নিজস্ব প্রতিবেদন / শাহজাদপুর, সিরাজগঞ্জ / দিগন্ত বাংলা নিউজ
বাংলাদেশের ইতিহাসের অত্যন্ত সংবেদনশীল ও আলোড়ন সৃষ্টিকারী জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মামলায় ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। দেশজুড়ে বহুল আলোচিত এই বিচারিক প্রক্রিয়ায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ মামলার অন্যান্য আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ প্রদান করা হয়েছে। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া, সাক্ষ্যপ্রমাণ উপস্থাপন এবং আইনি যুক্তিতর্ক শেষে দেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে এই গুরুত্বপূর্ণ রায়টি প্রদান করা হয়, যা দেশবাসীর দীর্ঘদিনের ন্যায়বিচার প্রাপ্তির অপেক্ষার একটি বড় মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদদের আত্মত্যাগের সঠিক মূল্যায়নের ক্ষেত্রে এই রায় অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন আইনবিশ্লেষকরা。
আরও পড়ুন: সিরাজগঞ্জে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে মানবতার ফেরিওয়ালা মামুন বিশ্বাস
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর বিজ্ঞ চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিশিষ্ট বিচারিক প্যানেল অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে এই মামলার রায় ঘোষণা করেন। নির্ধারিত কর্মদিবসে দুপুর সোয়া ১২টায় আনুষ্ঠানিকভাবে এই চাঞ্চল্যকর মামলার রায় পাঠ করা হয়। বিচারিক প্যানেলের অন্য দুই সম্মানিত সদস্য বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ এবং বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর এই রায়ে পূর্ণ একমত পোষণ করে স্বাক্ষর করেন। এর আগে গত সোমবার এই মামলার রায়ের জন্য আজকের দিনটি অর্থাৎ মঙ্গলবার নির্ধারণ করা হয়েছিল। গত ১৮ আগস্ট তারিখে উভয় পক্ষের আইনজীবীদের বিস্তারিত যুক্তিতর্ক উপস্থাপন পর্ব সফলভাবে সমাপ্ত হওয়ার পর মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ বা সিএভি হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন ট্রাইব্যুনাল। পরবর্তীতে নির্ধারিত সময় অনুযায়ী সব আইনি আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে আজ এই রায় প্রদান করা হলো。
আলোচিত এই মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাটিতে ওবায়দুল কাদের ছাড়াও আরও বেশ কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও সহযোগী সংগঠনের শীর্ষ নেতা অভিযুক্ত হিসেবে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। মামলার প্রধান আসামি ওবায়দুল কাদের ছাড়াও অপর আসামিরা হলেন সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ এবং যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল। এছাড়া ছাত্র সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি সাদ্দাম হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনানও এই মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলিরা এই আসামিদের বিরুদ্ধে আনীত মানবতাবিরোধী অপরাধ ও সহিংসতার সুনির্দিষ্ট অভিযোগগুলো অত্যন্ত সফলভাবে ট্রাইব্যুনালে প্রমাণ করতে সক্ষম হন。
আরও পড়ুন: শাহজাদপুরে জুস খাইয়ে দোকানদারকে অচেতন করে ২ লাখ টাকা লুট
বিচারিক কার্যক্রমের শুরু থেকেই এই মামলার আসামিরা আদালতের মুখোমুখি না হয়ে পলাতক রয়েছেন। মামলার বিবরণী থেকে জানা যায় যে, রায় ঘোষণার সময়ও মামলার সাতজন আসামির সবাই পলাতক অবস্থায় ছিলেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তাদের গ্রেপ্তারের জন্য বিভিন্ন সময় অভিযান চালালেও তাদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। এদিকে রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান প্রসিকিউটর ও তদন্তকারী কর্মকর্তারা শুরু থেকেই আসামিদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তির জোরালো দাবি জানিয়ে আসছিলেন। মামলার যুক্তিতর্ক উপস্থাপনকালে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয় যে, জুলাই গণঅভ্যুত্থান দমনে সংঘটিত নৃশংস হত্যাকাণ্ড ও মানবতাবিরোধী অপরাধের সাথে এসব আসামিরা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। ফলে অপরাধের মাত্রা বিবেচনা করে আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের স্থাবর ও অস্থাবর সমস্ত সম্পত্তি রাষ্ট্রীয় অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করার কঠোর আইনি আদেশ প্রদানের জন্যও ট্রাইব্যুনালের নিকট বিশেষ আবেদন জানানো হয়েছিল。
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচার গুলিবর্ষণ ও দমনপীড়নের মাধ্যমে যে ভয়াবহ মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছিল, আজকের এই রায়ের মাধ্যমে তার একটি আইনি ও দৃষ্টান্তমূলক প্রতিকার অর্জিত হলো বলে মনে করছেন বিচারপ্রার্থী জনগণ ও শহীদ পরিবারের সদস্যরা। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা আশা প্রকাশ করেছেন যে, পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার করে এই আদালতের রায় দ্রুত কার্যকর করার মাধ্যমে সমাজে আইনের শাসন আরও সুদৃঢ় হবে। একই সাথে ভবিষ্যতে ক্ষমতার অপব্যবহার করে কেউ যাতে সাধারণ মানুষের ওপর এমন নির্মম অত্যাচার চালানোর সাহস না পায়, এই রায় তার একটি শক্তিশালী ও ঐতিহাসিক বার্তা হিসেবে কাজ করবে। ট্রাইব্যুনালের এই যুগান্তকারী রায়ের পর দেশজুড়ে সাধারণ মানুষের মাঝে স্বস্তি ও সন্তোষের আবহ বিরাজ করছে এবং বিচার বিভাগের প্রতি জনগণের আস্থা আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে。
সূত্র: আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ও আদালত প্রাঙ্গণ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।