নেছারাবাদে ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়ের অভিযোগ যুবলীগ নেতার বিরুদ্ধে

নেছারাবাদে ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়ের অভিযোগ যুবলীগ নেতার বিরুদ্ধে
ছবি: সংগৃহীত

নেছারাবাদ প্রতিনিধি / পিরোজপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ

বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সাধারণ মানুষকে নানা অজুহাতে ব্ল্যাকমেইল করে অর্থ আদায়ের ঘটনা প্রায়শই জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আইনবহির্ভূতভাবে ক্ষমতা জাহির করে সাধারণ মানুষের দুর্বলতার সুযোগ নেওয়ার অপচেষ্টা সমাজকে কলুষিত করছে। সম্প্রতি এমনই এক ন্যাক্কারজনক ও চাঞ্চল্যকর ঘটনা সংঘটিত হয়েছে দক্ষিণাঞ্চলের জেলা পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলায়। পরকীয়ার মিথ্যা অপবাদ দিয়ে এবং গোপনে ভিডিও ধারণ করার ভুয়া ভয় দেখিয়ে এক অসহায় নারীর কাছ থেকে জোরপূর্বক অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত যুবলীগের এক স্থানীয় নেতার বিরুদ্ধে। এই অনৈতিক কর্মকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে স্থানীয় সচেতন মহলে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার ঝড় বইতে শুরু করেছে।

আরও পড়ুন: বজ্রপাতের ঝুঁকি কমাতে দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে ১৮০০ তালবীজ রোপণ

ঘটনার বিবরণী ও স্থানীয় সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, গত রোববার বিশ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলার অধীনস্থ বলদিয়া ইউনিয়নের নয় নম্বর ওয়ার্ডের খেজুরবাড়ি গ্রামে এই অপ্রীতিকর ঘটনাটি ঘটে। অভিযুক্ত যুবলীগ নেতার নাম আরিফুল ইসলাম, যিনি বলদিয়া ইউনিয়নের নয় নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন এবং বর্তমানে সংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় তিনি স্থানীয়ভাবে নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ঘটনার দিন ওই গ্রামের এক বিধবা নারীর বসতঘরে প্রতিবেশী রতন কুমার বাগচী পান খাওয়ার উদ্দেশ্যে প্রবেশ করেন। এই সামান্য বিষয়টিকে কেন্দ্র করে পূর্বশত্রুতার জের ধরে যুবলীগ নেতা আরিফুল ইসলাম তাঁর দুই সহযোগী স্থানীয় সবুজ বাগচী ও মো. শরীফ হোসেনকে সঙ্গে নিয়ে দলবদ্ধভাবে ওই নারীর ঘরে প্রবেশ করেন।

ঘরে প্রবেশ করার পরই তারা ওই নারী ও প্রতিবেশী রতন কুমার বাগচীর বিরুদ্ধে আপত্তিকর সম্পর্কের মিথ্যা অপবাদ তুলতে শুরু করেন এবং গোপনে ভিডিও ধারণ করা হয়েছে বলে দাবি করেন। এই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে তারা ওই ভুক্তভোগী পরিবারের কাছে তাৎক্ষণিকভাবে দুই লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। পরবর্তীতে লোকলজ্জার ভয়ে ও সামাজিক সম্মান রক্ষার্থে অসহায় ওই ভুক্তভোগী পরিবার বাধ্য হয়ে দুই ধাপে প্রথমে বিশ হাজার এবং পরবর্তীতে আরও নয় হাজার টাকা মিলিয়ে মোট উনত্রিশ হাজার টাকা দিতে বাধ্য হয় বলে অভিযোগে প্রকাশ পায়। এই অনৈতিক অর্থ আদায়ের পর এলাকায় চরম অসন্তোষ দেখা দেয়।

আরও পড়ুন: সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জে মসজিদের ভেতরে চেয়ার-সোফায় বসে এমপি’র কর্মসূচি নিয়ে তুমুল আলোচনা-সমালোচনা

ভুক্তভোগী ও প্রত্যক্ষদর্শী রতন কুমার বাগচী পুরো ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন, 'আমার প্রতিবেশী ওই নারীর সঙ্গে পারিবারিকভাবে সুসম্পর্ক থাকায় সন্ধ্যার দিকে ঘরে ঢুকে একটি পান খাই। এ সময় ওৎ পেতে থাকা যুবলীগ নেতা আরিফুল ইসলাম, সবুজ বাগচী ও মো. শরীফ ঘরে ঢুকে আমাকে অপবাদ দিয়ে ভিডিও ধারণের কথা বলে ২ লাখ টাকা দাবি করেন। লোকোলজ্জার ভয়ে ওদেরকে দুই ধাপে ২৯ হাজার টাকা দিতে বাধ্য হই। পরবর্তীতে স্থানীয়দের জানালে তারা কোনো ভিডিও দেখাতে পারেননি। আমি অন্যায় করলে স্থানীয়দের মাধ্যমে বিচার না করে গোপনে ভয় দেখিয়ে টাকা নেওয়ার ঘটনায় আমি বিচার চাই।'

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি বলদিয়া ইউনিয়নের নয় নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মনোজ কুমার ঢালী বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য করে জানান, 'বিষয়টি আমি শুনেছি। ভুক্তভোগী ওই নারী ও রতন কুমার বাগচীর পরিবারের সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকায় প্রায়শই দুই পরিবার আসা-যাওয়া করে। এটা দোষের কিছু নয়। উভয় পক্ষকে ডেকেছিলাম। তাদের আপত্তিকর অবস্থায় দেখার স্বপক্ষে কোনো ভিডিও অথবা সুনির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেননি। ভয়ভীতি দেখিয়ে ২৯ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়া ঠিক হয়নি।'

এদিকে অভিযুক্ত যুবলীগ নেতা আরিফুল ইসলামের কাছে এই চাঁদাবাজি ও ব্ল্যাকমেইলের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি উল্টো দাবি করে বলেন, 'ওই নারীর সঙ্গে রতন কুমার বাগচীর অবৈধ সম্পর্ক আছে। আমরা দুজনকে আপত্তিকর অবস্থায় হাতেনাতে ধরেছি।' চাঁদা নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি আরও দাবি করেন, 'আমি চাঁদা নিইনি। মিষ্টি খাবার জন্য দুই হাজার টাকা নিয়ে তাদের ছেড়ে দিয়েছি।' মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি অসংলগ্ন মন্তব্য করে বলেন, 'রাতের আঁধারে ভিডিও ধারণ করেছি তাই ক্লিয়ার ওঠেনি'—এই কথা বলে তিনি দ্রুত মুঠোফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

ঘটনার পর এলাকায় বিএনপির নাম ভাঙিয়ে চাঁদা নেওয়ার গুঞ্জন উঠলে বলদিয়া ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক মাস্টার এনামুল হক রতন সরেজমিনে গিয়ে তদন্ত করেন। তিনি জানান, 'সোশ্যাল মিডিয়ায় বিএনপি নেতার নাম ভাঙিয়ে চাঁদা নেওয়ার খবর দেখে সরেজমিনে গিয়েছিলাম। ওই স্থানে গিয়ে দেখি অভিযুক্ত আরিফুল ইসলাম বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। দুই-একদিনের মধ্যে উভয়পক্ষকে ডেকে প্রকৃত ঘটনা জেনে সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করব।' অন্যদিকে নেছারাবাদ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওসি মেহেদী হাসান আইনগত ব্যবস্থার বিষয়ে জানান, 'এ বিষয়ে কোনো অভিযোগ পাইনি। লিখিত অভিযোগ পেলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।' পুলিশ প্রশাসনের তরফ থেকে সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।

সূত্র: স্থানীয় প্রতিনিধি ও সংবাদ মাধ্যম।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন