রবার (৫ জুন) ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে আসামিদের হাজির করা হলে শুনানি শেষে ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হাসান শাহাদাত এই রিমান্ডের আদেশ প্রদান করেন। রিমান্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন— সচিবালয়ের আউটসোর্সিং কর্মচারী রঞ্জন চন্দ্র (২৬) এবং চোরাই মাল ক্রেতা ও ভাঙারি ব্যবসায়ী রিজাকুল ইসলাম (৩২)।
আদালতের প্রসিকিউশন বিভাগের উপপরিদর্শক (এসআই) শাহ আলম বিষয়টি নিশ্চিত করে সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, রাষ্ট্রীয় অতি গুরুত্বপূর্ণ এই মামলার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে আসামিদের ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন রয়েছে।
আদালতের কার্যক্রম ও রিমান্ডের বিস্তারিত
আজ শুক্রবার মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের (সিটিটিসি) সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) ইনজামুল হক আসামিদের ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করেন। মামলার সুষ্ঠু তদন্ত, চুরির নেপথ্যে কোনো সুগভীর ষড়যন্ত্র বা রাষ্ট্রবিরোধী চক্রের হাত রয়েছে কিনা এবং ঘটনার সাথে আর কেউ জড়িত আছে কিনা— তা উদঘাটনের জন্য আসামিদের ৭ দিনের পুলিশ রিমান্ডের আবেদন জানানো হয়।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, শুনানির সময় আদালতে আসামিদের পক্ষে আইনি লড়াই করার জন্য কোনো আইনজীবী বা ডিফেন্স কাউন্সিল উপস্থিত ছিলেন না। রাষ্ট্রপক্ষে প্রসিকিউশন চুরির ঘটনাটিকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য চরম হুমকিস্বরূপ উল্লেখ করে রিমান্ডের পক্ষে জোর সওয়াল করেন। উভয়পক্ষের নথি পর্যালোচনা এবং ঘটনার ভয়াবহতা বিবেচনা করে বিজ্ঞ বিচারক হাসান শাহাদাত আসামিদের ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করার আদেশ দেন।
যেভাবে প্রকাশ্যে এলো চুরির চাঞ্চল্যকর ঘটনা
বাংলাদেশ সচিবালয়ের মতো সর্বোচ্চ নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেদ করে কীভাবে এই চুরির ঘটনা ঘটল, তা নিয়ে ইতিমধ্যে নানা মহলে চাঞ্চল্য ও প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনার বিবরণী ও মামলার এজাহার থেকে জানা যায়, সচিবালয়ের পুরোনো ১ নম্বর ভবন থেকে নবনির্মিত ১ নম্বর ভবন পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় টেলিযোগাযোগের জন্য একটি বিশেষ কপার কেব্ল (তামার তার) সংযোগ দেওয়া ছিল। এই সুনির্দিষ্ট কেব্লটির মাধ্যমেই মূলত সচিবালয়ে অবস্থিত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়সহ রাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় ও অতি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরগুলোর বিশেষ ‘লাল টেলিফোন’ নম্বর সচল রাখা হতো। একই সাথে অন্যান্য ভিআইপি টেলিফোন সংযোগও এই লাইনের মাধ্যমেই পরিচালিত হচ্ছিল।
আরও পড়ুন: বিশ্বকাপ ফুটবল জ্বরে ভাসবে বাংলাদেশ: তিন চ্যানেলে সম্প্রচার নিশ্চিত
ঘটনার দিন কিছু ‘দুর্বৃত্ত’ অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে ভবনের ছাদে উঠে কপার কেব্লটি কেটে নিয়ে যায়। তার কেটে ফেলার সাথে সাথেই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের লাল টেলিফোনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর সরকারি দপ্তরের টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও অচল হয়ে পড়ে। রাষ্ট্রের শীর্ষ স্তরের যোগাযোগ আকস্মিকভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রশাসনের অভ্যন্তরে চরম উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার সৃষ্টি হয়। তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি খতিয়ে দেখতে মাঠে নামে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাসমূহ।
বিটিসিএলের মামলা ও ছায়াতদন্ত
টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হওয়ার পর বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন্স কোম্পানি লিমিটেডের (বিটিসিএল) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দ্রুত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। এরপর বিটিসিএলের কর্মকর্তা মোহাম্মদ নাজিদ হায়দার বাদী হয়ে রাজধানীর শাহবাগ থানায় একটি আনুষ্ঠানিক মামলা দায়ের করেন। মামলার গুরুত্ব বিবেচনা করে এবং এটি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার সাথে জড়িত থাকায় দ্রুত এর তদন্তভার দেওয়া হয় ডিএমপির কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটকে। সিটিটিসি ঘটনার ছায়াতদন্ত শুরু করে এবং প্রযুক্তিগত সহায়তায় অপরাধীদের শনাক্তকরণে নামে।
তদন্তের অগ্রগতি ও যেভাবে গ্রেপ্তার হলেন আসামিরা
ডিএমপির কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের একটি বিশেষ দল ঘটনাস্থলের চারপাশের সিসিটিভি ফুটেজ, তদন্তে প্রাপ্ত ডিজিটাল তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ এবং নিজস্ব গোপন গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ঘটনার মূল হোতাকে চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়।
প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে গত বৃহস্পতিবার (৪ জুন) দুপুরে সচিবালয় এলাকা থেকেই আউটসোর্সিং কর্মী রঞ্জন চন্দ্রকে হেফাজতে নেয় পুলিশ। এরপর সিটিটিসি কার্যালয়ে এনে তাকে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদেই রঞ্জন চন্দ্র গোয়েন্দাদের কাছে লাল টেলিফোনের তার চুরির আদ্যোপান্ত স্বীকার করেন।
রঞ্জন চন্দ্র জানান, গত ২২ মে সুযোগ বুঝে তিনি অত্যন্ত গোপনে ওই ভবনের ছাদে গিয়ে লাল টেলিফোনের সংযোগে ব্যবহৃত মূল্যবান কপার কেব্ল বা তামার তার কেটে চুরি করেন। চুরির পর তিনি সেই তার লুকিয়ে রাখেন এবং পরবর্তীতে বিক্রির পরিকল্পনা করেন।
সামান্য টাকায় বিক্রি ও তার উদ্ধার অভিযান
জিজ্ঞাসাবাদে রঞ্জন চন্দ্র আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রদান করেন। তিনি জানান, চুরির প্রায় এক সপ্তাহ পর গত ১ জুন তিনি চুরি করা রাষ্ট্রীয় কপার কেব্লগুলো নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল ও অমর একুশে হলের মধ্যবর্তী এলাকার একটি ভাঙারি দোকানে যান। সেখানে প্রতি কেজি মাত্র ৬০০ টাকা দরে মোট ৮ কেজি ২০০ গ্রাম তামার তার ভাঙারি ব্যবসায়ী রিজাকুল ইসলামের কাছে বিক্রি করে দেন। এই বিপুল পরিমাণ রাষ্ট্রীয় সম্পদের বিনিময়ে তিনি মাত্র কয়েক হাজার টাকা হাতিয়ে নেন।
রঞ্জন চন্দ্রের দেওয়া এই সুনির্দিষ্ট ও স্বীকারোক্তিমূলক তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সিটিটিসির অভিযান পরিচালনাকারী দলটি দ্রুত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একুশে হল সংলগ্ন ওই ভাঙারি দোকানে অভিযান চালায়। সেখান থেকে ভাঙারি ব্যবসায়ী রিজাকুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তীতে রিজাকুলকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী পুরান ঢাকার চকবাজার থানার অন্তর্গত হোসেনি দালান রোড এলাকার একটি বড় ভাঙারি গুদামে হানা দেয় পুলিশ। সেখান থেকে তল্লাশি চালিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অচল হয়ে যাওয়া লাল টেলিফোনের চুরি হওয়া কপার কেব্ল বা তামার তারগুলো সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করতে সক্ষম হয় ডিএমপির কাউন্টার টেররিজম ইউনিট।
নিরাপত্তা ও আইনি বিশারদদের উদ্বেগ
সচিবালয়ের মতো দেশের সবচেয়ে সুরক্ষিত ও সংরক্ষিত এলাকায় সাধারণ একজন আউটসোর্সিং কর্মীর পক্ষে কীভাবে এমন একটি স্পর্শকাতর রাষ্ট্রীয় লাইনের তার কেটে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হলো, তা নিয়ে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, এটি কেবল একটি সাধারণ চুরি বা তামার তারের লোভ নয়, এর পেছনে প্রশাসনিক তদারকির বড় ধরনের গাফিলতি রয়েছে। আউটসোর্সিং কর্মীদের নিয়োগের ক্ষেত্রে পুলিশের ভেরিফিকেশন বা সঠিক ব্যাকগ্রাউন্ড চেক করা হয়েছিল কিনা— তা নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠছে।
আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রিমান্ড চলাকালীন আসামিদের কাছ থেকে জানার চেষ্টা করা হবে যে, রঞ্জন চন্দ্র কি কেবল টাকার লোভেই এই কাজ করেছিলেন, নাকি এর পেছনে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ ব্যবস্থাকে অচল করে দেওয়ার কোনো সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক বা আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র ছিল। ৫ দিনের এই রিমান্ডে অনেক অজানা তথ্য বেরিয়ে আসবে বলে আশা করছে কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।