আন্তর্জাতিক ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ
এশিয়ার দ্বিতীয় শীর্ষ ধনী এখন টিকটক প্রতিষ্ঠাতা ঝ্যাং ইমিং: পেছনে ফেললেন আম্বানিকে
বিশ্বের প্রযুক্তি ও সম্পদ তালিকার সমীকরণে এল এক নাটকীয় পরিবর্তন। শর্ট-ভিডিও প্ল্যাটফর্ম টিকটকের মূল প্রতিষ্ঠান ‘বাইটড্যান্স’-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ঝ্যাং ইমিং এখন এশিয়ার দ্বিতীয় শীর্ষ ধনী ব্যক্তি। ব্লুমবার্গ বিলিয়নিয়ার্স সূচকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, তিনি ভারতের শিল্পপতি মুকেশ আম্বানিকে টপকে এই নতুন মাইলফলক স্পর্শ করেছেন। দীর্ঘ সময় ধরে এশিয়ার ধনকুবেরদের তালিকায় দাপটের সাথে থাকা মুকেশ আম্বানিকে সরিয়ে ঝ্যাং ইমিংয়ের এই উত্থান প্রযুক্তি বিশ্বে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সম্পদের পাহাড় গড়ার নেপথ্য কাহিনী
ব্লুমবার্গের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, ঝ্যাং ইমিংয়ের ব্যক্তিগত সম্পদের পরিমাণ এখন প্রায় ৯২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার। ২০১৯ সালের মার্চ মাসে যখন ব্লুমবার্গ প্রথমবারের মতো তার সম্পদের হিসাব শুরু করেছিল, তখন তার সম্পদের পরিমাণ ছিল মাত্র ১৩ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ, মাত্র সাত বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ বেড়েছে সাত গুণেরও বেশি। প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, বাইটড্যান্সের বৈশ্বিক ব্যবসা সম্প্রসারণ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) খাতের অভাবনীয় সাফল্যই তার সম্পদের এই উল্লম্ফনের প্রধান কারণ।
বাইটড্যান্সের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি
ঝ্যাং ইমিংয়ের এই অভাবনীয় সাফল্যের পেছনে দুটি প্রধান দিক কাজ করেছে: ১. টিকটকের বিশ্বব্যাপী জয়জয়কার: টিকটক বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় স্বল্পদৈর্ঘ্যের ভিডিও শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম। আন্তর্জাতিক বাজারে এর জনপ্রিয়তা কোনোভাবেই কমছে না,
আরও পড়ুন: বিদ্যুতের দাম বাড়ল: গ্রাহক পর্যায়ে নতুন দর তালিকা প্রকাশ
বরং নতুন নতুন দেশ ও অঞ্চলে এটি তরুণ প্রজন্মের কাছে অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। ২. কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় আধিপত্য: বাইটড্যান্সের এআই-চালিত চ্যাটবট ‘দৌবাও’ (Doubao) চীনের বাজারে একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার করেছে। বর্তমানে এর মাসিক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৩০ কোটিরও বেশি। এটি এখন চীনের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও ব্যবহৃত এআই চ্যাটবট হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
মুকেশ আম্বানি ও গৌতম আদানির বর্তমান অবস্থান
ঝ্যাং ইমিংয়ের এই অগ্রগতির ফলে মুকেশ আম্বানি বর্তমানে এশিয়ার তৃতীয় শীর্ষ ধনীতে পরিণত হয়েছেন। ব্লুমবার্গের হিসাব অনুযায়ী তার বর্তমান সম্পদের পরিমাণ ৮৬ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার। তবে এশিয়ার শীর্ষ ধনীর আসনটি এখনও দখলে রেখেছেন ভারতের আরেক শিল্পপতি গৌতম আদানি। তার সম্পদের পরিমাণ ১১৭ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। এর মাধ্যমে এশিয়ার শীর্ষ তিনটি ধনী স্থানের দুটিতেই ভারতীয় শিল্পপতিদের উপস্থিতি বজায় থাকলেও, দ্বিতীয় স্থানে চীনের প্রযুক্তি জগতের এই জাদুকরের প্রবেশ একটি নতুন মেরুকরণ তৈরি করেছে।
এআই খাতে বড় বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা
বাইটড্যান্স কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই সীমাবদ্ধ থাকতে চায় না। নিজেদের ভবিষ্যৎ শক্ত করার জন্য তারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে বিপুল বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছে। প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ২০২৬ সালে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের বিষয়ে আলোচনা করছে, যা তাদের প্রযুক্তিগত উৎকর্ষকে আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে নেবে। এই বিনিয়োগ মূলত এআই প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং বিশ্ববাজারে তাদের প্রভাব আরও সুসংহত করার লক্ষ্যে করা হচ্ছে।
ব্লুমবার্গ বনাম ফোর্বস: তালিকার ভিন্নতা
বিশ্বের ধনকুবেরদের মূল্যায়নে ব্লুমবার্গ এবং ফোর্বসের তালিকায় প্রায়ই কিছুটা পার্থক্য দেখা যায়। ব্লুমবার্গের তথ্যে ঝ্যাং ইমিং দ্বিতীয় স্থানে থাকলেও, ফোর্বসের রিয়েল-টাইম বিলিয়নিয়ার্স তালিকায় মুকেশ আম্বানি ৮৯ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার নিয়ে এখনও এশিয়ার শীর্ষ ধনী হিসেবে গণ্য হচ্ছেন। ফোর্বসের তালিকায় গৌতম আদানি ৮৬ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার নিয়ে দ্বিতীয় এবং ঝ্যাং ইমিং ৬৯ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার নিয়ে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছেন। মূলত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের মূল্যায়ন এবং গণনার পদ্ধতির পার্থক্যের কারণে এই তারতম্য তৈরি হয়।
বিশ্বের প্রেক্ষাপট ও শীর্ষ ধনী নারী
বিশ্বের সামগ্রিক ধনী তালিকায় এখনও অপ্রতিদ্বন্দ্বী ইলন মাস্ক। তার বর্তমান সম্পদের পরিমাণ ৮২৬ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার। এরপরই রয়েছেন ল্যারি এলিসন (২৯৬ বিলিয়ন ডলার) এবং ল্যারি পেজ (২৯৫ বিলিয়ন ডলার)। এছাড়া, বিশ্বের সবচেয়ে ধনী নারী হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছেন খুচরা বিক্রয় প্রতিষ্ঠান ওয়ালমার্টের উত্তরাধিকারী অ্যালিস ওয়ালটন। তার বর্তমান সম্পদের পরিমাণ ১২০ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার এবং বৈশ্বিক তালিকায় তিনি ১৬তম স্থানে রয়েছেন।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
ঝ্যাং ইমিংয়ের এই উত্থান প্রমাণ করে যে, বর্তমানে ইন্টারনেট ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠানগুলোর বাজারমূল্য যেকোনো প্রথাগত শিল্প প্রতিষ্ঠানের চেয়ে দ্রুত হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাইটড্যান্সের মতো একটি তরুণ প্রতিষ্ঠান যে গতিতে এআই প্রযুক্তি এবং সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ করছে, তা আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বিশ্ব অর্থনীতির মোড় পুরোপুরি ঘুরিয়ে দিতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, যদি বাইটড্যান্স আইপিও (IPO) বাজারে আসে, তবে ঝ্যাং ইমিংয়ের সম্পদ আরও কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেতে পারে।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।