নিজস্ব প্রতিবেদন / শাহজাদপুর, সিরাজগঞ্জ / দিগন্ত বাংলা নিউজ
উত্তরবঙ্গের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জেলা সিরাজগঞ্জের তাড়াশ ও রায়গঞ্জ উপজেলায় সাম্প্রতিক সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটিয়ে সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের চাঞ্চল্যকর তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। গত তিন রাতে অত্যন্ত সুকৌশলে দুটি উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম ও জনপদে মোট পাঁচটি পৃথক চুরির ঘটনা ঘটিয়েছে সংঘবদ্ধ চোরেরা। রাতের আঁধারে গোয়ালঘরের তালা ভেঙে বা খিল কেটে অত্যন্ত নির্বিঘ্নে পাঁচজন প্রান্তিক কৃষক ও খামারির গোয়ালঘর থেকে সর্বমোট কুড়িটি গরু লুট করে নিয়ে গেছে অজ্ঞাতনামা দুর্বৃত্তরা। একের পর এক এমন দুঃসাহসিক ও বড় ধরনের চুরির ঘটনায় সর্বস্ব হারিয়ে পথে বসার উপক্রম হয়েছে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর। আকস্মিক এই ধারাবাহিক চুরির তাণ্ডবে পুরো এলাকার সাধারণ মানুষ, কৃষক ও খামারিদের মাঝে গভীর আতঙ্ক ও থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছে, যা জননিরাপত্তার ওপর এক বড় প্রশ্নচিহ্ন তুলে ধরেছে।
আরও পড়ুন: সিরাজগঞ্জে স্কুল থেকে প্রধান শিক্ষককে তুলে নিয়ে নির্যাতনের অভিযোগ বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে
ঘটনাগুলোর বিবরণ পর্যালোচনা করে জানা যায় যে, গত রোববার তেরো সেপ্টেম্বর দিবাগত রাতের বিভিন্ন সময়ে তাড়াশ উপজেলা সদরের খুটিগাছা, বারুহাস ইউনিয়নের পেঙ্গুয়ারি ও কুসুম্বী গ্রাম এবং পার্শ্ববর্তী রায়গঞ্জ উপজেলার ধামাইনগর ইউনিয়নের বাগিচা গোয়ালপাড়া ও আদিত্যবাড়িয়া এলাকায় এই পৈশাচিক চুরির ঘটনাগুলো একে একে সংঘটিত হয়েছে। ভুক্তভোগী ও স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত রোববার ১৩ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাত আনুমানিক দুইটা থেকে আড়াইটার দিকে তাড়াশ পৌর এলাকার খুটিগাছা গ্রামের বাসিন্দা হায়দার আলীর বসতবাড়ির গোয়ালঘরের তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে চোরেরা। অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে সংঘবদ্ধ চক্রটি তাঁর গোয়ালঘর থেকে মূল্যবান আটটি গরু চুরি করে নিয়ে পালিয়ে যায়। মাত্র একটি রাতের ব্যবধানে নিজের জীবনের সমস্ত সঞ্চয় ও আয়ের একমাত্র সম্বল আটটি গরু হারিয়ে আজ সম্পূর্ণ নিঃস্ব ও অসহায় হয়ে পড়েছেন হতভাগ্য কৃষক হায়দার আলী।
চুরির এই আতঙ্ক এখানেই থেমে থাকেনি, বরং এর পরের দুই রাতেও অপরাধীরা তাদের তাণ্ডব অব্যাহত রেখেছে। পরদিন সোমবার চৌদ্দ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাতে রায়গঞ্জ উপজেলার জামতৈল বাগিচা গোয়ালপাড়া এলাকায় নাকাটি বাজারের পার্শ্ববর্তী স্থানে অবস্থিত শরিফুল ইসলামের গোয়ালঘরে হানা দেয় চোরেরা। সেখান থেকে সুকৌশলে একটি দুগ্ধবতী গাভী ও দুটি বকনা গরু চুরি করে নিয়ে যায় তারা। ঠিক একই রাতে রায়গঞ্জ উপজেলার আদিত্যবাড়িয়া এলাকার স্থানীয় দিনমজুর তরিফুল ইসলামের গোয়ালঘরের তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে আরও একটি ষাঁড়, একটি বকনা এবং একটি গাভীসহ মোট তিনটি গরু লুট করে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। এভাবে রাতের পর রাত গোয়ালঘর শূন্য হয়ে যাওয়ায় এলাকার গরিব ও প্রান্তিক খামারিরা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন এবং তাদের জীবিকা নির্বাহের পথ সম্পূর্ণ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
আরও পড়ুন: স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে হেলেন কেলার ইন্টারন্যাশনালের বৈঠক: তৃণমূল চক্ষুসেবায় গুরুত্ব
একাধিক গোয়ালঘরে পরপর সংঘটিত এই চাঞ্চল্যকর গরু চুরির সংবাদ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও থানা পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে বলে জানা গেছে। রায়গঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আহসানুজ্জামান এই বিষয়ে সংবাদ মাধ্যমকে জানান যে, গরু চুরির ঘটনার খবর পেয়ে আমরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। আমরা তদন্ত শুরু করেছি। চোর সনাক্ত ও গ্রেপ্তারে পুলিশী অভিযান চলছে। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, সংঘবদ্ধ এই চক্রটিকে খুঁজে বের করতে এবং লুট হওয়া গবাদিপশুগুলো উদ্ধার করতে মাঠপর্যায়ে গোয়েন্দা নজরদারি বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে পাঁচটি ভয়াবহ গরু চুরির আকস্মিক ঘটনায় পুরো সিরাজগঞ্জ জেলার তাড়াশ ও রায়গঞ্জ অঞ্চলের গ্রামগুলোতে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকার প্রতিটি খামারি ও কৃষক পরিবার এখন চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। চোরের দলের হাত থেকে নিজেদের শেষ সম্বলটুকু রক্ষা করার জন্য রাত জেগে পাহারা দেওয়ার বন্দোবস্ত করছেন সাধারণ মানুষ। কনকনে শীত বা বর্ষার তোয়াক্কা না করে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন খামারিরা। অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় না আনা হলে এই ধরনের অপরাধ আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা।
ঘটনার সার্বিক বিষয়ে তাড়াশ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইমাম জাফর অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে মন্তব্য করে জানিয়েছেন যে, পুলিশ চুরির বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছে। চুরি যাওয়া গরুগুলো উদ্ধার এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িত চোরচক্রের সদস্যদের শনাক্ত করতে অভিযান চলছে। স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করা হয়েছে যে, খুব দ্রুতই এই সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের মূল হোতাদের গ্রেপ্তার করে আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে। সাধারণ জনপদের মানুষের জানমাল ও গোসম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ প্রশাসনের এই জোরদার পদক্ষেপ কতখানি ফলপ্রসূ হয়, এখন সেটাই দেখার বিষয়। ক্ষতিগ্রস্ত খামারিরা তাদের হারিয়ে যাওয়া গরু ফিরে পাওয়ার জন্য এবং দোষীদের কঠোর শাস্তির দাবিতে ঊর্ধ্বতন প্রশাসনের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করছেন।
সূত্র: ভুক্তভোগী কৃষক ও থানা পুলিশ প্রশাসন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।