নিজস্ব প্রতিবেদন / শাহজাদপুর, সিরাজগঞ্জ / দিগন্ত বাংলা নিউজ
কিশোরগঞ্জ জেলার পাকুন্দিয়া উপজেলায় মাদকের ভয়াবহ ছোবলে পারিবারিক স্নেহ-মমতার পবিত্র বন্ধন চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে এক রক্তক্ষয়ী ও হৃদয়বিদারক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। নেশার টাকা জোগাড় করতে গর্ভধারিণী মাকে নির্মমভাবে মারধরের সময় বাধা দিতে গিয়ে আপন বড় ভাইয়ের ধারালো ছুরির প্রাণঘাতী আঘাতে ছোট ভাই গেন্দু মিয়া (৩০) নির্মমভাবে নিহত হয়েছেন। শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬) গভীর রাতে উপজেলার এগারসিন্দুর ইউনিয়নের অন্তর্গত চরদেবকান্দি গ্রামে এই মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটে। পারিবারিক পরিমণ্ডলে মাদকের বিস্তার কীভাবে একটি সাজানো সংসারকে মুহূর্তেই ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারে, চরদেবকান্দির এই ঘটনা তারই এক চরম ও লোমহর্ষক দৃষ্টান্ত হিসেবে সমগ্র অঞ্চলে ব্যাপক চাঞ্চল্য ও গভীর বেদনার সৃষ্টি করেছে। রক্তক্ষয়ী এই ঘটনার খবর পেয়ে স্থানীয় থানা পুলিশ দ্রুত তৎপরতা চালিয়ে অভিযুক্ত বড় ভাই হৃদয় মিয়াকে তাৎক্ষণিকভাবে আটক করতে সক্ষম হয়েছে।
আরও পড়ুন: আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের প্রজ্ঞাপন চ্যালেঞ্জের রিট হাইকোর্টে খারিজ
স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী, প্রতিবেশী ও পুলিশ সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যের বরাতে জানা গেছে যে, নিহত গেন্দু মিয়া চরদেবকান্দি গ্রামের স্থায়ী অধিবাসী কালাচান মিয়ার ছেলে ছিলেন। জীবিকার তাগিদে তিনি এলাকায় পেশাগতভাবে ট্র্যাক্টরচালক হিসেবে কাজ করতেন এবং কায়িক পরিশ্রমের মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ নিজের সংসারে জোগান দিতেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তিনি বিগত বেশ কিছুদিন ধরে মারাত্মক ধরনের মাদকাসক্তির অন্ধকার চোরাবালিতে নিমজ্জিত হয়ে পড়েন। উপার্জনের সিংহভাগ অর্থ তিনি নেশার পেছনে উড়িয়ে দিতেন এবং ক্রমাগত অর্থের ঘাটতি দেখা দিলে পরিবারের সদস্যদের ওপর প্রায়ই অমানবিক মানসিক ও শারীরিক নিপীড়ন চালাতেন। বিভিন্ন নিষিদ্ধ মাদকদ্রব্যের নিয়মিত সেবনের ফলে তিনি ধীরে ধীরে নিজের বিবেক-বুদ্ধি হারিয়ে এক ভয়ংকর আগ্রাসী ব্যক্তিত্বে রূপান্তরিত হন, যা প্রতিনিয়ত পুরো পরিবারের স্বাভাবিক শান্তি ও সম্প্রীতি বিনষ্ট করছিল।
ঘটনাক্রমের বিস্তারিত বর্ণনায় জানা যায়, শনিবার রাতে কাজ শেষে বাড়ি ফিরে গেন্দু মিয়া মাদক ক্রয়ের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের দাবিতে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তীব্র বাদানুবাদে লিপ্ত হন। পরিবারের পক্ষ থেকে মাদকের জন্য টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন এবং একপর্যায়ে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে নিজের জন্মদাত্রী মায়ের ওপর চড়াও হন। গর্ভধারিণী মাকে নির্মমভাবে মারধর করতে দেখে বড় ভাই হৃদয় মিয়া তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদে ফেটে পড়েন এবং মাকে রক্ষার জন্য তাৎক্ষণিকভাবে সেখানে ছুটে যান। মাকে মারধরের হাত থেকে উদ্ধার করতে গেলে দুই ভাইয়ের মধ্যে প্রচণ্ড কথা-কাটাকাটি শুরু হয়। মুহূর্তের মধ্যেই সেই বাগ্বিতণ্ডা রূপ নেয় চরম ধস্তাধস্তিতে। ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে উত্তেজনার চরম মুহূর্তে বড় ভাই হৃদয় মিয়া নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন এবং হাতের কাছে থাকা ধারালো ছুরি দিয়ে গেন্দু মিয়ার বুকের ওপর সজোরে আঘাত করেন। ধারালো অস্ত্রের গভীর ক্ষত নিয়ে গেন্দু মিয়া তৎক্ষণাৎ রক্তাক্ত অবস্থায় মাটির ওপর লুটিয়ে পড়েন।
আরও পড়ুন: নবাবগঞ্জে মাদক কারবারিকে আশ্রয় দেওয়ায় স্বেচ্ছাসেবক দল নেতার পদ স্থগিত
রক্তাক্ত গেন্দুর করুণ আর্তনাদ এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের বুকফাটা চিৎকারে প্রতিবেশীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। আশপাশের সচেতন মানুষ তাৎক্ষণিকভাবে রক্তাক্ত গেন্দু মিয়াকে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য নিকটস্থ পাকুন্দিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক আহত যুবকের শরীরে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ লক্ষ্য করে প্রাথমিক শুশ্রূষা প্রদান করেন। তবে তাঁর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটতে থাকায় এবং বুকের ক্ষত অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায় চিকিৎসক তাঁকে কালক্ষেপণ না করে উন্নত চিকিৎসার জন্য কিশোরগঞ্জ শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তরের জোর সুপারিশ করেন। চিকিৎসকদের নির্দেশনা অনুযায়ী স্বজনেরা তাঁকে দ্রুত কিশোরগঞ্জ জেলা সদরের উদ্দেশ্যে নিয়ে রওয়ানা হন, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত হাসপাতালে পৌঁছানোর পূর্বেই পথিমধ্যে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন তিনি। জেলা হাসপাতালে পৌঁছালে সেখানকার কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে মৃত ঘোষণা করেন।
এই অনাকাঙ্ক্ষিত হত্যাকাণ্ডের খবর জানাজানি হওয়ার সাথে সাথেই এলাকায় শোকের পাশাপাশি তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। খবর পেয়ে পাকুন্দিয়া থানা পুলিশের একটি বিশেষ দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে অভিযান চালিয়ে অভিযুক্ত বড় ভাই হৃদয় মিয়াকে আটক করে। এ ঘটনায় পুরো পরিবার ও স্থানীয়দের মাঝে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। যে মাকে বাঁচাতে গিয়ে এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের সূচনা, সেই জননী আজ বাকরুদ্ধ হয়ে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন।
পাকুন্দিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এস এম আরিফুর রহমান বলেন, ‘ঘটনার পরপরই মূল অভিযুক্তকে আটক করা হয়েছে। নিহত গেন্দু মিয়া মাদকাসক্ত ছিলেন বলে জানা গেছে। এ ঘটনায় পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন।’ পুলিশ কর্মকর্তা জানান যে, সুরতহাল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে নিহতের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য জেলা হাসপাতালের মর্গে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এ ঘটনায় আইনানুগ মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
মাদকের মরণনেশা কীভাবে পারিবারিক সম্পর্কগুলোকে বিষাক্ত করে তুলছে, পাকুন্দিয়ার এই নির্মম ঘটনাটি তারই এক স্পষ্ট বার্তা দিয়ে গেল। স্থানীয় অধিবাসীরা মনে করেন, যুবসমাজকে মাদকের হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব না হলে এ ধরনের পারিবারিক ট্র্যাজেডি রোধ করা কঠিন হয়ে পড়বে। তাই সমাজে মাদকবিরোধী ব্যাপক সামাজিক আন্দোলন ও পুলিশি নজরদারি জোরদার করা জরুরি।
সূত্র: পাকুন্দিয়া থানা পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় তথ্য।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।