সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজের ভর্তি ফরমের নমুনা ছবিতে সিগারেট খাওয়া ব্যক্তির ছবি নিয়ে বিতর্ক

সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজের ভর্তি ফরমের নমুনা ছবিতে সিগারেট খাওয়া ব্যক্তির ছবি নিয়ে বিতর্ক
ছবি: সংগৃহীত

নিজস্ব প্রতিবেদন / শাহজাদপুর, সিরাজগঞ্জ / দিগন্ত বাংলা নিউজ

শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হলো সেই পবিত্র আঙিনা, যেখান থেকে একজন শিক্ষার্থী জীবনের প্রকৃত মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও সঠিক জ্ঞান অর্জন করে থাকে। কিন্তু বর্তমান সময়ে আধুনিক প্রযুক্তির যুগে এসেও দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনলাইন ব্যবস্থাপনায় নানা ধরনের অসাবধানতা ও দায়িত্বহীনতার চিত্র প্রায়শই প্রকাশ্যে চলে আসে, যা সচেতন মহলে গভীর উদ্বেগের জন্ম দেয়। দেশজুড়ে যখন বিভিন্ন কলেজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একাদশ শ্রেণীতে ভর্তি কার্যক্রম অত্যন্ত উৎসবমুখর পরিবেশে পরিচালিত হচ্ছে, ঠিক সেই মুহূর্তেই সিরাজগঞ্জ জেলার অন্যতম প্রাচীন ও শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট থেকে প্রকাশিত একটি নমুনা ভর্তি ফরমকে কেন্দ্র করে ব্যাপক চাঞ্চল্য ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো একটি দায়িত্বশীল স্থান থেকে প্রকাশিত নথিতে এ ধরনের আপত্তিকর বিষয় ফুটিয়ে তোলার ফলে সাধারণ শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মাঝে চরম ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে।

আরও পড়ুন: ন্যাম ভবনের ফ্ল্যাট থেকে এমপি নজরুলের ২য় স্ত্রীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার

ঘটনার বিস্তারিত বিবরণে জানা যায় যে, দেশব্যাপী চলমান অনলাইন ভর্তি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজে ভর্তির জন্য নির্বাচিত ও ইচ্ছুক শিক্ষার্থীরা অনলাইনে আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে কলেজে ভর্তি হচ্ছেন। সাধারণ শিক্ষার্থী ও ভর্তিচ্ছুদের সার্বিক সুবিধার্থে এবং ফরম পূরণের সঠিক নিয়ম বুঝিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে কলেজ কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে তাদের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে একটি নমুনা ভর্তি আবেদন ফরম আপলোড করা হয়। কিন্তু গত রবিবার ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ বা ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দের কোনো এক সময় বেলা এগারোটার দিকে যখন কৌতূহলী শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ কলেজটির ওয়েবসাইট ভিজিট করে সেই নমুনা আবেদন ফরমটি ডাউনলোড করেন, তখন সেখানে একটি চরম অদ্ভুত ও অবিশ্বাস্য দৃশ্য দেখতে পান। এই অনাকাঙ্ক্ষিত অসাবধানতা মুহূর্তের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও স্থানীয় মহলে ছড়িয়ে পড়ে।

আরও পড়ুন: সাঁথিয়ায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে আব্দুল মজিদের ঘরবাড়ি পুড়ে ভস্মীভূত

প্রকাশিত সেই নমুনা ফরমটি গভীরভাবে পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে, ফরমের নির্ধারিত স্থানে শিক্ষার্থীর ছবি সংযোজন করার জন্য যে নমুনা বা প্রতীকী ছবিটি ব্যবহার করা হয়েছে, তা অত্যন্ত আপত্তিকর। সেই প্রতীকী ছবির স্থানে ধূমপান বিরোধী সচেতনতার সম্পূর্ণ পরিপন্থী একটি ছবি বসানো হয়েছে, যেখানে স্পষ্টভাবে দেখা যায় যে সিগারেট হাতে দাঁড়িয়ে রয়েছেন এক ব্যক্তি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভর্তি ফরমের মতো একটি জনগুরুত্বপূর্ণ ও প্রাতিষ্ঠানিক নথিতে এ ধরনের একটি ধূমপানযুক্ত বা তামাকজাত দ্রব্য সেবনরত ব্যক্তির প্রতীকী ছবি ব্যবহারের বিষয়টি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না সচেতন নাগরিক সমাজ। দায়িত্বশীল একটি কলেজ প্রশাসনের ওয়েবসাইট থেকে প্রকাশিত নথিতে এমন চরম অবহেলা ও দায়িত্বহীনতার পরিচয় দেওয়ায় বিভিন্ন মহলে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে এবং এর পেছনের প্রকৃত কারণ নিয়ে নানা প্রশ্ন উত্থাপিত হচ্ছে।

এই ন্যাক্কারজনক ও দায়িত্বজ্ঞানহীন ঘটনার বিষয়ে বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও আইনি বিশেষজ্ঞরা অত্যন্ত কঠোর ভাষায় তাদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সচেতন শিক্ষার্থী সাদিয়া আক্তার মিম ঢাকা পোস্টকে দেওয়া তাঁর বক্তব্যে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলেন যে, স্কুল পেরিয়ে আমরা কলেজে লেখাপড়া করি জ্ঞান চর্চার জন্য। সিগারেট খাওয়া জনসম্মوحة নিষিদ্ধ। দায়িত্বশীল জায়গা থেকে শিক্ষকদের এই কাজ সত্যিই আঙুল তোলে। তাঁর এই বক্তব্যের সঙ্গে সুর মিলিয়ে কলেজ স্তরে সদ্য ভর্তি হতে যাওয়া নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী চরম হতাশা প্রকাশ করে ঢাকা পোস্টকে জানান যে, নমুনা আবেদন ফরম বের করে আমি তো একদম অবাক হয়ে গেছি। যে কলেজে ভর্তি হব, সেই কলেজ প্রশাসন এমন কাজ করতে পারে—এটা একদম অবাক করে দিয়েছে। শিক্ষার্থীদের মানসিক গঠনে এ ধরনের বিষয়গুলো অত্যন্ত নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে তারা মনে করছেন।

শিক্ষকতা পেশার সঙ্গে জড়িত অভিজ্ঞ শিক্ষক সমাজও এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। ভদ্রঘাট শামছুন মহসীন উচ্চ বিদ্যালয়ের সম্মানিত সহকারী শিক্ষক মো. ইয়ামিন হোসাইন ঢাকা পোস্টের সঙ্গে আলাপকালে অত্যন্ত ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন যে, স্কুল পেরিয়ে শিক্ষার্থীরা কলেজেও কিন্তু শেখার জন্য যায়। মাদক থেকে দূরে থাকার জন্য আমরা শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করি। কলেজে ভর্তির নমুনা ফরে সিগারেট হাতে থাকা এক ব্যক্তির ছবি দেওয়ার উদ্দেশ্য পরিষ্কার করা উচিত। এটি খুব খারাপ কাজ হয়েছে। তরুণ প্রজন্মের মাঝে মাদকের করাল গ্রাস থেকে দূরে থাকার বার্তা পৌঁছে দেওয়ার পরিবর্তে যদি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ফরমেই এমন ছবি থাকে, তবে তা সমাজকে ভুল বার্তা দেয় বলে তিনি মনে করেন।

আইনি ও সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টির গুরুত্ব তুলে ধরে সিরাজগঞ্জ জেলা জজ আদালতের বিশিষ্ট অ্যাডভোকেট আমিনুল ইসলাম মল্লিক ঢাকা পোস্টকে অত্যন্ত যৌক্তিক ও আইনি ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন যে, সিগারেট জনসম্মوحة খাওয়া এমনি নিষিদ্ধ। সেখানে শিক্ষার্থীদের সিগারেট থেকে নিরুৎসাহিত না করে তো অনেকটা উৎসাহিত করা হচ্ছে। দায়িত্বশীল জায়গা থেকে এটি কাম্য নয়৷ দ্রুত সংশোধন করা উচিত। আইনজীবীর এই বক্তব্যের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, আইনগত ও নৈতিক উভয় দিক থেকেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমন ভুল ক্ষমার অযোগ্য এবং এটি অবিলম্বে সংশোধন করা আবশ্যক।

সার্বিক এই সমালোচনার মুখে সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজের শীর্ষ প্রশাসনের বক্তব্য জানতে চাওয়া হলে কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মুহীদল হাসান ঢাকা পোস্টকে তাঁর প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে জানান যে, আমি তো ফরমটি এখনো দেখিনি। আমি খোঁজ নিচ্ছি। কলেজ অধ্যক্ষের এই বক্তব্যের পর সাধারণ মানুষ ও শিক্ষার্থীরা আশা করছেন যে, কর্তৃপক্ষ দ্রুত বিষয়টি আমলে নিয়ে ওয়েবসাইট থেকে ত্রুটিপূর্ণ নমুনা ফরমটি সরিয়ে ফেলবেন এবং এ ধরনের দায়িত্বহীনতার সঙ্গে জড়িত সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের ভুলের পুনরাবৃত্তি আর কখনো না ঘটে।

সূত্র: সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজ কর্তৃপক্ষ

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন