নিজস্ব প্রতিবেদন / কামারখন্দ, সিরাজগঞ্জ / দিগন্ত বাংলা নিউজ
বাংলাদেশের গ্রামীণ জনপদের কৃষিকাজে দীর্ঘকাল ধরে প্রথাগত ফসলের চাষাবাদ হয়ে আসলেও বর্তমানে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কৃষকদের মাঝে আধুনিক ও লাভজনক ফসল আবাদের প্রতি ঝোঁক ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সনাতন পদ্ধতির ধান কিংবা অন্যান্য প্রচলিত ফসলের পাশাপাশি উচ্চমূল্যের ও পুষ্টিকর ফলমূল চাষের মাধ্যমে নিজেদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়িয়ে তোলার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে তরুণ প্রজন্মের উদ্যোক্তাদের হাত ধরে। সিরাজগঞ্জ জেলার কামারখন্দ উপজেলার বিভিন্ন অঞ্চলে সাম্প্রতিক সময়ে এই ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যেখানে সাধারণ কৃষকদের পাশাপাশি শিক্ষিত তরুণরা আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তি ব্যবহার করে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করছেন। বিশেষ করে সুস্বাদু ও পুষ্টিকর ফল তরমুজ চাষের প্রতি স্থানীয় চাষি ও তরুণ উদ্যোক্তাদের আগ্রহ দিন দিন আকাশছোঁয়া রূপ ধারণ করেছে, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক নতুন প্রাণচাঞ্চল্য তৈরি করেছে।
আরও পড়ুন: কালিয়াকৈরে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে ছাই ২৩ বসতঘর ও ৫ দোকান
এই সার্বিক পরিবর্তনের একটি চমৎকার ও উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন সিরাজগঞ্জ জেলার কামারখন্দ উপজেলার অধীনস্থ রায়দৌলতপুর ইউনিয়নের এক উদীয়মান তরুণ উদ্যোক্তা, যাঁর নাম রিপন। প্রচলিত ধ্যানধারণা থেকে বেরিয়ে এসে তিনি সম্পূর্ণ আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে ব্যতিক্রমী এক উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। নিজের মালিকাধীন বা লিজ নেওয়া প্রায় চল্লিশ শতাংশ জমিতে তিনি অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে বিগবাইট জাতের তরমুজ চাষাবাদ শুরু করেছেন। ঐতিহ্যগতভাবে এই এলাকার আশপাশের জমিতে কৃষকরা প্রধানত ধান চাষে ব্যস্ত থাকলেও তিনি লাভজনক এই অর্থকরী ফসল উৎপাদনের ঝুঁকি নেন। তাঁর এই সুপরিকল্পিত পদক্ষেপে এই অঞ্চলের কৃষি খাতে এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচিত হয়েছে বলে স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন।
আরও পড়ুন: রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রের হাতে বৃদ্ধা লাঞ্ছিত, এলাকাবাসীর সড়ক অবরোধ
উদ্যোক্তার কর্মপরিকল্পনা ও চাষাবাদের প্রাথমিক প্রস্তুতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করতে গিয়ে জানা যায় যে, তিনি অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে তাঁর ওই নির্দিষ্ট চল্লিশ শতাংশ জমিতে প্রথম ধাপে প্রায় সাতশটি তরমুজের উন্নত জাতের চারা রোপণ করেছিলেন। দীর্ঘ পরিচর্যা ও সঠিক তদারকির ফলে বর্তমানে সেই চারাগুলো পূর্ণাঙ্গ লতায় রূপ নিয়েছে এবং বাম্পার ফলন প্রদর্শন করছে। ইতোমধ্যে তরমুজ চাষের এই পুরো প্রক্রিয়ায় প্রায় ষাট দিন সময় অতিবাহিত হয়ে গেছে এবং প্রতিটি গাছে প্রচুর পরিমাণে ফল ধরেছে। বর্তমান অবস্থা পর্যালোচনা করে তরুণ এই উদ্যোক্তা আশা প্রকাশ করেছেন যে, আর মাত্র এক সপ্তাহ পরেই ক্ষেতের এই তরমুজগুলো পুরোপুরি পরিপক্ব হয়ে উঠবে এবং বাণিজ্যিক বাজারজাতকরণের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত হয়ে যাবে।
ধান বা অন্যান্য সাধারণ ফসলের তুলনায় তরমুজ চাষে অনেক বেশি অর্থনৈতিক লাভের সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন এই তরুণ উদ্যোক্তা। আশপাশের জমিতে অনেকেই প্রচলিত নিয়মে ধান চাষ করলেও তিনি তরমুজ চাষে তুলনামূলক অনেক বেশি মুনাফা অর্জনের আশা দেখছেন। আধুনিক এই চাষপদ্ধতি কেবল তাঁর ব্যক্তিগত ভাগ্য পরিবর্তনেই ভূমিকা রাখছে না, বরং এলাকার অন্যান্য বেকার যুবকদের কাছেও এটি একটি দারুণ অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। সুষম পরিচর্যা, সঠিক সময়ে সেচ প্রদান এবং আধুনিক কৃষি কৌশলের সঠিক প্রয়োগের ফলে তরমুজগুলোর আকার ও মান অত্যন্ত চমৎকার হয়েছে, যা বাজারে ভালো দাম পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখবে।
মাটির সুস্বাস্থ্য রক্ষা এবং নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে তরুণ উদ্যোক্তা রিপন তাঁর চাষাবাদে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। রাসায়নিক সারের অতিরিক্ত ব্যবহার এড়িয়ে তিনি সম্পূর্ণ জৈব সার ও প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করে এই তরমুজ চাষ করছেন। এই বিষয়ে নিজের সুনির্দিষ্ট ভাবনা প্রকাশ করে তরুণ উদ্যোক্তা রিপন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করে বলেন, রাসায়নিক সার ব্যবহারের কারণে আমরা মাটির উর্বরতা অনেকটাই হারিয়ে ফেলেছি। তাই মাটির প্রাণ বাঁচাতে জৈব সারের বিকল্প নেই। তাঁর এই সময়োপযোগী ও পরিবেশবান্ধব দর্শনের ফলে উৎপাদিত তরমুজ যেমন পুষ্টিকর ও নিরাপদ হচ্ছে, তেমনি মাটির প্রাকৃতিক গঠন ও উর্বরতা শক্তিও সুরক্ষিত থাকছে।
পরিবেশ রক্ষা ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার এই মহৎ লক্ষ্যকে সামনে রেখে জৈব সার ব্যবহার করে নিরাপদ তরমুজ উৎপাদনের এই ধারাবাহিকতা আগামীতেও বজায় রাখার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন তিনি। আধুনিক পদ্ধতির সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমে যেমন চমৎকার ফলন নিশ্চিত করা সম্ভব, তেমনি এর মাধ্যমে আশানুরূপ আর্থিক লাভ পাওয়া যাবে বলেও তিনি আশাবাদী। কামারখন্দ উপজেলার রায়দৌলতপুর ইউনিয়নের এই তরুণ উদ্যোক্তার সফল উদ্যোগটি বর্তমানে পুরো এলাকায় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে এবং কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকেও তাঁকে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
সূত্র: নিজস্ব প্রতিবেদন ও কৃষি তথ্য।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।