নিরাপদ থাকতে চাইলে অঞ্চল ছাড়ো, যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের কঠোর হুঁশিয়ারি

নিরাপদ থাকতে চাইলে অঞ্চল ছাড়ো, যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের কঠোর হুঁশিয়ারি
ছবি: সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ

‘নিরাপদ থাকতে চাইলে অঞ্চল ছাড়ো’: দক্ষিণ ইরানে মার্কিন হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রকে চরম হুঁশিয়ারি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি ও সামরিক উত্তেজনা এখন চরম অগ্নিগর্ভ রূপ ধারণ করেছে। দক্ষিণ ইরানের একাধিক কৌশলগত এলাকায় মার্কিন সামরিক বাহিনীর আকস্মিক বিমান হামলার পর এবার ওয়াশিংটনকে সরাসরি ও নজিরবিহীন ভাষায় কঠোর হুঁশিয়ারি বার্তা দিয়েছে ইরান। দেশটির প্রভাবশালী পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি অত্যন্ত কড়া ভাষায় মার্কিন প্রশাসনকে সতর্ক করে বলেছেন, ইরানের সার্বভৌমত্ব, ভূখণ্ড কিংবা জাতীয় নিরাপত্তার বিরুদ্ধে যেকোনো ধরনের সামরিক আগ্রাসন বা হুমকি কখনোই জবাবহীন ছেড়ে দেওয়া হবে না। ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরানের শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনী যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় এবং শত্রুর আঘাতের মোক্ষম ও প্রয়োজনীয় প্রতিক্রিয়া জানাতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে।

আজ বুধবার (১০ জুন, ২০২৬) ভোরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও বিস্ফোরক পোস্টে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এই কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। আরাগচির এই মন্তব্যের পর পারস্য উপসাগর এবং হরমুজ প্রণালি সংলগ্ন আন্তর্জাতিক জলসীমায় মার্কিন ও ইরানি বাহিনীর মধ্যে একটি পুরোদস্তুর সামরিক সংঘাত শুরু হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করছেন আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা।

যুদ্ধক্ষেত্রে পরাজয়ের পর ইরানের দৃঢ়তা পরীক্ষা করছে আমেরিকা: আরাগচি

টুইটার বা এক্স পোস্টে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সামরিক নীতি ও মধ্যপ্রাচ্যে তাদের ব্যর্থতার তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি তাঁর পোস্টে উল্লেখ করেন, "বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক যুদ্ধক্ষেত্রে একের পর এক কৌশলগত পরাজয়ের শিকার হওয়ার পর, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন ইরানের জাতীয় দৃঢ়তা ও প্রতিরোধ ক্ষমতা পরীক্ষা করার একটি ব্যর্থ ও বোকাটে চেষ্টা চালাচ্ছে।"

আরও পড়ুন: সালমান শাহের লাশ কবর থেকে তোলার নির্দেশ, ৩০ বছর পর ময়নাতদন্ত

সালমান শাহের লাশ কবর থেকে তোলার নির্দেশ, ৩০ বছর পর ময়নাতদন্ত

তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় মার্কিন নীতিনির্ধারকদের জানিয়ে দেন যে, ইরান এমন কোনো রাষ্ট্র নয় যারা বাইরের কোনো দেশের চাপ, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা কিংবা আকাশপথের সামরিক হুমকির কাছে নতি স্বীকার করবে বা নিজেদের সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে যাবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো ধরনের উসকানির বিরুদ্ধে ইরানের প্রতিরোধ আরও বেশি তীব্র হবে।

‘নিরাপদ থাকতে চাইলে এই অঞ্চল ছেড়ে চলে যেতে হবে’

ইরানের শীর্ষ এই কূটনীতিক মার্কিন সামরিক বাহিনীকে সরাসরি উদ্দেশ্য করে এক চরম সময়সীমা বা সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেছেন। তিনি বলেন, “আমাদের শক্তিশালী ও আধুনিক প্রযুক্তি সুসজ্জিত সশস্ত্র বাহিনী দেশের সীমানা রক্ষায় সদা জাগ্রত। যেকোনো দিক থেকে আসা হামলার দাঁতভাঙা জবাব দিতে তারা সামান্যতম দ্বিধা করবে না।”

