পাবনায় ২৫০০ লিটার ভেজাল দুধ বিনষ্ট: জুই ডেইরি সিলগালা ও ২ লাখ টাকা জরিমানা

পাবনায় ২৫০০ লিটার ভেজাল দুধ বিনষ্ট: জুই ডেইরি সিলগালা ও ২ লাখ টাকা জরিমানা
ছবি: সংগৃহীত

প্রতিবেদন: আব্দুস ছাত্তার (শামীম) / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ

পাবনা জেলার সাধারণ নাগরিকদের জনস্বাস্থ্য রক্ষা এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের চক্র ভেঙে দিতে এক বিশাল ও ফলপ্রসূ অভিযান পরিচালনা করেছে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। গত ছয়ই সেপ্টেম্বর রোববার ভোরের আলো ফোটার পরপরই পাবনা জেলা কার্যালয়ের একটি বিশেষ তদারকি দল জেলার সাঁথিয়া উপজেলার নাগডেমড়া এলাকায় অবস্থিত জুই ডেইরি ফার্ম নামের একটি প্রতিষ্ঠানে ঝটিকা অভিযান চালায়। দীর্ঘ দিন ধরে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে অসৎ উপায়ে কৃত্রিম কেমিকেল ও ভেজাল উপাদান মিশিয়ে খাঁটি দুধের নামে বাজারজাত করে আসছিল এই অসাধু চক্রটি। গোপন সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত এই তদারকিমূলক অভিযানে ভেজাল দুধ তৈরির সুবিশাল কারখানার সন্ধান পাওয়ার পাশাপাশি হাজার হাজার লিটার বিষাক্ত মিশ্রিত দুধ এবং রাসায়নিক উপাদানের মজুদ হাতেনাতে জব্দ করতে সক্ষম হন অভিযান পরিচালনাকারী কর্মকর্তারা।

আরও পড়ুন: জাতীয় সংসদে রসিকতার আড়ালে দুটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি সংস্কার তুলে ধরলেন আইনমন্ত্রী

অধিদপ্তরের জেলা দপ্তরের দেওয়া বিবরণ অনুযায়ী, পাবনা জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. মাহমুদ হাসান রনির সার্বিক নেতৃত্ব ও উপস্থিতিতে রোববার সকাল আনুমানিক সাতটার দিকে সাঁথিয়ার নাগডেমড়া এলাকার উক্ত দুগ্ধ খামারটিতে এই তদারকি অভিযান শুরু হয়। তদারকি দল খামারের ভেতরে প্রবেশ করে রাসায়নিক প্রক্রিয়াজাতকরণের বেশ কিছু সন্দেহজনক বৈচিত্র্যময় আলামত দেখতে পান। সরেজমিনে তল্লাশি চালিয়ে তারা দেখতে পান যে, অতি দ্রুত দুধের পরিমাণ ও স্বাভাবিক ঘনত্বের মাত্রা কৃত্রিম উপায়ে বাড়াতে জেলি জাতীয় তরল রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করা হচ্ছিল। এছাড়া পচনশীল তরল দুধকে দীর্ঘ সময় পচনের হাত থেকে রক্ষা করা এবং কৃত্রিমভাবে সতেজ রাখার উদ্দেশ্যে মানবদেহের জন্য চরম ক্ষতিকারক হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড সরাসরি দুধে মেশানোর প্রত্যক্ষ ও অপ্রতিরোধ্য প্রমাণ পান তদারকি দলের প্রতিনিধিরা।

অভিযানকালে ওই খামারের ভেতর থেকে রাসায়নিকভাবে প্রস্তুত করা ভেজাল উপকরণ হিসেবে দুটি পূর্ণাঙ্গ ড্রাম বা ব্যারেল ভর্তি ঘন জেলি এবং প্রায় আড়াই হাজার লিটার বিষাক্ত কেমিকেল মিশ্রিত ভেজাল দুধ উদ্ধার করা হয়। অনতিবিলম্বে এসব ভেজাল ও কেমিকেলযুক্ত দুধ বাজারে বিক্রি হলে বড় ধরনের স্বাস্থ্য বিপর্যয় ঘটবে—এই বিষয়টি অনুধাবন করে উপস্থিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায় সম্পূর্ণ আড়াই হাজার লিটার দুগ্ধ ও কেমিকেলের ড্রামগুলো ঘটনাস্থলেই ধ্বংস ও নিষ্কাশন করা হয়। পরবর্তীতে বেআইনি প্রক্রিয়ায় কৃত্রিম খাদ্যপণ্য উৎপাদন ও বিক্রির অপরাধে ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯-এর ৪২, ৪৩ ও ৪৫ ধারার আওতায় ডেইরি ফার্মের স্বত্বাধিকারী মো. মানিককে নগদ দুই লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। এর পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণার লক্ষ্যে পুরো প্রাঙ্গণটি সিলগালা করে দেওয়া হয়। উক্ত অভিযানে সহায়তায় উপস্থিত ছিলেন জেলা স্যানিটারি ইন্সপেক্টর মো. মাহমুদ আলম এবং সশস্ত্র আনসার ব্যাটালিয়নের একদল সদস্য।

আরও পড়ুন: দেশে মাথাপিছু ঋণ ১ লাখ ২৯ হাজার ২৩৯ টাকা, ৬ ব্যাংকে খেলাপি প্রায় দেড় লাখ কোটি

খাদ্য নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ও অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, হাইড্রোজেনের সংমিশ্রণ ও অস্বাস্থ্যকর উপাদান দিয়ে তৈরি তরল মানবদেহের অভ্যন্তরীণ অঙ্গসমূহের জন্য অত্যন্ত বিপদজনক এক হুমকি। দুগ্ধজাত পণ্য বিশেষত কোমলমতি শিশু ও বৃদ্ধদের দৈনিক পুষ্টির প্রধান উৎস হওয়ায় এতে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড ও কৃত্রিম থিকনারের উপস্থিতি শরীরকে বিষাক্ত করে ফেলে। শিশুরা এই কেমিকেল মিশ্রিত দুধ পান করলে তাদের পরিপাকতন্ত্র, পাকস্থলী ও ক্ষুদ্রান্ত্রে তীব্র প্রদাহের সৃষ্টি হয়। এছাড়া বমি, ডায়রিয়া, লিভার এবং কিডনির ক্রমান্বয়ে স্থায়ী কার্যক্ষমতা হারানোর আশঙ্কা দেখা দেয়। চিকিৎসকরা আরও সতর্ক করেছেন যে, নিয়মিত এসব ক্ষতিকর উপাদান পেটে গেলে শিশুদের স্বাভাবিক দৈহিক বৃদ্ধি ও পুষ্টি শোষণের স্বাভাবিক ক্ষমতা স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যা একটি প্রজন্মের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়।

পরিস্থিতি বিবেচনায় দেশের সর্বস্তরের ক্রেতা ও সাধারণ ভোক্তাদের স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তার স্বার্থে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর থেকে বিশেষ কিছু নির্দেশনা ও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। যেকোনো খোলা বাজার বা অচেনা উৎস থেকে দুগ্ধজাত সামগ্রী কেনাকাটায় বাড়তি সতর্কতা অনুসরণের প্রতি জোর দেওয়া হয়েছে। গৃহস্থালি কাজে ব্যবহারের আগে দুধ সুনির্দিষ্টভাবে ফুটিয়ে নেওয়া এবং তরলের রং, গন্ধ ও কৃত্রিম ঘনত্বের কোনো পার্থক্য পরিলক্ষিত হলে সাথে সাথে ব্যবহার বন্ধ রাখার তাগিদ প্রদান করা হয়। এছাড়া বাজারে অন্য কোনো ভেজাল খাদ্যসামগ্রী প্রস্তুতের খবর পেলে সচেতন নাগরিক হিসেবে সাথে সাথে নিকটস্থ অধিদপ্তর অফিসে অথবা কেন্দ্রীয় টোল ফ্রি হেল্পলাইন ১৬১২১ নম্বরে অভিযোগ জানানোর জন্য উদাত্ত আহ্বান জানানো হয়েছে।

পাবনা জেলার ডেইরি খামারি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকারী ও সকল প্রকার খাদ্য ব্যবসায়ীদের স্পষ্ট ও কঠোর হুশিয়ারি প্রদান করেছে প্রশাসন। খাদ্যে কেমিকেলের অপব্যবহার করা একটি অমার্জনীয় অপরাধ এবং মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার শামিল। আইন ভঙ্গকারী অসাধু চক্রগুলোর বিরুদ্ধে ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইন এবং নিরাপদ খাদ্য আইনের আওতায় অর্থদণ্ড ছাড়াও কারাদণ্ড এবং স্থায়ীভাবে ব্যবসা বাতিলের মতো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে। সাধারণ মানুষের পুষ্টিকর ও নিরাপদ খাদ্য প্রাপ্তি নিশ্চিতের লক্ষ্যে পাবনা জেলার প্রতিটি উপজেলায় ভেজালবিরোধী এ ধরনের সাঁড়াশি অভিযান নিয়মিত ও নিরবচ্ছিন্নভাবে চালিয়ে যাওয়া হবে বলে স্পষ্ট করা হয়েছে।

নিউজ এর সূত্র: পাবনা জেলা কার্যালয়, জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন