নিজস্ব প্রতিবেদন / শাহজাদপুর, সিরাজগঞ্জ / দিগন্ত বাংলা নিউজ
দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরকারিভাবে বরাদ্দকৃত ত্রাণসামগ্রী ও জরুরি খাদ্যসহায়তা আত্মসাৎ করার নানা অনিয়ম এবং দুর্নীতির ঘটনা প্রায়ই সাধারণ মানুষের মাঝে গভীর ক্ষোভের সৃষ্টি করে। বিশেষ করে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত ও অসহায় দুস্থ মানুষের মুখের গ্রাস কেড়ে নেওয়ার মতো ন্যক্কারজনক কর্মকাণ্ড সমাজকে চরমভাবে কলুষিত করছে। সম্প্রতি সিরাজগঞ্জ জেলার চৌহালী উপজেলায় এমনই একটি অত্যন্ত গুরুতর ও চাঞ্চল্যকর ঘটনা সংঘটিত হয়েছে, যেখানে হতদরিদ্র মানুষের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে বরাদ্দকৃত চালের একটি বড় অংশ কালোবাজারে গোপনে বিক্রি করে দেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেছে। এই অনিয়ম ও দুর্নীতির খবর প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে স্থানীয় প্রশাসনিক মহলে এবং সচেতন জনসাধারণের মাঝে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়েছে।
আরও পড়ুন: জাতিসংঘে মানবিক সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রাতরাশ বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী
উপজেলা প্রশাসনের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা শাখা সূত্রে প্রাপ্ত সুনির্দিষ্ট তথ্যানুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চৌহালী উপজেলার অধীনস্থ মোট সাতটি ইউনিয়নে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত ও অসহায় মানুষের মাঝে বিতরণের জন্য সর্বমোট আটান্ন মেট্রিক টন সরকারি চাল বরাদ্দ প্রদান করা হয়েছিল। এর মধ্যে চৌহালীর বাঘুটিয়া ইউনিয়নের জন্য সুনির্দিষ্টভাবে আঠারো মেট্রিক টন বা সর্বমোট ছয়শ বস্তা চাল বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। নিয়মানুযায়ী এই চালগুলো প্রতি বস্তায় ত্রিশ কেজি করে নিবন্ধিত ও প্রকৃত উপকারভোগী দুস্থ মানুষের মাঝে স্বচ্ছতার সঙ্গে পর্যায়ক্রমে বিতরণের কথা ছিল। কিন্তু বরাদ্দের এই বিশাল চালের চালান সঠিকভাবে বিতরণ না করে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের মাধ্যমে নয়ছয় করার অপচেষ্টা চালানো হয়।
বাঘুটিয়া ইউনিয়নের জন্য বরাদ্দকৃত এই সমস্ত সরকারি চাল ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান মো. সাইদুর রহমানের নিকট সুনির্দিষ্ট নিয়মে হস্তান্তর করা হয়েছিল। কিন্তু চালগুলো সঠিকভাবে নিয়মমাফিক বিতরণের পরিবর্তে তার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ কালোবাজারে গোপনে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে বলে গুরুতর অভিযোগ ওঠে। এই চাঞ্চল্যকর অনিয়মের বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর স্থানীয় প্রশাসনের টনক নড়ে এবং তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। গত মঙ্গলবার বাইশ সেপ্টেম্বর রাতে সুনির্দিষ্ট গোপন সংবাদের ভিত্তিতে চৌহালী উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাঘুটিয়া ইউনিয়নের সংশ্লিষ্ট চালের গোডাউনে একটি আকস্মিক ঝটিকা অভিযান পরিচালনা করা হয়।
আরও পড়ুন: রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রের হাতে বৃদ্ধা লাঞ্ছিত, এলাকাবাসীর সড়ক অবরোধ
চৌহালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মেহেদী হাসান শাকিল স্বয়ং উপস্থিত থেকে এই ঝটিকা অভিযান পরিচালনা করেন এবং গোডাউনের ভেতরের সামগ্রিক পরিস্থিতি সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। অভিযানে গিয়ে দেখা যায় যে, সরকারি বিধান অনুযায়ী বরাদ্দকৃত মোট ছয়শ বস্তা চালের স্থলে গোডাউনে মাত্র পাঁচশ বিশ বস্তা চাল মজুদ রয়েছে। বাকি আশী বস্তা চাল সেখানে অনুপস্থিত পাওয়া যায়, যা পূর্বে থেকেই কালোবাজারে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছিল বলে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত করা হয়। এই বড় ধরনের চাল চুরির সত্যতা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই উপজেলা প্রশাসন তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ হিসেবে অবশিষ্ট উদ্ধারকৃত সমস্ত চালের বস্তাগুলো সংশ্লিষ্ট গোডাউনে কঠোরভাবে সিলগালা করে দেয়।
গোডাউনে চালের ঘাটতি পাওয়ার পর উদ্ভূত সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে গণমাধ্যমের সামনে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরে চৌহালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মেহেদী হাসান শাকিল তাঁর সুনির্দিষ্ট বক্তব্যে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানান যে, ‘আমরা ৬০০ বস্তা চাল না পেয়ে ৫২০ বস্তা চাল পেয়েছি। প্যানেল চেয়ারম্যান মো. সাইদুর রহমানকে বুধবার ডাকা হয়েছিল। তবে তিনি আসেননি। তিনি পলাতক রয়েছেন। এ ঘটনায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।’ তাঁর এই দায়িত্বশীল ও কঠোর বক্তব্যের মাধ্যমে প্রশাসনের আইনানুগ পদক্ষেপের বিষয়টি স্পষ্টভাবে উন্মোচিত হয়েছে। অভিযুক্ত প্যানেল চেয়ারম্যান আত্মগোপনে থাকায় তাঁর পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো বক্তব্য বা ব্যাখ্যা পাওয়া সম্ভব হয়নি।
এদিকে এই চাঞ্চল্যকর চাল চুরির ঘটনার পর অভিযুক্ত প্যানেল চেয়ারম্যান মো. সাইদুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করার সর্বাত্মক চেষ্টা করা হলেও তাঁর ব্যক্তিগত মুঠোফোন নম্বরটি সম্পূর্ণ বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে গণমাধ্যমের পক্ষ থেকেও তাঁর সুনির্দিষ্ট বক্তব্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। সরকারি ত্রাণসামগ্রী আত্মসাৎকারী এই অসাধু ব্যক্তির বিরুদ্ধে দ্রুত কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন এলাকাবাসী। প্রশাসনের তরফ থেকে জানানো হয়েছে যে, জনগণের হক আত্মসাতের সঙ্গে জড়িত কাউকেই বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না এবং খুব শীঘ্রই আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে আদালতে মামলা দায়ের করা হবে।
সূত্র: উপজেলা প্রশাসন ও নিজস্ব প্রতিনিধি।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।