একই সঙ্গে তিনি ওয়াশিংটনের উদ্দেশ্যে কড়া বার্তা দিয়ে বলেন, "আমেরিকান সেনারা যদি সত্যিই নিজেদের জীবন রক্ষা করতে চায় এবং নিরাপদ থাকতে চায়, তবে তাদের জন্য সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ হবে অবিলম্বে এই মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল ছেড়ে চিরতরে চলে যাওয়া।" আরাগচি আরও মন্তব্য করেন যে, পারস্য উপসাগরের দীর্ঘ ও প্রাচীন ইতিহাসে বহিরাগত বা পশ্চিমা কোনো সামরিক উপস্থিতির ইতিবাচক কোনো ফলাফল আসেনি, বরং তাদের উপস্থিতির কারণে এই অঞ্চলে অতীতে বহু নেতিবাচক ও ধ্বংসাত্মক পরিণতি সৃষ্টি হওয়ার উদাহরণ রয়েছে।

মার্কিন-ইরান চলমান সামরিক উত্তেজনার মূল প্রেক্ষাপট:

ঘটনার বিবরণ ও স্থানদাবিদার পক্ষপ্রকৃত বা সম্ভাব্য কারণবর্তমান পরিস্থিতি
দক্ষিণ ইরানে মার্কিন বিমান হামলাইরান ও মার্কিন সেন্টকমকেশম দ্বীপ, জাস্ক ও সিরিক এলাকায় আক্রমণসর্বোচ্চ যুদ্ধ সতর্কতা
অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ধ্বংসমার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পইরান কর্তৃক হরমুজ প্রণালিতে ভূপাতিত করার দাবিইরান কর্তৃক অভিযোগ অস্বীকার
ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এক্স পোস্টপররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিযুক্তরাষ্ট্রকে মধ্যপ্রাচ্য ছাড়ার আলটিমেটামকূটনৈতিক চ্যানেল বন্ধের মুখে

দক্ষিণ ইরানের হরমোজগান প্রদেশে মার্কিন বিমান হামলার বিস্তারিত

এর আগে আজ বুধবার ভোরের দিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম এবং বিভিন্ন স্থানীয় সংবাদ সংস্থার পক্ষ থেকে জানানো হয় যে, দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত হরমোজগান (Hormozgan) প্রদেশের কয়েকটি এলাকায় আকস্মিকভাবে মার্কিন যুদ্ধবিমান ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে।

ইরানি গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, পারস্য উপসাগরের প্রবেশদ্বারে অবস্থিত কৌশলগত কেশম দ্বীপ (Qeshm Island), জাস্ক (Jask) এবং সিরিক (Sirik) এলাকার বেশ কয়েকটি সামরিক ও রাডার স্থাপনাই ছিল এই মার্কিন বিমান হামলার প্রধান লক্ষ্যবস্তু। মার্কিন সামরিক বাহিনীর এই আকস্মিক বোমাবর্ষণের ফলে ওই সমস্ত এলাকায় কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বা কোনো প্রাণহানি ঘটেছে কিনা, তা ইরানের সামরিক কমান্ডের পক্ষ থেকে এখনও বিস্তারিতভাবে প্রকাশ করা হয়নি। তবে এই হামলাকে ইরানের ভূখণ্ডের ওপর সরাসরি মার্কিন আগ্রাসন হিসেবে দেখছে তেহরান।

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)-এর পাল্টা দাবি

অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েনকৃত মার্কিন সামরিক বাহিনীর অফিশিয়াল শাখা তথা মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে ইরানের বিরুদ্ধে এই সামরিক অভিযান শুরুর কথা স্বীকার করেছে। সেন্টকমের দাবি অনুযায়ী, ওমান উপকূলের কাছে আন্তর্জাতিক জলসীমায় একটি মার্কিন অত্যাধুনিক ‘অ্যাপাচি’ (Apache) সামরিক হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনার প্রতিশোধ নিতেই তারা ইরানের এই সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুগুলোর বিরুদ্ধে সামরিক অপারেশন বা বিমান হামলা শুরু করতে বাধ্য হয়েছে।

সেন্টকমের এই বিবৃতির ঠিক এক দিন আগে খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump) হোয়াইট হাউসে দাঁড়িয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন যে, বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রধান রুট হরমুজ প্রণালির (Strait of Hormuz) কাছে উড্ডয়নরত একটি মার্কিন অ্যাপাচি হেলিকপ্টারকে ইরানি সামরিক বাহিনী অত্যন্ত অন্যায়ভাবে ভূপাতিত করেছে। ট্রাম্প অত্যন্ত কঠোর ভাষায় বলেছিলেন, "আমেরিকান সামরিক সম্পদের ওপর এই ধরনের কাপুরুষোচিত হামলার উপযুক্ত ও শক্ত জবাব দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা ও সম্মানের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ছিল।"

হেলিকপ্টার ভূপাতিতের দাবি সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করল তেহরান

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং সেন্টকমের এই গুরুতর অভিযোগকে সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে এক বাক্যে উড়িয়ে দিয়েছে ইরানের সামরিক ও সরকারি শীর্ষ কর্মকর্তারা। তেহরানের পক্ষ থেকে অফিশিয়ালি জানানো হয়েছে যে, ওমান উপকূল বা হরমুজ প্রণালিতে কোনো ধরনের মার্কিন হেলিকপ্টার বা বিমান ভূপাতিত করার ঘটনার সাথে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী বা বিপ্লবী গার্ড কর্পসের (IRGC) কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা বা সংযোগ নেই।

ইরানি সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, মার্কিন হেলিকপ্টারটি হয়তো তাদের নিজস্ব কোনো অভ্যন্তরীণ কারিগরি ত্রুটি বা যান্ত্রিক গোলযোগের কারণে সাগরে ভেঙে পড়েছে, কিন্তু মার্কিন প্রশাসন এখন ইরানের ওপর দোষ চাপিয়ে এই অঞ্চলে একটি নতুন যুদ্ধের দামামা বাজানোর অজুহাত খুঁজছে। একই সঙ্গে তারা পুনরায় ওয়াশিংটনকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, এই মিথ্যা অজুহাতে ইরানের ওপর আর কোনো আগ্রাসন চালানো হলে তার ফলাফল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য মোটেও সুখকর হবে না।

বিদেশি বাহিনীর উপস্থিতিই মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের মূল কারণ

পরিস্থিতি আরও বেশি অনিয়ন্ত্রিত বা উত্তপ্ত হওয়ার আগেই আব্বাস আরাগচি এর আগেও একাধিকবার আন্তর্জাতিক মহলে বিদেশি সামরিক বাহিনীর উসকানিমূলক আচরণের বিরুদ্ধে কথা বলেছিলেন। তিনি এর আগে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেছিলেন, "ইরানের আকাশসীমা, স্থলভাগ কিংবা জলসীমা লঙ্ঘনের যেকোনো ধরনের ধৃষ্টতা বা অপচেষ্টা অত্যন্ত কঠোর ও নির্মমভাবে মোকাবিলা করা হবে।"

তাঁর মতে, মধ্যপ্রাচ্যের তেল সমৃদ্ধ এই অঞ্চলে আমেরিকার মতো সাম্রাজ্যবাদী বিদেশি সামরিক বাহিনীর অবৈধ উপস্থিতিই মূলত এখানকার শান্তি বিনষ্ট করছে এবং তারা নিজেদের ভুল সিদ্ধান্তের কারণে পুরো অঞ্চলকে একটি বড় ধরনের সংঘাতের ঝুঁকিতে ফেলে দিচ্ছে। তাই পারস্য উপসাগরে দীর্ঘমেয়াদী শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে এবং অপ্রয়োজনীয় সামরিক উত্তেজনা কমাতে সবচেয়ে বড় ও একমাত্র উপায় হলো এই অঞ্চল থেকে মার্কিন ও তাদের মিত্র বিদেশি বাহিনীদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিজেদের পাততাড়ি গুটিয়ে নেওয়া। মধ্যপ্রাচ্যের এই রোমাঞ্চকর ও যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির প্রতি মুহূর্তের ব্রেকিং নিউজ এবং নির্ভরযোগ্য আন্তর্জাতিক আপডেট সবার আগে জানতে নিয়মিত চোখ রাখুন দিগন্ত বাংলা নিউজ পোর্টালে।

 

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন