গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি / দিগন্ত বাংলা নিউজ
বাংলাদেশের বিভিন্ন জনপদে সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং তুচ্ছ কোনো বিষয়কে কেন্দ্র করে সহিংসতা ও হানাহানির ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সামান্য কথা কাটাকাটি বা পূর্ব শত্রুতার জেরে অনেক সময় নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মতো মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে যা পুরো সমাজকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। সম্প্রতি গোপালগঞ্জ জেলার সদর উপজেলায় এমনই একটি হৃদয়বিদারক ও পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা সংঘটিত হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের মনে তীব্র ক্ষোভ ও আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। তুচ্ছ একটি ঘটনার জের ধরে পরিকল্পিতভাবে আক্রমণ চালিয়ে জুবায়ের ভূঁইয়া নামক এক মেধাবী ও তরুণ কলেজছাত্রকে অত্যন্ত নির্মমভাবে পিটিয়ে এবং কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। উচ্চশিক্ষায় অধ্যায়নরত তরতপ্রাণ এক যুবকের এমন আকস্মিক ও নৃশংস মৃত্যুতে পরিবার ও এলাকাবাসীর মাঝে শোকের মাতম চলছে।
আরও পড়ুন: বোয়িং বিমান ক্রয় চুক্তি নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ পোস্ট
ঘটনার বিস্তারিত বিবরণী ও নিহতের স্বজনদের সূত্রে প্রাপ্ত নির্ভরযোগ্য তথ্যানুযায়ী, নিহত ওই কলেজছাত্রের নাম জুবায়ের ভূঁইয়া এবং তাঁর বয়স হয়েছিল তরুণ বয়স। তিনি গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার অধীনস্থ ঐতিহ্যবাহী ঘোড়াদাইড় গ্রামের নিবাসী রমজান ভূঁইয়ার সুযোগ্য সন্তান ছিলেন। শিক্ষাজীবনে অত্যন্ত মেধাবী জুবায়ের গোপালগঞ্জ সরকারি কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সম্মান প্রথম বর্ষের একজন নিয়মিত শিক্ষার্থী হিসেবে অধ্যয়নরত ছিলেন। ভবিষ্যৎ জীবনকে সুন্দর ও সফল করার স্বপ্ন নিয়ে তিনি নিয়মিত কলেজে যাতায়াত করতেন এবং পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু একটি সামান্য পারিবারিক ও সামাজিক বিরোধকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট দ্বন্দ্বের বলি হতে হলো তাঁকে, যা অত্যন্ত মর্মান্তিক।
ঘটনার সূত্রপাত সম্পর্কে জানা যায় যে, গত সোমবার জুবায়েরের আপন ফুফাতো ভাই সিয়ামকে স্থানীয় পার্শ্ববর্তী পুখরিয়া গ্রামের বাসিন্দা হাসিবুল মোল্যার বখাটে ছেলে রিয়াদ মোল্যা কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত ও আহত করে। ছোট শিশুদের বা স্বজনদের মধ্যকার এই তুচ্ছ বিরোধের বিষয়টি জানার পর জুবায়ের এর প্রতিকার চাইতে এবং প্রতিবাদ জানাতে রিয়াদের বাড়িতে যান। সেখানে উভয় পক্ষের মধ্যে একটি সাধারণ বাগবিতণ্ডা ও কথা কাটাকাটি সংঘটিত হয়। স্থানীয় পর্যায়ে এই বিরোধ মীমাংসা হওয়ার কথা থাকলেও মূলত রিয়াদ ও তার সহযোগীরা এই ঘটনাটিকে মনে মনে ক্ষোভ হিসেবে পুষে রাখে এবং পরবর্তীতে বড় ধরনের হামলার পরিকল্পনা গ্রহণ করে।
আরও পড়ুন: কালিয়াকৈরে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে ছাই ২৩ বসতঘর ও ৫ দোকান
নিহতের স্বজনদের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ অনুযায়ী, সেই পুরনো ক্ষোভের জেরে গত বৃহস্পতিবার সকালে যখন জুবায়ের নিয়মিত পড়াশোনার অংশ হিসেবে প্রাইভেট পড়ানো শেষ করে বাড়ির দিকে ফিরছিলেন, তখন ওত পেতে থাকা রিয়াদসহ দশ থেকে বারোজন সন্ত্রাসী তাঁর ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। অত্যন্ত ক্ষিপ্ত হয়ে তারা রাস্তায় তাঁকে এলোপাতাড়ি মারধর করতে শুরু করে। এই মারধরের খবর পেয়ে জুবায়েরের অসহায় বাবা দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যান এবং ছেলেকে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু বখাটে ও হামলাকারীরা এতটাই হিংস্র হয়ে উঠেছিল যে তারা পথিমধ্যে দ্বিতীয় দফায় পুনরায় জুবায়ের ও তাঁর বাবার ওপর অত্যন্ত নৃশংসভাবে চড়াও হয়।
দ্বিতীয় দফার এই বর্বরোচিত হামলায় হামলাকারীরা দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে জুবায়ের ও তাঁর বাবার ওপর চড়াও হয় এবং তাঁদেরকে উপর্যুপরি পিটিয়ে ও কুপিয়ে মারাত্মকভাবে জখম করে। রক্তাক্ত ও পঙ্গু অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়া জুবায়ের এবং তাঁর বাবাকে স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় দ্রুত উদ্ধার করে গোপালগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে জরুরি বিভাগে ভর্তি করার পর চিকিৎসকদের অক্লান্ত চেষ্টার পরও চিকিৎসাধীন অবস্থায় বৃহস্পতিবার দুপুরে জুবায়ের মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। এক তরুণ শিক্ষার্থীর এমন মর্মান্তিক প্রয়াণে হাসপাতালের পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে এবং পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে।
এই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন। এই মর্মান্তিক অপরাধের আইনগত পদক্ষেপ ও সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে গণমাধ্যমের সামনে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরে গোপালগঞ্জ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওসি মো. আমিনুল ইসলাম অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় তাঁর বক্তব্যে জানান যে, কলেজছাত্র জুবায়েরের মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য গোপালগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। কোনো লিখিত অভিযোগ এখনো পাওয়া যায়নি। তবে অভিযুক্তদের ধরতে অভিযান চলছে। পুলিশের পক্ষ থেকে অপরাধীদের গ্রেপ্তারে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
সূত্র: হাসপাতাল ও পুলিশ প্রশাসন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।