ইউরোপের বৃহত্তম পারমাণবিক কেন্দ্রে ড্রোন হামলা: তীব্র উত্তেজনা

ইউরোপের বৃহত্তম পারমাণবিক কেন্দ্রে ড্রোন হামলা: তীব্র উত্তেজনা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ

ইউরোপের বৃহত্তম পারমাণবিক স্থাপনায় ড্রোন হামলা: বিশ্বজুড়ে চরম বিপর্যয় ও পারমাণবিক ঝুঁকির আশঙ্কা

বিশ্ব রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক সামরিক সংঘাতের ইতিহাসে পারমাণবিক স্থাপনাগুলোকে সবসময়ই সবচেয়ে সংবেদনশীল এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে চলমান দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের রেশ ধরে এবার এক অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং বিপজ্জনক ঘটনা সামনে এসেছে। রাশিয়ার সামরিক নিয়ন্ত্রণাধীন এবং ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত ইউরোপের বৃহত্তম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ‘জাপোরিঝিয়া’ (Zaporizhzhia Nuclear Power Plant)-এ একটি আত্মঘাতী ড্রোন আঘাত হেনেছে। জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক পারমাণবিক পর্যবেক্ষণ সংস্থা এই ভয়াবহ হামলার খবরটি নিশ্চিত করার পর থেকে মস্কো এবং কিয়েভের মধ্যে বিদ্যমান সামরিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনা এক নতুন এবং অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ মাত্রায় পৌঁছেছে। দক্ষিণ ইউক্রেনের চলমান তীব্র যুদ্ধক্ষেত্রের একেবারে কাছাকাছি এই বিশালাকার পারমাণবিক স্থাপনাটি অবস্থিত হওয়ায় এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিশ্বজুড়ে নতুন করে পারমাণবিক মহাবিপর্যয়ের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

টারবাইন ভবনে আঘাত ও আইএইএ-র উদ্বেগ

রোববার (৩১ মে) আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম 'টিআরটি ওয়ার্ল্ড'-এর প্রকাশিত একটি বিশেষ প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থা (আইএইএ - IAEA) এই ড্রোন হামলার বিষয়ে বিশ্ববাসীকে সতর্ক করেছে। আইএইএ-র পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, জাপোরিঝিয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বর্তমান রুশ পরিচালনা কর্তৃপক্ষ তাদের আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করেছে যে, শনিবার একটি অজ্ঞাত ড্রোন সরাসরি কেন্দ্রটির অন্যতম প্রধান টারবাইন ভবনের ওপর আছড়ে পড়ে। এই আকস্মিক ড্রোন বিস্ফোরণের তীব্রতায় টারবাইন ভবনের শক্ত কংক্রিটের দেয়ালে একটি বড় ধরনের গর্তের সৃষ্টি হয়েছে।

এই বিপজ্জনক পরিস্থিতির ওপর গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে আইএইএ-র মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি এক বিবৃতিতে উভয় পক্ষকে সংযত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি অত্যন্ত কঠোর ভাষায় বিশ্বনেতৃত্বকে সতর্ক করে বলেন, “যেকোনো পরিস্থিতিতেই হোক না কেন, পারমাণবিক স্থাপনা থেকে বা এর বিরুদ্ধে কোনো ধরনের সামরিক হামলা চালানো মোটেও উচিত নয়। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে এই ধরনের সামরিক হামলা করা আসলে সরাসরি আগুন নিয়ে খেলার শামিল।” তিনি মনে করেন, এই ধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীন পদক্ষেপ যেকোনো মুহূর্তে চেরনোবিল বা ফুকুশিমার চেয়েও বড় কোনো বৈশ্বিক মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

মস্কোর দাবি: কিয়েভের ফাইবার-অপটিক ড্রোন হামলা

জাপোরিঝিয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের এই স্পর্শকাতর হামলার পর রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক শক্তি প্রতিষ্ঠান ‘রোসাটম’ (Rosatom) অত্যন্ত জোরালোভাবে দাবি করেছে যে, এটি ইউক্রেনীয় বাহিনীর একটি সুপরিকল্পিত এবং ইচ্ছাকৃত হামলা ছিল। রোসাটমের কারিগরি বিশেষজ্ঞদের প্রাথমিক তদন্তের ওপর ভিত্তি করে দাবি করা হয়েছে, হামলায় ব্যবহৃত ড্রোনটি কোনো সাধারণ রেডিও তরঙ্গে চালিত ছিল না, বরং এটি অত্যন্ত আধুনিক ও নিখুঁত 'ফাইবার-অপটিক কেবল' (Fiber-optic cable) প্রযুক্তির মাধ্যমে দূর থেকে সরাসরি নিয়ন্ত্রিত হয়েছিল। এই ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহারের মূল উদ্দেশ্যই থাকে ইলেকট্রনিক জ্যামিং বা প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা এড়িয়ে নিখুঁতভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা।

আরও পড়ুন: কানাডায় ফুটবল বিশ্বকাপের জোয়ার: প্রস্তুত টরন্টো ও ভ্যাঙ্কুভার

কানাডায় ফুটবল বিশ্বকাপের জোয়ার: প্রস্তুত টরন্টো ও ভ্যাঙ্কুভার

রোসাটমের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আলেক্সেই লিকাচেভ রুশ জাতীয় গণমাধ্যমের সামনে এই ঘটনার ভয়াবহতা তুলে ধরে এক মারাত্মক হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। তিনি বলেন, “আজকের এই সুনির্দিষ্ট হামলার মধ্য দিয়ে আমরা এমন একটি পারমাণবিক বা পরিবেশগত দুর্ঘটনার আরও এক ধাপ কাছাকাছি পৌঁছে গেছি, যার দীর্ঘমেয়াদী এবং ক্ষতিকারক প্রভাব শুধু রাশিয়া ও ইউক্রেনের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা ইউরোপসহ আরও দূরের বহু দেশকে চিরতরে স্পর্শ করতে পারে।” তবে রোসাটম একই সাথে বিশ্ববাসীকে কিছুটা আশ্বস্ত করে জানিয়েছে যে, হামলায় যন্ত্রকক্ষের দেয়ালে বড় ধরনের ফাটল বা গর্তের সৃষ্টি হলেও সৌভাগ্যবশত পারমাণবিক কেন্দ্রের মূল চুল্লি বা কোনো গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা যন্ত্রপাতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, যার ফলে তাৎক্ষণিক বিকিরণের কোনো ঘটনা ঘটেনি।

কিয়েভের কঠোর প্রত্যাখ্যান ও ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ

রাশিয়ার এই গুরুতর এবং আন্তর্জাতিক স্তরের অভিযোগকে সম্পূর্ণ অযৌক্তিক, ভিত্তিহীন এবং সস্তা প্রচারণা বলে অনতিবিলম্বে উড়িয়ে দিয়েছে ইউক্রেন সরকার। ইউক্রেনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জারি করা একটি বিশেষ আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে রাশিয়ার এই দাবিকে সম্পূর্ণ নাকচ করে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে। ইউক্রেনীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “ইউক্রেন কেন নিজের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ভূখণ্ডে অবস্থিত এবং যে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি সে নিজে আন্তর্জাতিক আইন মেনে পুনরায় নিজের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে আনার জন্য দিনরাত আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে, সেখানে এই ধরনের আত্মঘাতী ও আত্মবিধ্বংসী হামলা চালাবে? এই ধরনের অবাস্তব অভিযোগ কোনোভাবেই বোধগম্য বা যৌক্তিক নয়।” কিয়েভের পক্ষ থেকে পাল্টা দাবি করা হয়েছে যে, রাশিয়া নিজেই কেন্দ্রটিতে সামরিক সরঞ্জাম লুকিয়ে রেখে বিশ্বকে ব্ল্যাকমেইল করার জন্য এই ধরনের সাজানো নাটকের অবতারণা করছে।

উলেখ্য যে, ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর একেবারে প্রাথমিক দিনগুলোতেই রুশ সশস্ত্র বাহিনী এই কৌশলগত এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জাপোরিঝিয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটির চারপাশ অবরুদ্ধ করে এর সম্পূর্ণ প্রশাসনিক ও সামরিক নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নেয়। সেই সময় থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত বিগত চার বছরে উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক মঞ্চে একাধিকবার পারমাণবিক বিপর্যয়ের ঝুঁকি তৈরি করার এবং আন্তর্জাতিক নিয়ম লঙ্ঘন করার মারাত্মক সব অভিযোগ এনেছে। এর আগেও, গত এপ্রিল মাসে রাশিয়া-নিয়ন্ত্রিত জাপোরিঝিয়া অঞ্চলের স্থানীয় প্রশাসন ইউক্রেনীয় ড্রোন ও আর্টিলারি হামলার একটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তুলেছিল, যে ঘটনার সময় কেন্দ্রটির একজন নিরপরাধ পরিবহনকর্মী নিহত হয়েছিলেন।

দিগন্ত বাংলা নিউজের বিশেষ পর্যবেক্ষণ

জাপোরিঝিয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দেয়ালে লাগা এই ড্রোন আঘাতের দাগ আসলে পুরো বিশ্ববাসীর নিরাপত্তার ওপর একটি বড় ধরনের চপেটাঘাত। পারমাণবিক শক্তি মানবজাতির কল্যাণে ব্যবহৃত হলেও যুদ্ধের ময়দানে এটি যে কত বড় বৈশ্বিক হুমকি হয়ে উঠতে পারে, এই ঘটনাটি তারই জীবন্ত প্রমাণ। যদি কোনো কারণে ড্রোনটি টারবাইন ভবনের দেয়াল ভেদ করে মূল পারমাণবিক চুল্লি (Reactor Core) বা শীতলীকরণ ব্যবস্থাকে (Cooling System) ক্ষতিগ্রস্ত করতে সক্ষম হতো, তবে তা থেকে নির্গত তেজস্ক্রিয়তা মুহূর্তের মধ্যে সমগ্র ইউরোপ মহাদেশের বাতাসকে বিষাক্ত করে তুলতে পারত।

আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধ এখন এমন এক বিপজ্জনক সমীকরণে এসে দাঁড়িয়েছে যেখানে কোনো পক্ষই আন্তর্জাতিক পারমাণবিক আইন বা মানবিক বিধিনিষেধের তোয়াক্কা করছে না। এই পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের আইএইএ-র মতো সংস্থাকে কেবল মৌখিক উদ্বেগ প্রকাশ করার গণ্ডি পেরিয়ে সরাসরি সেখানে একটি স্থায়ী ও শক্তিশালী আন্তর্জাতিক বেসামরিক ও সামরিক নিরপেক্ষ জোন (Demilitarized Zone) প্রতিষ্ঠার জন্য বিশ্বনেতাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে হবে। তা না হলে, আজ যে ড্রোনটি কেবল দেয়ালে গর্ত করে ক্ষান্ত হয়েছে, আগামীকাল তা পুরো পৃথিবীর জন্য এক অপূরণীয় ও অন্ধকার অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে।

‘দিগন্ত বাংলা নিউজ’ এই আন্তর্জাতিক পরমাণু সংকটের প্রতিটি মুহূর্তের খবর অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পর্যবেক্ষণ করছে। জাপোরিঝিয়া প্ল্যান্টের ভেতরের বর্তমান তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা কেমন রয়েছে এবং এই ঘটনার পর জাতিসংঘ বা পশ্চিমা বিশ্ব রাশিয়ার এই দাবির প্রেক্ষিতে কী ধরনের কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে, তার প্রতিটি বিশ্বাসযোগ্য তথ্য সবার আগে আপনাদের সামনে তুলে ধরতে আমাদের বিশেষ আন্তর্জাতিক উইং নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। সত্য, বস্তুনিষ্ঠ এবং বৈশ্বিক রাজনীতির প্রতিটি ভেতরের খবর পেতে সবসময় আমাদের নিউজ পোর্টালের সাথেই থাকুন।

 

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন