নিজস্ব প্রতিবেদন / শাহজাদপুর, সিরাজগঞ্জ / দিগন্ত বাংলা নিউজ
আধুনিক অপরাধবিজ্ঞান ও সংশোধনমূলক শাসনব্যবস্থায় কারাগারকে কেবল অপরাধীদের শাস্তিদানের অন্ধকার প্রকোষ্ঠ হিসেবে দেখার সনাতন ধ্যানধারণা বিলুপ্ত হচ্ছে। সমকালীন বিশ্বে কারাগারকে দেখা হচ্ছে মানবিক সংশোধন, ইতিবাচক রূপান্তর এবং সমাজে মর্যাদাপূর্ণ পুনর্বাসনের একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে। কিন্তু আমাদের দেশে কারাগারগুলো এখনও মূলত রাষ্ট্রীয় রাজস্বের এক বিশাল ব্যয়বহুল প্রতিষ্ঠান হিসেবেই পরিচালিত হচ্ছে। সঠিক কর্মপরিকল্পনার আওতায় কারাবন্দীদের একটি বড় অংশকে উৎপাদনমুখী কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা সম্ভব হলে বন্দীদের মানসিক রূপান্তর ঘটবে এবং রাষ্ট্রও লাভবান হবে। কারাগারকে নিষ্ক্রিয় বন্দিশালা থেকে উৎপাদনশীল প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে পরিণত করার বিষয়টি এখন সময়ের জরুরি দাবি।
দেশের কারাগারগুলোর সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানের দিকে দৃষ্টি দিলে বোঝা যায় যে সেখানে এক বিশাল কর্মক্ষম জনশক্তি অলস অবস্থায় দিনাতিপাত করছে। সরকারি তথ্যানুযায়ী দেশের বিভিন্ন কারাগারে বর্তমানে প্রায় আশি হাজার বন্দী অবস্থান করছেন, যার মধ্যে প্রায় দুই হাজার নারী এবং উল্লেখযোগ্য সংখ্যক তরুণ রয়েছেন। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর দৈনন্দিন খাবার, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপত্তা ও আবাসন বাবদ প্রতিবছর রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বিপুল অঙ্কের বাজেট ব্যয় করতে হয়। এদের মধ্যে যেমন সাজাপ্রাপ্ত কয়েদি রয়েছেন, তেমনি রয়েছেন বহু বিচারাধীন হাজতি। শারীরিকভাবে কর্মক্ষম এই ব্যক্তিদের অলস বসিয়ে না রেখে তাঁদের দক্ষতা বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করা হলে রাষ্ট্রের একক ব্যয়ভার অনেকাংশেই উৎপাদনশীলতায় রূপান্তর করা সম্ভব।
আরও পড়ুন: নবাবগঞ্জে মাদক কারবারিকে আশ্রয় দেওয়ায় স্বেচ্ছাসেবক দল নেতার পদ স্থগিত
কারাগারে এই রূপান্তরের জন্য প্রাথমিক পর্যায়ে স্বল্প মূলধন ও সহজলভ্য স্থানীয় প্রযুক্তিনির্ভর ক্ষুদ্র কুটির শিল্পের উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে। বাঁশ ও বেতের হস্তশিল্প, কাঠের আসবাবপত্র, মোমবাতি ও আগরবাতি প্রস্তুতকরণ, পরিবেশবান্ধব মশার কয়েল, প্যাকেটজাতকরণের কাগজের সামগ্রী, সেলাই ও তৈরি পোশাক শিল্প এবং নার্সারি ও কৃষিভিত্তিক কার্যক্রম এক্ষেত্রে অত্যন্ত ফলপ্রসূ হতে পারে। এছাড়া বর্তমান বাজারে চাহিদাসম্পন্ন বোতলজাত বিশুদ্ধ পানীয় জল প্রক্রিয়াকরণের ইউনিট স্থাপন করা যেতে পারে। তবে এই কর্মযজ্ঞে কোনো অবস্থাতেই বন্দীদের ওপর জবরদস্তিমূলক শ্রম চাপানো যাবে না। মানবাধিকার ও প্রচলিত আইন মেনে কেবল আগ্রহী ও উপযুক্ত বন্দীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে স্বেচ্ছায় উৎপাদনমূলক কাজে যুক্ত করতে হবে।
আরও পড়ুন: শাহজাদপুরে মুদি দোকানের আড়ালে মাদক ব্যবসা, ৫০ পিস ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার ১
উৎপাদিত পণ্যসামগ্রী সরকারি হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে সরবরাহের পাশাপাশি স্থানীয় বাজারে বিক্রির ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এই উৎপাদন থেকে অর্জিত আয়ের একটি অংশ বন্দীদের নামে ব্যাংকে সঞ্চয় করে রাখা সম্ভব, যা সাজা শেষে মুক্তির পর তাঁদের আত্মকর্মসংস্থান ও পরিবার পরিচালনায় সহায়ক হবে। এর ফলে মুক্তিপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা পুনরায় কোনো অপরাধে জড়ানোর ঝুঁকি থেকে মুক্ত থাকবেন। নারী বন্দীদের জন্য বিশেষ সুবিধাযুক্ত হস্তশিল্প ও নিরাপদ প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। অন্যদিকে অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোর বন্দীদের বাণিজ্যিক উৎপাদনে না জড়িয়ে তাদের নৈতিক শিক্ষা ও মানসিক বিকাশে অগ্রাধিকার দেওয়া বাঞ্ছনীয়। আর্থিক স্বচ্ছতা রক্ষায় প্রতিটি কারখানার আয়-ব্যয় ডিজিটাল নিরীক্ষার আওতায় রাখতে হবে।
এই সুদূরপ্রসারী কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের শুরুতে দেশের নির্বাচিত কয়েকটি কেন্দ্রীয় কারাগারে পরীক্ষামূলক পাইলট প্রকল্প চালু করা যেতে পারে। একই সঙ্গে কারাবন্দীদের বয়স, শারীরিক সক্ষমতা, পূর্ব পেশা ও আগ্রহের তথ্য নিয়ে একটি হালনাগাদ জাতীয় ডিজিটাল তথ্যভাণ্ডার গড়ে তোলা প্রয়োজন। এর মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যাবে ঠিক কতজন বন্দী উৎপাদন কার্যক্রমে যুক্ত হতে সক্ষম। বন্দীদের অপরাধের পরিচয়ে সীমাবদ্ধ না রেখে তাদের অন্তর্নিহিত সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারলে কারাগারগুলো ব্যয়ের খাত থেকে বেরিয়ে এসে জাতীয় উৎপাদনের পরিপূরক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাবে। রাষ্ট্র যদি এই সংস্কারমূলক উদ্যোগকে নীতিগতভাবে গ্রহণ করে, তবে কারাগার কেবল শাস্তির স্থান না হয়ে সত্যিকার অর্থেই মানবিক সংশোধন ও নতুন জীবন গড়ার সম্ভাবনাময় বাতিঘর হয়ে উঠবে।
সূত্র: কারা অধিদপ্তর ও মতামত বিশ্লেষণ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।