রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রের হাতে বৃদ্ধা লাঞ্ছিত, এলাকাবাসীর সড়ক অবরোধ

রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রের হাতে বৃদ্ধা লাঞ্ছিত, এলাকাবাসীর সড়ক অবরোধ

নিজস্ব প্রতিবেদন / শাহজাদপুর, সিরাজগঞ্জ / দিগন্ত বাংলা নিউজ

উচ্চশিক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যাপীঠ হিসেবে পরিচিত বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের আশপাশের এলাকায় শিক্ষার্থী ও স্থানীয় সাধারণ মানুষের মধ্যকার সম্পর্ক সবসময় সৌহার্দ্যপূর্ণ ও পারস্পরিক সহযোগিতামূলক হওয়া বাঞ্ছনীয়। কিন্তু অনেক সময় সামান্য কিছু বিষয়কে কেন্দ্র করে অনাকাঙ্ক্ষিত ও অপ্রত্যাশিত সংঘাতের সৃষ্টি হয়, যা গোটা শিক্ষাঙ্গন ও স্থানীয় জনপদকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। সম্প্রতি সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর পৌর এলাকার বিসিক রোড সংলগ্ন রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের আশেপাশের এলাকায় এমনই এক মর্মান্তিক ও ন্যক্কারজনক ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থীর কাছে দীর্ঘদিনের খাবারের বকেয়া পাওনা টাকা চাইতে গিয়ে এক অসহায় বৃদ্ধা নারী শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত ও গুরুতর জখমের শিকার হয়েছেন। এই অমানবিক ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই স্থানীয় এলাকাবাসীর মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয় এবং তারা দোষী শিক্ষার্থীর শাস্তির দাবিতে রাজপথে নেমে এসে তীব্র আন্দোলন ও বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন।

আরও পড়ুন: নেছারাবাদে ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়ের অভিযোগ যুবলীগ নেতার বিরুদ্ধে

ঘটনার বিস্তারিত বিবরণী ও স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত নির্ভরযোগ্য তথ্যানুযায়ী, সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর পৌর শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত বিসিক রোডের ভেতরে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অস্থায়ী ছাত্র হোস্টেল রয়েছে। এই অস্থায়ী হোস্টেলে অবস্থানরত বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিন ধরে প্রতিদিনের রান্না করা খাবার মিল হিসেবে অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে বিক্রি ও সরবরাহ করে আসছেন স্থানীয় রামবাড়ি মহল্লার নিবাসী জ্যোতির সম্মানিত স্ত্রী ষাটোর্ধ্ব বয়সের এক বৃদ্ধা নারী, যাঁর নাম ফেরদৌসী বেগম। বয়সের ভারে ন্যুব্জ এবং জীবিকার তাগিদে এই বয়সেও রান্না করে ছাত্রদের খাওয়ানোর মাধ্যমে নিজের সংসার চালিয়ে আসা এই মহিলার পাওনা টাকা সময়মতো না পেয়ে একপর্যায়ে চরম আর্থিক সংকটের মুখে পড়তে হয়। জানা যায় যে, হোস্টেলে বসবাসকারী রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অভিযুক্ত ফেরদৌসের কাছে রান্নার বকেয়া খাবারের বিল বাবদ দীর্ঘদিনের সুনির্দিষ্ট বেশ কিছু অর্থ পাওনা ছিল।

আরও পড়ুন: কামারখন্দে ফারিয়ার মাসিক সভা অনুষ্ঠিত, মাঠপর্যায়ের সমস্যা সমাধানে আশ্বস্ত করলেন নেতৃবৃন্দ

প্রতিদিনের ব্যবসার হিসাব ও বকেয়া পাওনা টাকা পরিশোধ করার জন্য বিভিন্ন সময় অভিযুক্ত ছাত্রের কাছে অনুরোধ জানালেও সে নানামুখী তালবাহানা ও গড়িমসি করতে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় ঘটনার দিন সকালে বৃদ্ধা ফেরদৌসী বেগম নিজ পাওনা টাকা তোলার উদ্দেশ্যে অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর কাছে পুনরায় বকেয়া টাকা পরিশোধের দাবি জানান। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় হলো, পাওনা টাকা চাওয়ার অপরাধে ক্ষিপ্ত হয়ে ওই শিক্ষার্থী বৃদ্ধার ওপর চড়াও হন এবং তাঁকে শারীরিকভাবে মারাত্মক মারধর করে গুরুতর আহত করেন। বয়স্ক এক নারীর ওপর এমন পাশবিক নির্যাতনের খবর মুহূর্তের মধ্যেই আশপাশের এলাকায় দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে স্থানীয় রামবাড়ি মহল্লার ক্ষুব্ধ বাসিন্দারা ও সাধারণ মানুষ তাৎক্ষণিকভাবে একত্রিত হয়ে বিসিক রোডে অবস্থিত রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্থায়ী হোস্টেলের মূল প্রবেশদ্বারের সামনে এসে রাস্তা অবরোধ করে তীব্র বিক্ষোভ শুরু করেন।

রাস্তা অবরোধ ও চরম উত্তেজনার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শাহজাদপুর থানা পুলিশের একটি চৌকস দল দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য জোর প্রচেষ্টা চালান। পরবর্তীতে পরিস্থিতি আরও বেগতিক দেখে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন শাহজাদপুর থানার সম্মানিত অফিসার ইনচার্জ ওসি মো. সাইফুল ইসলাম এবং বিজ্ঞ পরিদর্শক তদন্ত মো. নাজমুল কাদের। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে তাৎক্ষণিকভাবে আহত বৃদ্ধা ফেরদৌসী বেগমকে নিরাপদ স্থান থেকে উদ্ধার করে উন্নত চিকিৎসার জন্য দ্রুত শাহজাদপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। এদিকে জনগণের তীব্র বিক্ষোভের মুখে পুলিশ তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে অভিযুক্ত রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ফেরদৌসকে আটক করতে সক্ষম হয় এবং তাকে নিরাপদে থানায় নিয়ে যায়।

এই সম্পূর্ণ ঘটনার প্রেক্ষাপটে হামলার শিকার হয়ে চিকিৎসাধীন ভুক্তভোগী বৃদ্ধা ফেরদৌসী বেগম গণমাধ্যমের সামনে তাঁর ওপর ঘটে যাওয়া নির্যাতনের বর্ণনা দিয়ে অত্যন্ত দুঃখভারাক্রান্ত হৃদয়ে জানান যে, দীর্ঘদিন যাবত হোস্টেলের ছাত্রদের খাবার পরিবেশন করে আসছিলেন তিনি। ফেরদৌসের কাছে পাচ হাজার টাকা বকেয়া হয়ে যায়। বিভিন্ন সময় টাকা চাইতে গেলে বিভিন্ন রকম টালবাহানা করতে থাকে। আজ সকালে ফেরদৌসের কাছে বকেয়া টাকা চাইলে তাকে মারধর করে গুরুতর আহত করে। তাঁর এই হৃদয়বিদারক বক্তব্যের মধ্য দিয়ে একজন অসহায় বয়স্ক নারীর প্রতি ঘটিত অমানবিক আচরণের চিত্র স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে, যা স্থানীয় সচেতন মহলকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছে।

বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ভেতরে ও বাইরে শিক্ষার্থী কর্তৃক এমন ন্যক্কারজনক হামলার ঘটনার পর রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকেও তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে। ঘটনার বিষয়ে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত প্রক্টর মো. নজরুল ইসলাম সংবাদ মাধ্যমকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তাঁর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, এই বিষয়ে এখনও বিস্তারিত জানতে পারিনি। এরকম ঘটনা ঘটলে অবশ্যই দুঃখজনক, আমি ভুক্তভোগী ও অভিযুক্ত ছাত্রের সাথে কথা বলতে পারিনি। সবার সহযোগিতা নিয়ে আমরা একটি সুন্দর সমাধান করার চেষ্টা করছি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এই দায়িত্বশীল বক্তব্যের পর উদ্ভূত পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়েছে এবং স্থানীয় প্রশাসন ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে পুরো বিষয়টি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে খতিয়ে দেখছে।

সূত্র: নিজস্ব প্রতিবেদন

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন