সিরাজগঞ্জ ডিসি অফিসে নিয়োগ-বদলি বাণিজ্যে লাখ লাখ টাকা লোপাট, কর্মচারীর শাস্তিমূলক বদলি

সিরাজগঞ্জ ডিসি অফিসে নিয়োগ-বদলি বাণিজ্যে লাখ লাখ টাকা লোপাট, কর্মচারীর শাস্তিমূলক বদলি
ছবি: সংগৃহীত

নিজস্ব প্রতিবেদন / শাহজাদপুর, সিরাজগঞ্জ / দিগন্ত বাংলা নিউজ

সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসনের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক কেন্দ্র জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণির সরকারি কর্মচারী নিয়োগ এবং সুবিধাজনক পদে বদলি পাইয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার এক চাঞ্চল্যকর দুর্নীতির তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে। কার্যালয়ের প্রসেস সার্ভার আব্দুল হাকিম এবং অফিস সহকারী এসএম মাহমুদুল হাসানের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি অসাধু সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন চাকরিপ্রত্যাশী ও সাধারণ কর্মচারীদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করেছে বলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘদিনের এই অনৈতিক আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে ভুক্তভোগীদের লিখিত অভিযোগের পর জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রাথমিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। অভিযুক্ত প্রসেস সার্ভার আব্দুল হাকিমকে কাজিপুর উপজেলায় শাস্তিমূলক বদলি করা হয়েছে এবং ঘটনায় জড়িত অপর কর্মচারী এসএম মাহমুদুল হাসানকে দাপ্তরিকভাবে তিরস্কার করা হয়েছে। তবে কেবল বদলি ও তিরস্কারের মতো লঘুদণ্ডে সন্তুষ্ট হতে পারছেন না ভুক্তভোগীরা, বরং আত্মসাৎকৃত অর্থ দ্রুত উদ্ধার এবং দৃষ্টান্তমূলক আইনি বিচার নিশ্চিতের দাবি তুলেছেন সর্বস্বান্ত হওয়া পরিবারগুলো।

আরও পড়ুন: নয়ডা বিমানবন্দরে রাশিয়ার সামরিক বিমানের অবতরণ, ভারতে পুতিনের আগমনের প্রস্তুতি

তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে যে, বিগত ২০১৬ সাল থেকেই সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে এই অনৈতিক নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্যের শক্ত জাল বিস্তার করা হয়। বিশেষ করে মাঠ প্রশাসনের চতুর্থ শ্রেণির বিভিন্ন পদ যেমন অফিস সহায়ক, নিরাপত্তা প্রহরী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও প্রসেস সার্ভার পদে স্থায়ী চাকরি পাইয়ে দেওয়ার ভুয়া আশ্বাস দিয়ে জেলার বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলের অসহায় বেকার যুবক ও তাদের পরিবারের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। একই সাথে জেলা প্রশাসনের অধীনে কর্মরত বিভিন্ন মাঠ পর্যায়ের কর্মচারীদের পছন্দের সুবিধাজনক কর্মস্থলে বদলি করার কথা বলেও বিপুল অঙ্কের উৎকোচ গ্রহণ করে চক্রটি। চাকরির ভুয়া আশ্বাস দিয়ে বছরের পর বছর ভুক্তভোগীদের ঘোরানো হতে থাকে। দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার পরও চাকরি কিংবা বদলি কোনোটিই বাস্তবায়ন না হওয়ায় এবং দফায় দফায় অর্থ ফেরত চেয়ে প্রত্যাখ্যাত হয়ে ভুক্তভোগীরা একপর্যায়ে চরম আর্থিক ও পারিবারিক সংকটে নিপতিত হন।

প্রতারণার শিকার অসহায় পরিবারগুলোর ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেলে সম্প্রতি তারা সমন্বিতভাবে সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসকের নিকট বিস্তারিত তথ্যপ্রমাণসহ আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র দাখিল করেন। বিষয়টি জেলা প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তার দৃষ্টিগোচর হওয়ার পরপরই অভ্যন্তরীণ প্রাথমিক তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়। প্রাথমিক তদন্তে আনীত অভিযোগের সুস্পষ্ট সত্যতা প্রতিভাত হলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযুক্ত প্রসেস সার্ভার আব্দুল হাকিমের বিরুদ্ধে দ্রুততম সময়ে প্রশাসনিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে তাঁকে কাজিপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে তাৎক্ষণিক বদলি করা হয়। পাশাপাশি এই অপকর্মের সহযোগী হিসেবে চিহ্নিত অপর কর্মচারী এসএম মাহমুদুল হাসানকে সরকারি কর্মচারী আচরণ ও শৃঙ্খলা বিধিমালার আওতায় আনুষ্ঠানিক তিরস্কারের আদেশ প্রদান করা হয়। তবে সচেতন মহল ও ভুক্তভোগীদের মতে, সরকারি প্রতিষ্ঠানের মতো সংবেদনশীল স্থানে চাকরির নামে লাখ লাখ টাকা আত্মসাতের মতো গুরুতর অপরাধের প্রেক্ষিতে কেবল প্রশাসনিক বদলি বা মৌখিক তিরস্কার অত্যন্ত অপ্রতুল একটি ব্যবস্থা।

আরও পড়ুন: তৃণমূলে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে নতুন উদ্যোগ, জানালেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী

এদিকে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের পর থেকেই অর্থ লেনদেনে জড়িত কর্মচারীদের ভূমিকা নিয়ে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। ভুক্তভোগীদের দেওয়া তথ্যমতে, দাপ্তরিক ব্যবস্থার পর থেকে অভিযুক্ত আব্দুল হাকিম ও মাহমুদুল হাসান পাওনাদারদের সাথে যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছেন এবং সরাসরি সাক্ষাৎ এড়িয়ে আত্মগোপনের কৌশল বেছে নিয়েছেন। ফলে অর্থ ফেরত না পেয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন পাওনাদাররা। ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা জানান, তাঁদের অনেকেই পৈতৃক জমিজমা বিক্রি করে কিংবা উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে সন্তানদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের আশায় এই কর্মচারীদের হাতে অর্থ তুলে দিয়েছিলেন। এখন একদিকে ঋণের সুদের বোঝা এবং অন্যদিকে আত্মসাৎকৃত অর্থ ফেরত না পাওয়ার অনিশ্চয়তায় পরিবারগুলোর জীবনযাত্রা কার্যত ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এসে উপনীত হয়েছে। বর্তমানে পাওনাদাররা অভিযুক্তদের সন্ধান পেতে বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়াচ্ছেন এবং সর্বস্বান্ত হওয়া এই মানুষগুলো নিজেদের কষ্টের উপার্জিত অর্থ অবিলম্বে ফেরত পেতে সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসকের মানবিক ও কঠোর হস্তক্ষেপ একান্তভাবে কামনা করেছেন।

একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতামূলক প্রশাসনিক ব্যবস্থায় এ জাতীয় কর্মকাণ্ড সামগ্রিক প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদাকে গুরুতরভাবে ক্ষুণ্ণ করে বলে মনে করছেন স্থানীয় সুধীসমাজ। নাগরিক সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ অভিমত প্রকাশ করেছেন যে, কেবল বদলি বা লঘুদণ্ড প্রদান করে এমন স্পর্শকাতর দুর্নীতির রাশ টানা সম্ভব নয়। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি পূর্ণাঙ্গ নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে এই অনৈতিক আর্থিক লেনদেনের নেপথ্যে আরও কোনো প্রভাবশালী মহলের যোগসাজশ আছে কি না, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। মেধা ও সততার ভিত্তিতে নিয়োগ নিশ্চিত করতে এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে নিয়মিত ফৌজদারি মামলা দায়ের করা উচিত। অন্যথায় মেধার ভিত্তিতে চাকরিপ্রত্যাশী সাধারণ তরুণ সমাজ সরকারি ব্যবস্থার ওপর চিরতরে আস্থা হারিয়ে ফেলবে।

সিরাজগঞ্জের সর্বস্তরের সচেতন নাগরিক ও ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর স্পষ্ট দাবি, অবিলম্বে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় মামলা রুজু করে আত্মসাৎকৃত অর্থের সঠিক হিসাব বের করতে হবে এবং অভিযুক্তদের কাছ থেকে সেই অর্থ আদায় করে নিঃস্ব পরিবারগুলোর হাতে ফেরত দেওয়ার কার্যকর পথ নিশ্চিত করতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়মকে কোনো প্রকার প্রশ্রয় না দিয়ে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা হলে ভবিষ্যতে অন্য কেউ সরকারি দপ্তরের সুনাম ব্যবহার করে এমন প্রতারণা করার দুঃসাহস পাবে না। জনআস্থা পুনরুদ্ধার ও প্রশাসনিক শুদ্ধাচার রক্ষায় সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসনের এই ইস্যুতে বলিষ্ঠ ও আপসহীন পদক্ষেপ গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।

সূত্র: সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসন ও ভুক্তভোগী অভিযোগকারী।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন