রায়গঞ্জ প্রতিনিধি / সিরাজগঞ্জ / দিগন্ত বাংলা নিউজ
সংসারের আর্থিক অনটন আর কঠোর বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করে অদম্য মেধার বলে অভাবকে জয় করে অনন্য এক সাফল্যের নজির স্থাপন করেছেন সিরাজগঞ্জ জেলার রায়গঞ্জ উপজেলার এক মেধাবী তরুণ। দিনমজুর পিতার সন্তান মো. রনি আহমেদ রাসেল সদ্য প্রকাশিত ৪৭তম বিসিএস পরীক্ষার ফলাফলে মর্যাদাপূর্ণ প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন। তার এই অভাবনীয় সাফল্যে কেবল তার পরিবার বা জন্মগ্রামই নয়, পুরো রায়গঞ্জ উপজেলাজুড়ে বইছে আনন্দের জোয়ার। প্রতিকূলতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানোর এই অনুপ্রেরণাদায়ক গল্প এখন সর্বত্র আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
জানা যায়, রনি আহমেদ রাসেলের পারিবারিক পটভূমি ছিল অত্যন্ত সংগ্রামের। তার বাবা মো. ফজলুল হক কঠোর পরিশ্রমী একজন দিনমজুর হিসেবে কাজ করে অত্যন্ত কষ্টে সংসার চালিয়েছেন এবং চারপাশ থেকে নানা সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে নিরলস সমর্থন যুগিয়েছেন। পাশাপাশি তার মা মোছা. আজমিয়ারা বেগমও বিভিন্ন প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে সন্তানদের আগলে রেখে মানুষের মতো মানুষ করার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। চরম আর্থিক সংকট ও টানাপোড়েনের মধ্যেও মা-বাবার অকৃত্রিম উৎসাহ এবং নিজের পড়াশোনার প্রতি প্রবল অনুরাগই রনিকে জীবনের প্রতিটি ধাপে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি জুগিয়েছে।
শিক্ষা জীবনের শুরু থেকেই অত্যন্ত মেধাবী ও মননশীল ছাত্র ছিলেন রনি। তিনি ২০১৫ সালে সিরাজগঞ্জের স্থানীয় ঝাপরা কাজিপুর আবদুল মান্নান উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে অত্যন্ত কৃতিত্বের সঙ্গে মাধ্যমিক বা এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। পরবর্তীতে উচ্চ শিক্ষার তাগিদে ভর্তি হন ঐতিহ্যবাহী সরকারি আজিজুল হক কলেজে, যেখান থেকে ২০১৭ সালে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক বা এইচএসসি পরীক্ষায় সফলতার সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। এরপর উচ্চতর শিক্ষার জন্য তিনি দেশের অন্যতম শীর্ষ বিদ্যাপীঠ বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহে ভর্তি হন এবং সেখান থেকে ভেটেরিনারি সায়েন্স অনুষদ অধীন ডক্টর অব ভেটেরিনারি মেডিসিন বা ডিভিএম ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন বিভাগ থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে মাস্টার্স ইন মেডিসিন ডিগ্রিও সম্পন্ন করেন।
শিক্ষাজীবন শেষ করার পর কর্মজীবনেও একের পর এক সাফল্যের স্বাক্ষর রেখে চলেছেন এই তরুণ। বিসিএসের চূড়ান্ত সাফল্যের আগে তিনি ব্যাংকিং খাতের মতো প্রতিযোগিতামূলক পেশায় নিজের অবস্থান শক্ত করেন। বর্তমানে তিনি জয়পুরহাট সদর উপজেলার হাটিল শাখায় স্বনামধন্য সোনালী ব্যাংক পিএলসির অফিসার বা জেনারেল হিসেবে অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। এর পাশাপাশি তিনি রাষ্ট্রায়ত্ত আরেক গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক পিএলসিতেও অফিসার বা ক্যাশ পদে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে নিজের পেশাগত উৎকর্ষের প্রমাণ দিয়েছেন। ব্যাংকিং পেশার পাশাপাশি বিসিএস ক্যাডার হওয়ার দীর্ঘদিনের স্বপ্ন বাস্তবায়নে তিনি নিয়মিত কঠোর পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন।
সর্বশেষ ৪৭তম বিসিএস পরীক্ষার চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশের পর মেধা তালিকায় ১০৭তম অবস্থানে থেকে প্রশাসন ক্যাডারে তার সুপারিশ পাওয়ার সুসংবাদ ছড়িয়ে পড়লে তার পৈতৃক নিবাস রায়গঞ্জ উপজেলার কাজিপুর গ্রামে উৎসবের আমেজ তৈরি হয়। স্বজন, শিক্ষক, বন্ধুবান্ধব এবং এলাকাবাসী তাকে ফুলেল শুভেচ্ছা ও উষ্ণ অভিনন্দনে সিক্ত করেন। রনির এই অসামান্য সাফল্য প্রমাণ করে যে, জন্ম বা পারিবারিক আর্থিক সীমাবদ্ধতা কখনো বড় কোনো বাধা হতে পারে না, যদি মানুষের ভেতরে থাকে দৃঢ় মনোবল, সৎ উদ্দেশ্য এবং কঠোর পরিশ্রম করার মানসিকতা। অদম্য এই তরুণের ভবিষ্যৎ পথচলা আরও মসৃণ ও গৌরবোজ্জ্বল হোক—এটাই এখন এলাকাবাসীর একমাত্র প্রত্যাশা।
এস.এইচ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।