বগুড়ায় হাফেজ হৃদয় হত্যায় ২ জনের ও ৩ জনের যাবজ্জীবন

বগুড়ায় হাফেজ হৃদয় হত্যায় ২ জনের মৃত্যুদণ্ড ও ৩ জনের যাবজ্জীবন
ছবি: সংগৃহীত

প্রতিবেদন: শামীম হোসাইন / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ

বাংলাদেশে উদীয়মান ব্যবসায়ী ও সাধারণ নাগরিকদের জীবনযাত্রার নিরাপত্তা বিধান এবং সমাজ থেকে বেআইনি চাঁদা আদায়ের মারাত্মক অপরাধ দমনে এক ঐতিহাসিক ও সিদ্ধান্তমূলক বিচারিক দৃষ্টান্ত স্থাপিত হলো উত্তরবঙ্গের অন্যতম বাণিজ্য নগরী বগুড়ায়। বগুড়া শহরের অতি পরিচিত ও জনবহুল এলাকা কৈপাড়ায় একটি মুদিদোকানে পবিত্র ঈদের চাঁদা না পেয়ে আল-কোরআনের হাফেজ ও তরুণ সফল ব্যবসায়ী রাকিবুল হাসান হৃদয়কে (২৮) নৃশংসভাবে কুপিয়ে এবং ছু রিকাঘাত করে বর্বরোচিতভাবে হত্যার আলোচিত মামলায় দুইজনকে মৃত্যুদণ্ড এবং তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন বিচারালয়। একই সাথে আদালত তাঁর আদেশে মৃত্যুদণ্ড ও যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত পাঁচজন আসামির প্রত্যেককে নগদ ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানার নির্দেশ প্রদান করেছেন। সোমবার (৩১ আগস্ট ২০২৬) বেলা পৌনে ১২টার দিকে বগুড়ার বিজ্ঞ অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ পঞ্চম আদালতের বিচারক কৌশিক আহমেদ খোন্দকার পূর্ণাঙ্গ এজলাসে উপস্থিত হয়ে এই গুরুত্বপূর্ণ রায়টি ঘোষণা করেন। দীর্ঘ শুনানির পর ১৫ জন সাক্ষীর দেওয়া বিবরণ বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞ আদালত অপরাধীদের বিরুদ্ধে এই চূড়ান্ত সাজা দেন।

আরও পড়ুন: শাহজাদপুরে নজরুল বর্ষ উপলক্ষে সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার উদ্বোধন

মামলার বিস্তারিত বিবরণীতে প্রকাশ, আজ থেকে কয়েক বছর পূর্বে ২০২১ সালের ২০ জুলাই সন্ধ্যা আনুমানিক সাড়ে সাতটার দিকে বগুড়া সদর উপজেলার কৈপাড়া এলাকায় অবস্থিত 'হৃদয় ভ্যারাইটি স্টোর' নামের একটি মুদি প্রতিষ্ঠানে এই অনাকাঙ্ক্ষিত ও রোমহর্ষক ঘটনার সূচনা হয়েছিল। আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহা উৎসবকে কেন্দ্র করে অভিযুক্ত আসামিরা সসংঘবদ্ধ হয়ে দোকানে প্রবেশ করে স্বত্বাধিকারী হাফেজ রাকিবুল হাসান হৃদয়ের কাছে বেআইনিভাবে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করতে থাকে। তবে নিজের কষ্টার্জিত আয়ে বিশ্বাসী হৃদয় এবং দোকানে অবস্থানরত তাঁর প্রবীণ পিতা অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মামুনুর রশীদ (৫৮) অন্যায্য আর্থিক দাবি মেনে নিতে অস্বীকৃতি প্রকাশ করেন। চাঁদার টাকা না পেয়ে চরম ক্ষিপ্ত ও সশন্ত্র হয়ে উঠে অভিযুক্ত আসামিরা। তারা পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী সাথে রাখা রামদা ও ধারালো ছুড়ি নিয়ে সরাসরি দোকানের ভেতর ঢুকে পিতা-পুত্র দুজনকেই উদ্দেশ্য করে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকে। আশঙ্কাজনক ও রক্তস্নাত অবস্থায় স্থানীয় জনগণ তাঁদের উদ্ধার করে তড়িৎ চিকিৎসার্থে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। তবে জখম মারাত্মক হওয়ায় চিকিৎসাধীন অবস্থাতেই প্রাণ হারান কোরআনের হাফেজ হৃদয়।

আদালতের রায়ে সশ্রম মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত দুই আসামি হলেন—বগুড়া সদর উপজেলার ধাওয়াপাড়া এলাকার নিবাসী টিয়া মিয়ার ছেলে সাদ্দাম হোসেন স্বাধীন (২৩) এবং আসলামের ছেলে মোঃ রাব্বি (২৪)। অন্যদিকে বিচারে সশ্রম যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত অপর তিন আসামি হলেন—একই ধাওয়াপাড়া গ্রামের মমতাজের ছেলে আশিক (২২), মনু মিштоু মিয়ার ছেলে মোঃ শাকিল (২৩) এবং সাফির ছেলে মতিন (২৫)। বিজ্ঞ বিচারক তাঁর রায়ের পর্যবেক্ষণে স্পষ্টভাবে আলোকপাত করেন যে, সমাজব্যবস্থায় শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং নিরপরাধ ব্যবসায়ী ও নাগরিকদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার সার্বিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হলে এই জাতীয় জঘন্য অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ সর্বোচ্চ শাস্তির বিকল্প নেই।

আরও পড়ুন: জ্বালানি সংকট ৬ মাসের ফসল নয়: পটুয়াখালীতে নুরুল হক নুর

ভয়াবহ এই সন্ত্রাসী প্রাণহানির পর নিহত হৃদয়ের শোকাকুল মাতা মোছাঃ আয়েশা সিদ্দিকা বাদী হয়ে বগুড়া সদর থানায় পাঁচজন নামীয় আসামিসহ অজ্ঞাতপরিচয় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পুলিশ কর্মকর্তা নিবিড় তদন্ত প্রক্রিয়া শেষে সব আসামির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের সত্যতা পেয়ে আদালতে চার্জশিট পেশ করেন। মামলার দীর্ঘ বিচারিক অনুশীলনে আদালত সর্বমোট ১৫ জন প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সাক্ষীর মূল্যবান বক্তব্য গ্রহণ করেন। রায় প্রকাশের পর রাষ্ট্রপক্ষের অতিরিক্ত পিপি অ্যাডভোকেট এস এম মাসুদুর রহমান স্বপন রায়ের সত্যতা নিশ্চিত করে জানান যে, চাঁদা না দেওয়ার অতি তুচ্ছ ঘটনার জেরে এক সম্ভাবনাময় হাফেজকে হত্যা করা হয়। বিচারালয়ে অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় এই চূড়ান্ত রায়ে রাষ্ট্রপক্ষ গভীর সন্তুষ্টি জ্ঞাপন করছে।

এদিকে বিচারকের রায় ঘোষণার পর আদালত চত্বরের বাইরে নিহতের পরিবারের স্বজনদের মাঝে এক বেদনাবিধুর ও পরমাশ্রুসজল পরিবেশের জন্ম হয়। নিহত হৃদয়ের কান্নাজড়ানো মা আয়েশা সিদ্দিকা সাংবাদিকদের জানান, ঈদের আগের দিন পিশাচরা তাঁর একমাত্র ছেলেকে হত্যা করেছিল, আর ঈদের পরদিন জন্ম নেয় হৃদয়ের এক পিতৃহীন শিশুপুত্র। যে সন্তান জন্ম নিয়ে কখনো তার পিতাকে দেখার সুযোগ পায়নি, সেই শিশুটির ভবিষ্যৎ ও নিহত হৃদয়ের আত্মার শান্তির স্বার্থে পরিবার বিচারকের দেয়া এই কঠোর রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছে এবং সাজা দ্রুত বাস্তবায়নের আকুল মিনতি জানিয়েছে।

সূত্র: আদালত ও পুলিশ।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন