প্রতিবেদন: আব্দুস ছাত্তার (শামীম) / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ
জাতীয় সংসদের অধিবেশনে এক আনন্দঘন ও কৌতুকপূর্ণ পরিবেশের সৃষ্টি হয়, যখন দেশের মাননীয় আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান অত্যন্ত চতুরতার সাথে নিজের ব্যক্তিগত জীবনের একটি গল্প তুলে ধরেন। সংসদে বক্তব্য প্রদানকালে তিনি কৌতুক করে বলেন যে তার মাত্র একজনই স্ত্রী এবং তাকে যদি কোনো কারণে তালাক দেওয়া হয়, তবুও আইনের বিধান অনুযায়ী অন্তত ৯০ দিন অপেক্ষা করতে হবে। মন্ত্রীর এই হাস্যরসাত্মক উচ্চারণে উপস্থিত সকল সংসদ সদস্য ও স্পিকারের মধ্যে হাসির রোল পড়ে যায়। তবে এই সুনিপুণ নির্মল হাসির আড়ালে আইনমন্ত্রী মূলত দেশের দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, স্পর্শকাতর ও সামাজিক জীবনে বহুল ব্যবহৃত আইন বিষয়ে নাগরিকদের গুরুত্বপূর্ণ বার্তা প্রদান করেছেন, যা দেশের প্রতিটি সর্বস্তরের সচেতন মানুষের জানা জরুরি।
আরও পড়ুন: সিরাজগঞ্জে আসবাবপত্রের নামে অভিনব প্রতারণা: সাংবাদিকসহ বহু মানুষের লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ
আইনমন্ত্রী তার বক্তব্যের প্রথমভাগে দেশের বিদ্যমান পারিবারিক আইনি কাঠামোর এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ দিক পরিষ্কার তুলে ধরেন। আমাদের সমাজে প্রায়শই একটি ভ্রান্ত ধারণার প্রচলন রয়েছে যে আবেগের বশে বা ক্ষোভের মাথায় মুখে 'তিন তালাক' উচ্চারণ করলেই বৈবাহিক সম্পর্ক স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমাপ্ত হয়ে যায়। কিন্তু মন্ত্রী অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে স্মরণ করিয়ে দেন যে, ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ অনুযায়ী বাংলাদেশে কেবল মুখের কথায় বা তাৎক্ষণিক রাগের মাথায় নেওয়া সিদ্ধান্তে কোনো বিচ্ছেদ আইনিভাবে কার্যকর হয় না। এই আইন অনুযায়ী, যদি কোনো ব্যক্তি তার স্ত্রীকে তালাক প্রদান করতে চান, তবে তাকে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট এলাকার 'আরবিট্রেশন কাউন্সিল' বা আইনগত সালিশি পরিষদে বিধিবদ্ধ লিখিত নোটিশ প্রদান করতে হবে।
নোটিশ জারির পরবর্তী নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার বিষয়ে আইনমন্ত্রী ব্যাখ্যা করে বলেন, সালিশি পরিষদ নোটিশ পাওয়ার পর নব্বই দিনের একটি সংবিধিবদ্ধ বাধ্যবাধকতামূলক সময়সীমা নির্ধারণ করে থাকে। এই ৯০ দিন সময়সীমা নির্ধারণের মূল উদ্দেশ্য হলো দম্পতির মধ্যে কোনো অসন্তোষ বা সংঘাত থাকলে তা আলোচনার মাধ্যমে নিরসন করা এবং ভেঙে যাওয়া সংসার পুনরায় সুসংগঠিত করার সুযোগ রাখা। উক্ত সময়ে সালিশি পরিষদ উভয় পক্ষকে ডেকে এনে বিবাদ মীমাংসার আন্তরিক আইনি চেষ্টা চালায়। যদি ওই নির্দিষ্ট ৯০ দিনের মধ্যে স্বামী-স্ত্রী উভয়ের মধ্যে কোনো প্রকার সমঝোতা না ঘটে, তবেই কেবল নব্বই দিন অতিবাহিত হওয়ার পর আইনত বিচ্ছেদ কার্যকর হবে। ফলে হুট করে মুখে কিছু বললেই বৈবাহিক আইনি ভিত্তি বিনষ্ট হয় না।
আরও পড়ুন: রাজশাহীর তানোরে অতিবৃষ্টিতে মাটির ঘর ধসে গৃহবধূর প্রাণহানি
বক্তব্যের পরবর্তী পর্বে আইনমন্ত্রী জাতীয় সংসদে পাস হওয়া আরেকটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও ঐতিহাসিক বিলে আলোকপাত করেন, যা দেশের প্রবীণ মা-বাবার জীবনের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এক নতুন যুগের সূচনা করেছে। সংসদে গতকাল 'দ্য ট্রান্সফার অব প্রপার্টি অ্যাক্ট' বা সম্পত্তি হস্তান্তর আইন সংশোধন বিল সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে আমাদের সমাজে পরিলক্ষিত হচ্ছিল যে, মা-বাবা তাদের কষ্টার্জিত স্থাবর জমি জমা বা বসতবাড়ি সন্তানের নামে হেবা বা দানপত্র করে দেওয়ার পর অনেক অকৃতজ্ঞ সন্তান বাবা-মাকে বাড়ি থেকে বের করে দিত কিংবা চূড়ান্ত অবহেলা করত। এই অমানবিক প্রথা রোধ করার লক্ষ্যেই আইনটি ইতিবাচকভাবে সংশোধন করা হয়েছে।
সংশোধিত এই আধুনিক আইন অনুযায়ী, কোনো পিতা-মাতা যদি তাদের মালিকানাধীন সম্পত্তি সন্তানের নামে হেবা দলিলের মাধ্যমে হস্তান্তর করেন এবং সেই অনুযায়ী সম্পত্তির নামজারি বা মিউটেশন সম্পূর্ণ সম্পন্নও হয়ে যায়, তবুও সন্তানরা তাদের পিতা-মাতাকে জীবনদ্দশায় সেই সম্পত্তি থেকে উচ্ছেদ করতে পারবে না। আইনে সুনির্দিষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, সন্তানের নামে হস্তান্তর হলেও পিতা-মাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত ওই স্থাবর সম্পত্তিতে বসবাস করার, নিজে ব্যবহার করার এবং তা থেকে যেকোনো সুবিধা ভোগদখল করার পূর্ণ আইনগত সুযোগ তাদেরই থাকবে। এর ফলে সন্তান ইচ্ছা করলেই বৃদ্ধ বয়সে মা-বাবাকে গৃহহীন করতে সক্ষম হবে না।
উক্ত গুরুত্বপূর্ণ বিলটি জাতীয় সংসদে পাসের পূর্বে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা এর কতিপয় বিধান নিয়ে আপত্তি তুলে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেন। তবে বিরোধী দলের এই অসন্তোষ সত্ত্বেও সরকারি দল এটিকে প্রবীণ পিতা-মাতার সামাজিক সুরক্ষা ও অধিকার সুসংরক্ষিত করার এক বৈপ্লবিক উদ্যোগ হিসেবে অভিহিত করেছে। প্রবীণ বয়সে মা-বাবার মৌলিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকারের এই পদক্ষেপ সর্বস্তরে প্রশংসিত হচ্ছে। প্রবীণ জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এই আইনটি একটি যুগান্তকারী মাইলফলক হয়ে থাকবে।
নিউজ এর সূত্র: জাতীয় সংসদ সচিবালয় ও আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।