উপজেলা নির্বাচনে ইসির নতুন আচরণবিধি জারি: পোস্টার ও শোডাউন নিষিদ্ধ

উপজেলা নির্বাচনে ইসির নতুন আচরণবিধি জারি: পোস্টার ও শোডাউন নিষিদ্ধ
ছবি: সংগৃহীত

প্রতিবেদন: আব্দুস ছাত্তার (শামীম) / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ

দেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্তর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনকে সম্পূর্ণ অবাধ, নিরপেক্ষ, সন্ত্রাসমুক্ত ও সুশৃঙ্খল পরিবেশের মধ্যে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে নির্বাচন কমিশন। আসন্ন উপজেলা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ও তাদের অনুসারীদের যথেচ্ছ আচরণ, প্রচারণায় মাত্রাতিরিক্ত অর্থ ব্যয় এবং অনাকাঙ্ক্ষিত বিশৃঙ্খলা রোধ করার স্বার্থে নতুন প্রণীত উপজেলা পরিষদ নির্বাচন আচরণ বিধিমালা ২০২৬ আনুষ্ঠানিকভাবে গেজেট আকারে জারি করা হয়েছে। গত তিন সেপ্টেম্বর নির্বাচন কমিশনের জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ স্বাক্ষরিত একটি বিশেষ সরকারি গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে এই সুনির্দিষ্ট প্রবিধানমালা সারা দেশে কার্যকর করার নির্দেশনা দেওয়া হয়। পূর্বে বলবৎ থাকা আচরণবিধিতে বেশ কিছু যুগোপযোগী পরিবর্তন এনে এই নতুন রূপরেখা সাজানো হয়েছে, যা নির্বাচন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনবে।

আরও পড়ুন: পাবনায় ২৫০০ লিটার ভেজাল দুধ বিনষ্ট: জুই ডেইরি সিলগালা ও ২ লাখ টাকা জরিমানা

ইসি ঘোষিত নতুন প্রবিধানমালার অন্যতম প্রধান ও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হলো প্রচারণার চিরাচরিত মাধ্যম হিসেবে বহুল ব্যবহৃত কাগজের পোস্টারের ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি করা। পরিবেশের সুরক্ষা, শহর ও গ্রামের নান্দনিক রূপ বজায় রাখা এবং প্রার্থীদের অর্থ সাশ্রয়ের কথা বিবেচনা করে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নতুন বিধিমালা অনুযায়ী, নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো প্রার্থী কিংবা তাদের সমর্থক কোনো ধরনের প্রিন্ট করা পোস্টার ব্যবহার বা প্রকাশ্য স্থানে টাঙাতে পারবেন না। একইভাবে বসতবাড়ি, দেয়াল, বৃক্ষরাজি, সীমানা প্রাচীর, বিদ্যুতের খুঁটি, সরকারি কার্যালয়, ব্রীজ, কালভার্ট কিংবা সরকারি কোনো উন্মুক্ত বা সংরক্ষিত অবকাঠামোয় ব্যানার, ফেস্টুন বা প্রচার সামগ্রী সাঁটানো আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে।

জনসাধারণের স্বাভাবিক চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি করা এবং জনসমক্ষে পেশিশক্তির প্রদর্শন বন্ধে মিছিল ও শোডাউনের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশ অনুযায়ী, নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার দিন থেকে শুরু করে ভোটের ফলাফল গেজেট আকারে প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত খোলা জায়গায় কোনো ধরনের রাজনৈতিক মিছিল করা যাবে না। একই সাথে প্রচারের অজুহাতে বাস, ট্রাক, মোটরসাইকেল, নৌযান কিংবা ট্রেনে সমর্থক নিয়ে বহর বা শোভাযাত্রা আয়োজন করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। এছাড়া প্রার্থীদের মধ্যে অসম প্রতিযোগিতা বন্ধে প্রচার কাজে হেলিকাপ্টার ব্যবহারের সুযোগ সম্পূর্ণভাবে রহিত করা হয়েছে।

আরও পড়ুন: ঠাকুরগাঁও সফরকালে বাবাকে নিয়ে ড. শামারুহ মির্জার আবেগঘন বার্তা

প্রথাগত অ্যানালগ প্রচারণা ও পোস্টারিং নিষিদ্ধ করা হলেও প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার চালানোর দরজা উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। তবে এই অনলাইন প্রচারণাকে সুনির্দিষ্ট নজরদারির মধ্যে আনতে প্রার্থীর জন্য তথ্য প্রদানের বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে। কোনো প্রার্থী ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রচারণা চালাতে চাইলে তাকে আগেই কোন কোন চ্যানেল ব্যবহার করা হবে, সেই সংক্রান্ত বিস্তারিত বিবরণ রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে জমা দিতে হবে। শুধু তা-ই নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বুস্টিং বা প্রচারে যে টাকা খরচ করা হবে, তা প্রার্থীর আইনসিদ্ধ মোট নির্বাচনী ব্যয়সীমার হিসাবের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির ক্ষতিকর ব্যবহার রুখতে আচরণবিধিতে নতুন ও সুনির্দিষ্ট অনুচ্ছেদ যুক্ত করা হয়েছে। কোনো প্রার্থী বা তার সমর্থক প্রতিপক্ষের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভুয়া তথ্য, বিকৃত ছবি, কৃত্রিম অডিও-ভিডিও বা বিভ্রান্তিকর কোনো বক্তব্য বানিয়ে ছড়াতে পারবেন না। নিরপেক্ষ নির্বাচনী পরিবেশ বিষাক্ত করে এমন যেকোনো অসত্য কনটেন্ট প্রচার করা গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে। একই সাথে অর্থ, খাদ্যদ্রব্য বা উপহার দিয়ে ভোটারদের প্রভাবিত করার চেষ্টা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

মসজিদ, মন্দির, গির্জাসহ সকল ধর্মীয় উপাসনালয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সরকারি দফতরে কোনো ধরনের নির্বাচনী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা যাবে না। প্রচারণায় ধর্মের অপব্যবহার, পেশিশক্তি প্রদর্শন কিংবা প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত চরিত্রহননকারী কটু মন্তব্য করা নিষিদ্ধ। সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে সরকারি যানবাহন, প্রচারযন্ত্র বা রাষ্ট্রীয় অন্য কোনো সম্পদ ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া সরকারি কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনী প্রচারে অংশ নিতে পারবেন না।

ভোটের দিন শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষায় ভোটারদের কেন্দ্রে আনার জন্য গাড়ি সরবরাহের সুযোগ রাখা হয়নি। এছাড়া ক্যাম্প স্থাপন ও মাইকের ব্যবহারে নির্ধারিত সময়সূচি মানতে হবে। আচরণবিধি অমান্য করলে ইসি তদন্ত সাপেক্ষে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড, ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড প্রদান করতে পারবে। অপরাধ গুরুতর হলে কমিশন তাৎক্ষণিকভাবে প্রার্থীর প্রার্থিতা চূড়ান্তভাবে বাতিল করার ক্ষমতা সংরক্ষণ করবে।

নিউজ এর সূত্র: নির্বাচন কমিশন বাংলাদেশ ও সরকারি গেজেট।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন