প্রতিবেদন: আব্দুস ছাত্তার (শামীম) / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ
উত্তরবঙ্গের সীমান্তঘেঁষা জেলা পঞ্চগড়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির অন্যতম প্রাণপ্রবাহ ঐতিহ্যবাহী করতোয়া নদী এখন চরম অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে। অসাধু ভূমিদখলদার ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের অনিয়ন্ত্রিত আগ্রাসনে দিন দিন সংকুচিত হয়ে আসছে এই নদ-নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও সার্বিক আয়তন। নদীর ভাঙন রোধ এবং পার্শ্ববর্তী লোকালয়কে প্লাবনের হাত থেকে সুরক্ষার জন্য সরকারিভাবে যেসব প্রতিরক্ষাবাঁধ ও সিসি ব্লক নির্মাণ করা হয়েছিল, সেগুলোকে অবৈধভাবে দখল করে প্রতিদিন গড়ে তোলা হচ্ছে স্থায়ী ও অস্থায়ী নানা ধরনের অবকাঠামো। রক্ষাবাঁধের সরকারি সিসি ব্লক উপড়ে ফেলে বালু ভরাট, পাকা সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ এমনকি স্থায়ী বহুতল ভবন তৈরির মাধ্যমে নদীকে কার্যত গ্রাস করতে শুরু করেছে একশ্রেণির ভূমিদস্যু গোষ্ঠী। দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যে এমন অরাজকতা চললেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নীরবতায় চরম ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় অধিবাসীরা।
আরও পড়ুন: সোনারগাঁয়ে মসজিদ ফান্ডের হিসাব কেন্দ্র করে যুবককে কুপিয়ে জখম ও বাড়িতে তাণ্ডব
পঞ্চগড় পৌরসভা এলাকার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্গত রাজনগর সিনেমা হল সংলগ্ন এলাকা থেকে শুরু করে রাজনগর খালপাড়া পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার বিস্তৃত নদী তীরবর্তী রক্ষাবাঁধ ঘুরে দেখা গেছে দখলের ভয়াবহ চিত্র। সেখানে নদীর মূল সীমানা ও প্রতিরক্ষাবাঁধের স্পর্শকাতর জমি দখল করে একের পর এক নির্মিত হয়েছে বহুতল বাণিজ্যিক ও আবাসিক ভবন, সেমিপাকা বসতঘর, কাঁচা-পাকা দোকানপাট এবং বিভিন্ন শৌচাগার। অনেক স্থানে নদীর স্বাভাবিক ঢাল ও বাঁধের সিসি ব্লকগুলোকে জোরপূর্বক সরিয়ে দিয়ে বিপুল পরিমাণ বালু ভরাট করা হয়েছে। এরপর সেই ভরাটকৃত নদীর জমিতে সুউচ্চ আরসিসি পিলার স্থাপন করে ইটের দেয়াল গেঁথে সীমানা প্রাচীর তৈরি করা হয়েছে। এমনকি নিজেদের দখলদারিত্বকে স্থায়ী রূপ দিতে দখলিকৃত নদীর জায়গায় বিভিন্ন গাছের চারা রোপণ করে নদীর জমিকে ব্যক্তিমালিকানাধীন সম্পত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার পাঁয়তারা চালানো হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও সচেতন নাগরিকদের অভিযোগে জানা গেছে, এক দিনে বা হঠাৎ করে এই দখলের উৎসব শুরু হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে ধাপে ধাপে নদীর সীমানা দখল করা হলেও প্রশাসনিক পর্যায় থেকে কার্যকর কোনো প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালী চক্রের প্রত্যক্ষ মদদ ও ছত্রচ্ছায়ায় এই বিশাল নদীদখল বাণিজ্য পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ক্ষমতাবানদের দাপট ও প্রশাসনিক উদাসীনতার সুযোগ নিয়ে সাধারণ মানুষের চোখ ফাঁকি দিয়ে নদীর অস্তিত্ব মুছে ফেলার প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। নদী সুরক্ষা আইন ও পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অমান্য করে এভাবে জনগুরুত্বপূর্ণ নদীর তীর দখল করার ঘটনা পঞ্চগড় শহরের পরিবেশগত ভারসাম্যকে চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
আরও পড়ুন: পতেঙ্গায় ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণে চুক্তি, আইডিবি দিচ্ছে ১২,৩০০ কোটি টাকা
নদীর রক্ষাবাঁধ ও সরকারি জমিতে নির্মিত এসব বাণিজ্যিক ও আবাসিক স্থাপনার বৈধতা নিয়ে উঠেছে নানা গুরুতর প্রশ্ন। সুনির্দিষ্ট নিয়ম অনুযায়ী পৌরসভা বা স্থানীয় সরকার কর্তৃপক্ষের যেকোনো ভবন নির্মাণের জন্য নকশা অনুমোদনের নিয়ম থাকলেও, একটি বহমান নদীর সীমানা বা সরকারি প্রতিরক্ষাবাঁধের জমিতে কীভাবে এসব ভবনের অনুমোদন প্রদান করা সম্ভব—তা নিয়ে জনমনে চরম বিস্ময় তৈরি হয়েছে। এসব স্থাপনা কি আদৌ পৌরসভার সুনির্দিষ্ট অনুমোদন নিয়ে তৈরি করা হয়েছে, নাকি সম্পূর্ণ অবৈধভাবে নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে? আর যদি কোনো অনুমোদন থেকে থাকে, তবে নদীর মতো জাতীয় প্রাকৃতিক সম্পদ ধ্বংস করে এমন অনুমোদন প্রদান কতটুকু আইনসম্মত—তা নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা এখন সময়ের দাবি।
পরিবেশ গবেষকদের মতে, প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা কোনো নদ-নদীর স্বাভাবিক গতিপথ রুদ্ধ করা বা তীরবর্তী রক্ষাবাঁধ ধ্বংস করা বর্ষা মৌসুমে তীব্র জলবদ্ধতা ও নদীভাঙন ডেকে আনবে। করতোয়া নদীর মতো ঐতিহাসিক জলাধার যদি এভাবে অবৈধ দখলের কবলে পড়ে সংকুচিত হতে থাকে, তবে অদূর ভবিষ্যতে পঞ্চগড় শহর ভূগর্ভস্থ পানির সংকট এবং পরিবেশগত নানাবিধ জটিলতার মুখোমুখি হবে। তাই কেবল কাগজে-কলমে দখলের তালিকা তৈরি নয়, অনতিবিলম্বে সরজমিনে যৌথ ডিজিটাল জরিপের মাধ্যমে নদীর সঠিক সীমানা নির্ধারণ এবং অবৈধ অবকাঠামো উচ্ছেদ করে করতোয়া নদীকে তার আগের রূপ, নাব্যতা ও প্রাকৃতিক নান্দনিক সৌন্দর্যে ফিরিয়ে দেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন সচেতন এলাকাবাসী।
সূত্র: সরেজমিন পর্যবেক্ষণ ও স্থানীয় প্রতিনিধি।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।