জাতীয় ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ
আদালতের বাইরে আসামির বক্তব্য প্রচার ও কথা বলায় কঠোর নিষেধাজ্ঞা
বিচারিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ এবং জনমত প্রভাবিত হওয়া রোধ করার লক্ষ্যে এক গুরুত্বপূর্ণ আইনি নির্দেশনা প্রদান করেছেন আদালত। মঙ্গলবার (০২ জুন, ২০২৬) ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের প্রেক্ষিতে নির্দেশ দিয়েছেন যে, পুলিশ হেফাজতে থাকা অবস্থায় কোনো আসামি আদালতের বাইরে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতে পারবেন না এবং তার কোনো বক্তব্য প্রচার করা যাবে না।
আদালতের নির্দেশনার প্রেক্ষাপট
রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে ৮ বছরের শিশু রামিসা ধর্ষণ ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের চাঞ্চল্যকর মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ শুরুর প্রাক্কালে এই নির্দেশনা আসে। মামলা পরিচালনাকারী বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু আদালতে আবেদনটি করেন। তিনি আদালতকে অবহিত করেন যে, আইন অনুযায়ী বিচারকের এজলাসের বাইরে পুলিশ হেফাজতে থাকাকালীন একজন আসামির কোনো ধরনের বক্তব্য দেওয়ার আইনি এখতিয়ার নেই।
আরও পড়ুন: বিএনপি এলেই চক্রান্ত শুরু হয়: দুলু
আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু তার আবেদনে বলেন:
উচ্চ আদালতের সুস্পষ্ট নির্দেশনা অনুযায়ী পুলিশি হেফাজতে থাকা বা দণ্ডিত আসামিদের বক্তব্য মিডিয়ায় প্রচার করা বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত ও রাষ্ট্রীয় সংস্থার নিয়ম অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা রক্ষা, জনমত প্রভাবিত হওয়া রোধ এবং জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থেই এই বিধিনিষেধ আরোপ করা জরুরি।
ভবিষ্যতে যেন পুলিশ হেফাজতে থাকা অবস্থায় কোনো আসামি প্রকাশ্যে এ ধরনের বক্তব্য না দিতে পারে, সে বিষয়ে পুলিশকে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে।
আদালত রাষ্ট্রপক্ষের এই যৌক্তিক আবেদন মঞ্জুর করেছেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কঠোরভাবে নির্দেশনা পালনের আদেশ দিয়েছেন।
সাক্ষ্যগ্রহণের প্রথম দিন
মঙ্গলবার সকাল ১০টা ৩৫ মিনিটে ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্যগ্রহণের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হয়। মামলার প্রথম দিনের সাক্ষ্যপ্রক্রিয়া যেভাবে সম্পন্ন হয়েছে:
মামলার বাদী ও ভিকটিমের বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লার জবানবন্দির মাধ্যমে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়।
এরপর ভিকটিমের মা পারভীন আক্তার আদালতে সাক্ষ্য প্রদান করেন।
আসামিপক্ষের আইনজীবী মূসা কলিমউল্লাহ জেরা সম্পন্ন করেন।
পরবর্তীতে, ক্যামেরা ট্রায়ালের মাধ্যমে রামিসার বড় বোনের সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, এই মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে মোট ১৭ জন সাক্ষী রয়েছেন। পর্যায়ক্রমে ম্যাজিস্ট্রেট, চিকিৎসক, আলামত সংগ্রহকারী কর্মকর্তা এবং স্থানীয় প্রতিবেশীরা আদালতে সাক্ষ্য দেবেন।
আসামিদের কারাগার থেকে উপস্থিতি
মঙ্গলবার সকাল পৌনে ৯টায় কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে প্রধান আসামি সোহেল রানাকে ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগার (কেরানীগঞ্জ) থেকে এবং তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে কাশিমপুর কারাগার থেকে আদালতে আনা হয়। তাদের প্রথমে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের হাজতখানায় রাখা হয় এবং সাক্ষ্যগ্রহণ চলাকালে এজলাসে হাজির করা হয়। সোমবার (০১ জুন) আদালত এই দুই আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ প্রদান করেছিলেন।
ঘটনার নৃশংস পটভূমি
গত ১৯ মে সকালে পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী রামিসা নিখোঁজ হওয়ার পর তার পরিবারের সদস্যরা তাকে খুঁজতে থাকেন। এক পর্যায়ে আসামিদের ফ্ল্যাটের সামনে শিশুটির জুতা দেখতে পেয়ে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করলে শয়নকক্ষের মেঝেতে মস্তকবিহীন দেহ এবং বাথরুমে একটি বালতির ভেতর কাটা মাথা উদ্ধার করা হয়। জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ কলের মাধ্যমে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে স্বপ্নাকে গ্রেপ্তার করে এবং পরে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় সোহেল রানাকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২০ মে ভুক্তভোগীর বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় মামলাটি দায়ের করেন। ২৪ মে পল্লবী থানার উপ-পরিদর্শক অহিদুজ্জামান অভিযোগপত্র জমা দেন, যা আদালত আমলে নিয়েছেন।
দিগন্ত বাংলা নিউজের পর্যবেক্ষণ
বিচার ব্যবস্থার পবিত্রতা রক্ষায় আদালতের এই নির্দেশনা একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। আসামিরা অনেক সময় মিডিয়াকে ব্যবহার করে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে জনমতকে প্রভাবিত করার অপচেষ্টা চালায়। আদালতের এই নির্দেশনার ফলে বিচার প্রক্রিয়া অধিকতর স্বচ্ছ হবে এবং অপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হওয়ার সুযোগ কমবে। আমরা প্রত্যাশা করি, রামিসা হত্যাকাণ্ডের মতো ন্যাক্কারজনক ঘটনায় দ্রুততম সময়ের মধ্যে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে। মামলার পরবর্তী শুনানি ও সাক্ষ্যগ্রহণের আপডেট পেতে আমাদের পোর্টালে চোখ রাখুন।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।