সিরাজগঞ্জে আসবাবপত্রের নামে অভিনব প্রতারণা: সাংবাদিকসহ বহু মানুষের লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ

সিরাজগঞ্জে আসবাবপত্রের নামে অভিনব প্রতারণা: সাংবাদিকসহ বহু মানুষের লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ
ছবি: সংগৃহীত

প্রতিবেদন: আব্দুস ছাত্তার (শামীম) / শাহজাদপুর / দিগন্ত বাংলা নিউজ

সিরাজগঞ্জ শহরের প্রাণকেন্দ্রে আসবাবপত্র তৈরির আড়ালে গড়ে ওঠা এক চতুর প্রতারণার ফাঁদে পড়ে নিঃস্ব ও চরম হয়রানির শিকার হচ্ছেন সাধারণ নাগরিক থেকে শুরু করে পেশাজীবী মানুষ। শহরের ঐতিহ্যবাহী মিরপুর বিড়লা কুঠির মসজিদ সংলগ্ন এলাকার 'রোকন ফার্নিচার' নামক একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে একের পর এক গ্রাহকের লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। মানুষের অর্জিত বিশ্বাস ও সরলতার সুযোগ নিয়ে গ্রাহকদের কাছ থেকে আসবাবপত্র বানানোর অগ্রিম বায়না বাবদ মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পর নির্দিষ্ট সময়ে পণ্য না দিয়ে ঘোরানো এবং পাওনা টাকা ফেরত চাইলে ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনা ঘটছে। এই বিষয়ে সিরাজগঞ্জ সদর থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়েরের পর স্থানীয় সুশীল সমাজ ও সাধারণ অধিবাসীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

আরও পড়ুন: শনিরআখড়ায় জমি বিরোধে গোলাগুলি: ৯৯৯-এর দ্রুত তৎপরতায় অস্ত্রসহ ১ গ্রেফতার

অভিযোগের বিশদ তথ্য বিবরণী থেকে জানা যায়, পরিচিতির সুবাদে সিরাজগঞ্জের রোকন ফার্নিচারের স্বত্বাধিকারী রোকনের সাথে ভুক্তভোগী সাংবাদিক আশরাফুল ইসলামের সখ্য গড়ে ওঠে। সেই সূত্রে গত চার জুন পরিবারের দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য একটি বুক সেলফ, একটি কাঠের খাট ও একটি পড়ার টেবিল নির্মাণের বিষয়ে দুই পক্ষের মধ্যে সর্বমোট বত্রিশ হাজার টাকার একটি চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী কাজের অগ্রগতির কথা বলে পরের দিন পাঁচ জুন কাঠ ক্রয়ের তাগিদ দেখিয়ে রোকন সাংবাদিকের কাছ থেকে প্রথম দফায় নগদ দশ হাজার টাকা অগ্রিম নেন। পরবর্তীতে গত সাত আগস্ট ফের কাঠ কেনার অজুহাতে আরও দশ হাজার টাকা নেন ওই ফার্নিচার ব্যবসায়ী।

টাকা নেওয়ার সময় মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে তৈরি করা ফার্নিচার ঘরে পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন রোকন। কিন্তু নির্ধারিত মেয়াদ পার হওয়ার পরও পণ্য বুঝিয়ে দেওয়া তো দূরের কথা, কাজের কোনো অগ্রগতিই করা হয়নি। ভুক্তভোগী আশরাফুল ইসলাম জানান, সময় পার হওয়ার পর তিনি একাধিকবার যোগাযোগ করলে রোকন নানা শারীরিক অসুস্থতা ও মিস্ত্রি সংকটের অজুহাত দিয়ে সময়ক্ষেপণ করতে থাকেন। পরবর্তীতে একপর্যায়ে ফার্নিচার বানিয়ে দিতে অপরাগতা প্রকাশ করেন এবং গ্রহীতার কাছ থেকে নেওয়া বিশ হাজার টাকা ফেরত দিতে সরাসরি অস্বীকৃতি জানান।

আরও পড়ুন: ঠাকুরগাঁও সফরকালে বাবাকে নিয়ে ড. শামারুহ মির্জার আবেগঘন বার্তা

গ্রাহক যখন নিজের পাওনা টাকা ফেরত চাওয়ার তাগিদ দেন, তখন অভিযুক্ত ব্যবসায়ী আসলাম উল্টো তাকে বিভিন্নভাবে গালিগালাজ ও প্রাণনাশের ভয়ভীতি প্রদর্শন করেন। সাংবাদিক আশরাফুল ইসলাম জানান, প্রতারক রোকনের এই হুমকি ও প্রতারণামূলক কথাবার্তার সুনির্দিষ্ট অডিও কল রেকর্ড এবং বিভিন্ন প্রমাণাদি তার কাছে সংরক্ষিত রয়েছে। আইনগত তদন্ত প্রক্রিয়ার সুবিধার্থে এবং অপরাধ প্রমাণের স্বার্থে ওই সমস্ত কল রেকর্ড ও তথ্য-প্রমাণাদি ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশের নিকট হস্তান্তরের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কেবল সাংবাদিক আশরাফুল ইসলামই নন, একই ফার্নিচার ব্যবসায়ীর খপ্পরে পড়েছেন সিরাজগঞ্জ পৌর শহরের মিরপুর মহল্লার সম্মানিত শিক্ষক আব্দুল জলিল। তিনি জানান, ঘরের প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র বানানোর কথা বলে রোকন তার কাছ থেকেও নগদ ৩০ হাজার টাকা অগ্রিম নেন। কিন্তু দীর্ঘ দিন অতিবাহিত হলেও তাকে কোনো ফার্নিচার সরবরাহ করা হয়নি এবং পাওনা টাকা ফেরত না দিয়ে তাকেও নানামুখী হয়রানির মুখোমুখি হতে হয়েছে। এই ঘটনায় ভুক্তভোগী শিক্ষক ক্ষোভ প্রকাশ করে দ্রুত বিচার দাবি করেছেন।

স্থানীয় অনুসন্ধানে জানা গেছে, ফার্নিচার ব্যবসার আড়ালে রোকন দীর্ঘদিন ধরে একটি সুসংগঠিত প্রতারণার নেটওয়ার্ক চালু রেখেছেন। এলাকার প্রায় ১৫ থেকে ২০ জন সাধারণ মানুষের কাছ থেকে আসবাব বানিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে বিভিন্ন পরিমাণে নগদ অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। ভুক্তভোগীদের ধারণা অনুযায়ী, প্রায় ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা এভাবে প্রতারণার মাধ্যমে আত্মসাৎ করেছেন অভিযুক্ত রোকন। ভুক্তভোগীরা বলছেন, ফার্নিচার ব্যবসার ছদ্মবেশে চলা এই প্রতারণায় আরও বহু মানুষ আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, যাদের দ্রুত শনাক্ত করা প্রয়োজন।

এ বিষয়ে সিরাজগঞ্জ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রাকিবুল ইসলাম জানান, সাংবাদিক আশরাফুল ইসলামের লিখিত অভিযোগ পেয়ে পুলিশ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তদন্ত করছে। তদন্তে সত্যতা পাওয়া গেলে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এদিকে ঘটনার পর থেকে অভিযুক্ত রোকন তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন বন্ধ করে আত্মগোপনে রয়েছেন।

নিউজ এর সূত্র: সিরাজগঞ্জ সদর থানা ও ভুক্তভোগীদের লিখিত অভিযোগ।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন