সিরাজগঞ্জে বিএনপির দুই পক্ষের দফায় দফায় সংঘর্ষ ও বাড়ি ভাঙচুর, আহত ২০

সিরাজগঞ্জে বিএনপির দুই পক্ষের দফায় দফায় সংঘর্ষ ও বাড়ি ভাঙচুর, আহত ২০
ছবি: সংগৃহীত

নিজস্ব প্রতিবেদন / শাহজাদপুর, সিরাজগঞ্জ / দিগন্ত বাংলা নিউজ

উত্তরবঙ্গের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জেলা সিরাজগঞ্জ শহরে রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার এবং অভ্যন্তরীণ কোন্দলকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষের মধ্যে দিনভর দফায় দফায় রক্তক্ষয়ী ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, ব্যাপক ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও ত্রিমুখী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এই আকস্মিক ও সহিংস সংঘর্ষের ফলে শহরের প্রাণকেন্দ্রের বিভিন্ন প্রধান সড়ক ও অলিগলি মুহূর্তের মধ্যে একটি রণক্ষেত্রে পরিণত হয়, যার ফলে সাধারণ পথচারী ও ব্যবসায়ীদের মাঝে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। দুই পক্ষের এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও ইটপাটকেলের আঘাতে উভয় দলের অন্তত ১৫ থেকে ২০ জন নেতাকর্মী গুরুতর আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। এছাড়া সংঘর্ষ চলাকালীন সময়ে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদকের ব্যক্তিগত বাসভবনে অতর্কিত হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করার অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগও পাওয়া গেছে, যা স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে।

আরও পড়ুন: সাঁথিয়ায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে আব্দুল মজিদের ঘরবাড়ি পুড়ে ভস্মীভূত

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে প্রাপ্ত বিস্তারিত বিবরণে জানা যায় যে, গত শুক্রবার ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দে দুপুর বারোটার পর থেকে শুরু হয়ে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা পর্যন্ত শহরের ইলিয়ট ব্রিজ এলাকা, এসএস রোড, মুজিব সড়ক এবং বাহিরগোলা রোডসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে এই ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘাত অব্যাহত থাকে। মূলত যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের একটি বিশেষ অংশ রাজপথে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করলে উত্তেজনা শুরু হয়। মিছিলটি যখন শহরের জনবহুল ইলিয়ট ব্রিজ এলাকায় এসে পৌঁছায়, ঠিক তখনই বিএনপির অপর একটি বিপক্ষ গ্রুপের লোকজন এসে বাধা দেয় এবং উভয় পক্ষের মধ্যে বাকবিতণ্ডার একপর্যায়ে তা রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নেয়। মুহূর্তের মধ্যে এই সংঘর্ষের ঢেউ এসএস রোড ও মুজিব সড়কসহ গোটা শহরের মূল পয়েন্টগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে, ফলে জনজীবন পুরোপুরি থমকে যায়।

পরিস্থিতি যখন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার উপক্রম হয়, তখন সাধারণ মানুষের জানমাল রক্ষার্থে পুলিশ প্রশাসন দ্রুত ঘটনাস্থলে প্রবেশ করে এবং পরিস্থিতি শান্ত করতে বেশ কয়েক রাউন্ড টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে। পরবর্তীতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণে আনতে শহরে অতিরিক্ত পুলিশ ফোর্স মোতায়েন করা হয় এবং দীর্ঘ কয়েক ঘণ্টার প্রচেষ্টার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী উভয় পক্ষকে ছত্রভঙ্গ করে দিতে সক্ষম হয়। স্থানীয় একাধিক নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংবাদ মাধ্যমকে জানান যে, মূলত দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে একক আধিপত্য বিস্তার এবং নেতৃত্ব টিকিয়ে রাখার বিরোধকে কেন্দ্র করে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাইদুর রহমান বাচ্চু ও প্রভাবশালী নেতা হাজী আব্দুস সাত্তারের অনুসারী সমর্থকদের মধ্যেকার অভ্যন্তরীণ দীর্ঘমেয়াদি দ্বন্দ্বের বিস্ফোরণ ঘটেছে এই সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে।

আরও পড়ুন: সিরাজগঞ্জের দুই উপজেলায় তিন রাতে ২০ গরু চুরি, খামারিদের মাঝে চরম আতঙ্ক

সংঘর্ষের এই ঘটনায় বিভিন্ন মহলের পক্ষ থেকে নানান প্রতিক্রিয়া ও পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পাওয়া গেছে। শহর যুবদলের সহসভাপতি সোহান আহমেদ শামীম তার ব্যক্তিগত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস বা পোস্টের মাধ্যমে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে অভিযোগ করেন যে, ‘আমরা যখন ছাত্রলীগ-যুবলীগের বিরুদ্ধে মিছিল করছি, তখনই সাইদুর রহমান বাচ্চু ও ছাত্রদল সভাপতি সবুজের লোকজন আওয়ামী লীগের টাকা খেয়ে আমাদের ওপর হামলা করেছে। ঠিক তখনই আমরা সিরাজগঞ্জের যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের নেতারা দাঁতভাঙা জবাব দেই।’ এই ঘটনার জেরে উত্তপ্ত হয়ে ওঠা পরিস্থিতিতে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাইদুর রহমান বাচ্চুর পুরাতন পোস্ট অফিস রোডের নিজস্ব বাসভবনে সংঘবদ্ধ হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।

নিজের বাসভবনে হামলার শিকার হওয়ার বিষয়ে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাইদুর রহমান বাচ্চু গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমি বগুড়ায় অবস্থান করছি। বিস্তারিত কিছু বলতে পারব না। দুপুরের দিকে আমার বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। হাজি আব্দুস সাত্তারের লোকজন সংঘবদ্ধভাবে ঢুকে শহরে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে।’ তবে তাঁর এই সুনির্দিষ্ট অভিযোগ সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান ও অস্বীকার করে অপর পক্ষের নেতা হাজী আব্দুস সাত্তার নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে বলেন, ‘আমি এই সংঘর্ষের ব্যাপারে কিছুই জানি না।’ শীর্ষ নেতাদের এই পাল্টাপাল্টি অবস্থানের ফলে পুরো ঘটনার আসল রহস্য নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা গুঞ্জন ও চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে।

সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে সিরাজগঞ্জ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রাকিবুল হাসান সংবাদ মাধ্যমকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে জানান যে, ‘কেন কী নিয়ে সংঘর্ষ হয়েছে, সে বিষয়ে বলতে পারব না। তবে সংঘর্ষের পর অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করে উভয়পক্ষকে ছত্রভঙ্গ করে দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।’ পুলিশ প্রশাসন জানিয়েছে যে, ভবিষ্যতে শহরে যাতে এ ধরনের কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা বা সহিংসতার পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সেজন্য শহরের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে গোয়েন্দা নজরদারি ও পুলিশি টহল জোরদার করা হয়েছে। সাধারণ মানুষ এখন চান দ্রুত এই অভ্যন্তরীণ কোন্দলের অবসান ঘটুক এবং শহরে স্থায়ী শান্তি ফিরে আসুক।

সূত্র: স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ প্রশাসন।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন