প্রতিবেদন: আব্দুস ছাত্তার (শামীম) / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ
বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিকাঠামো, বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ আর্থিক দায়ের হালনাগাদ চিত্র এবং দেশীয় ব্যাংকিং ব্যবস্থার সার্বিক শৃঙ্খলা সংক্রান্ত এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জাতীয় সংসদ অধিবেশনে আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মোচিত হয়েছে। বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের ঘাড়ে মাথাপিছু ঋণের আনুপাতিক পরিমাণ দাঁড়িয়েছে সর্বমোট ১ লাখ ২৯ হাজার ২৩৯ টাকায়। জাতীয় সংসদ অধিবেশনে কুষ্টিয়া-১ আসনের সদস্যের উত্থাপিত এক সুনির্দিষ্ট লিখিত প্রশ্নের উত্তরে অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী রাষ্ট্রীয় ঋণের এই মূল পরিসংখ্যান স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করেছেন। রোববার (০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬) অনুষ্ঠিত সংসদ অধিবেশনে কুষ্টিয়া-১ আসনের জাতীয় সংসদ সদস্য রেজা আহাম্মেদের দেওয়া প্রশ্নের লিখিত জবাব দিতে গিয়ে অর্থমন্ত্রী দেশবাসীকে এই নতুন আর্থিক দায়বদ্ধতার চিত্রে অবহিত করেন।
আরও পড়ুন: ভারতের দিল্লিতে ছয়তলা পিজি হোস্টেল ভবন ধস, বহু শিক্ষার্থী আটকে পড়ার আশঙ্কা
জাতীয় সংসদে পেশ করা লিখিত জবাবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সুনির্দিষ্ট তথ্যাদি তুলে ধরে উল্লেখ করেন যে, ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ তারিখ পর্যন্ত হালনাগাদকৃত হিসাবের ওপর ভিত্তি করে দেখা যাচ্ছে যে, দেশের প্রতিটি নাগরিকের মাথার ওপর প্রাক্কলিত মাথাপিছু ঋণের প্রকৃত পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২৯ হাজার ২৩৯ দশমিক ১৯ টাকা। বিগত বছরগুলোর তুলনায় অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক দায়দেনা বাড়ার কারণে মাথাপিছু দায়ের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সরকারের প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা, জাতীয় অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্পসমূহের বাস্তবায়ন এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির মাঝে দেশীয় অর্থনীতির ভারসাম্য বজায় রাখার উদ্দেশ্যে গৃহীত অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত ঋণের সম্মিলিত প্রভাব থেকে এই অঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে বলে জানা গেছে।
জাতীয় ঋণের ক্রমবর্ধিত এই অনাকাঙ্ক্ষিত চাপের প্রেক্ষিতে জাতীয় সংসদে সরকারের গৃহীত নীতিগত অবস্থান ও ভবিষ্যত কর্মপরিকল্পনার বিষয়ে আলোকপাত করেন অর্থমন্ত্রী। তিনি সংসদকে আশ্বাস প্রদান করে স্পষ্ট জানান যে, ঋণের এই অনাকাঙ্ক্ষিত বোঝা ও অর্থনৈতিক চাপ কমিয়ে আনার জন্য বর্তমান সরকার ইতোমধ্যে সুদূরপ্রসারী কৌশল গ্রহণ করেছে। বিশেষ করে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণের মোট পরিধি উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করা, সরকারি আর্থিক সম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ দক্ষতা ও স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা করা এবং সামগ্রিক ঋণ ব্যবস্থাপনার কৌশলসমূহকে আরও বেশি শৃঙ্খলাবদ্ধ ও আধুনিকায়ন করার ওপর সর্বোচ্চ প্রাতিষ্ঠানিক অগ্রাধিকার প্রদান করা হচ্ছে। সরকারের এই কৌশল সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে মধ্যমেয়াদে অর্থনৈতিক চাপ লাঘব হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়।
আরও পড়ুন: সরকারি সফরে সৌদি আরব গেলেন নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল মিসবাহ উল আজীম
মাথাপিছু বিপুল পরিমাণ ঋণের সার্বিক তথ্যের পাশাপাশি জাতীয় সংসদের একই অধিবেশনে দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকিং খাতের আর্থিক পরিস্থিতির এক উদ্বেগজনক চিত্রও সমান্তরালভাবে উন্মোচিত হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের পেশকৃত সর্বশেষ নথিপত্রের হিসাব অনুযায়ী, গত ৩০ জুন ২০২৬ তারিখের নির্ধারিত সময়সীমা পর্যন্ত দেশের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ৬টি বাণিজ্যিক ব্যাংকে পুঞ্জীভূত খেলাপি ঋণের সর্বমোট পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪৭ হাজার ৭৭৬ কোটি ৩৬ লাখ টাকায়। দেশের ব্যাংকিং খাতের মোট মূলধন ও তারল্য ব্যবস্থাপনার জন্য এই বিশালাকার অনাদায়ী ও খেলাপি ঋণকে এক বিরাট চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
রাষ্ট্রীয় ব্যাংকিং খাতের এই বিপুল অংকের অনাদায়ী ঋণের বড় অংশই কেন্দ্রীভূত রয়েছে একটিমাত্র ব্যাংকের ওপর। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে, রাষ্ট্রায়ত্ত ওই ছয়টি ব্যাংকের মধ্যে এককভাবে সর্বোচ্চ পরিমাণ খেলাপি ঋণের বোঝা বহনে শীর্ষে অবস্থান করছে জনতা ব্যাংক। প্রাপ্ত সরকারি তথ্যানুযায়ী, কেবল এই জনতা ব্যাংকেই অনাদায়ী বা খেলাপি ঋণের পরিমাণ গিয়ে ঠেকেছে বিস্ময়কর ৭৫ হাজার ৩৯৬ কোটি ৬৭ হাজার টাকায়। যা রাষ্ট্রায়ত্ত সবকটি ব্যাংকের মোট খেলাপি অঙ্কের অর্ধেকেরও বেশি। জনতা ব্যাংকের এই বিশাল অংকের অনাদায়ী ঋণ পুরো আর্থিক খাতের জন্য এক বড় সতর্কবার্তা বয়ে আনছে।
সূত্র: জাতীয় সংসদ ও অর্থ মন্ত্রণালয়।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।