হাতীবান্ধা প্রতিনিধি / লালমনিরহাট / দিগন্ত বাংলা নিউজ
চলন্ত বাসে এক নতুন প্রাণের আগমন ঘিরে দেশজুড়ে এক অভূতপূর্ব আবেগ ও আনন্দের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। লালমনিরহাট জেলার হাতীবান্ধা উপজেলায় ঘটা এই ব্যতিক্রমী ও হৃদয়স্পর্শী ঘটনাটি সাধারণ মানুষের নজর কেড়েছে। যাতায়াতকালীন আকস্মিক প্রসববেদনা এবং পরবর্তীতে পরিবহন কর্তৃপক্ষের এমন মানবিক ও উদার উদ্যোগ অনন্য এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। জীবনযাত্রার নানামুখী সংগ্রামের মাঝে এ ধরনের ঘটনা সমাজে পারস্পরিক সহানুভূতি ও ভালোবাসার এক অপূর্ব বার্তা ছড়িয়ে দেয়, যা মুহূর্তের মধ্যে সর্বস্তরের মানুষের হৃদয় স্পর্শ করেছে।
ঘটনার বিস্তারিত বিবরণে জানা যায় যে, সাভারের জিরানী এলাকার একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করেন আবেদা বেগম নামের এক নারী। চিকিৎসকদের দেওয়া সম্ভাব্য প্রসব তারিখের অন্তত কুড়ি দিন বাকি থাকতেই তিনি পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে নিজ গ্রামের বাড়ি লালমনিরহাটের উদ্দেশ্যে বাসে চড়ে রওনা দিয়েছিলেন। দীর্ঘ এই যাত্রাপথে হঠাৎ করেই তার শারীরিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটে এবং তীব্র প্রসববেদনা শুরু হয়। সে সময় ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা ‘আনাস এন্টারপ্রাইজ’ নামক দূরপাল্লার পরিবহনটিতে এই আকস্মিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, যা যাত্রীদের মাঝে চরম উদ্বেগ ও উত্তেজনার জন্ম দিয়েছিল।
ঘটনার সময়কার পরিস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে বাসের সুপারভাইজার মজনু হোসেন সংবাদমাধ্যমকে জানান, “মিঠাপুকুর আসার পর ওই নারীর প্রসববেদনা শুরু হয়। এরপর বাস থেকে পুরুষ যাত্রীদের বাইরে রেখে বাসের দুটি আসনকে সংযুক্ত করে নারী যাত্রীদের সহায়তায় একজন ধাত্রী তার সন্তান প্রসব করান। বিষয়টি বাসের মালিককে জানালে তিনি শিশুটির জন্য উপহার পাঠানোর পাশাপাশি আজীবন বিনা মূল্যে বাসে ভ্রমণের ব্যবস্থা করার কথা জানিয়েছেন।” অত্যন্ত সাহসিকতা ও বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ায় মা ও নবজাতক দুজনেই সুস্থভাবে রক্ষা পান।
নবজাতকের নানা আবেদ আলী সম্পূর্ণ ঘটনাটির স্মৃতিচারণ করে অত্যন্ত আবেগাপ্লুত কণ্ঠে গণমাধ্যমকে জানান, “চিকিৎসক জানিয়েছিলেন, সন্তান প্রসবের আরও ২০ দিন বাকি। এ জন্য মেয়েকে নিয়ে গ্রামের বাড়িতে যাচ্ছিলাম। কিন্তু পথে বাসের মধ্যে সন্তানের জন্ম হয়। মেয়ে ও নাতি দুজনই সুস্থ আছে। বাসে জন্ম হওয়ায় পরিবহনের নামে নাতির নাম আনাস হাসান রেখেছেন। পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়াওয়ায় পরিবহন কোম্পানির প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি আমরা।” পরিবারের এমন বিপদের দিনে পরিবহন কর্মী ও সাধারণ যাত্রীদের সহযোগিতা তাদের চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সন্তানের জন্মদাতা জননী আবেদা বেগম নিজের অনুভূতির কথা প্রকাশ করে জানান, “সব কিছু আল্লাহর ইচ্ছা। কথা ছিল বাবার বাড়িতে সন্তানের জন্ম হবে। তা না হয়ে পথেই হলো। আল্লাহ যা করেন, তার মধ্যে মঙ্গল আছে। সবার কাছে নিজের জন্য ও বাচ্চার জন্য দোয়া চাই।” চলন্ত বাসের মতো একটি অস্বস্তিকর ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতেও অলৌকিকভাবে সুস্থ সন্তান প্রসব করতে পারায় তিনি মহান আল্লাহর প্রতি শুকরিয়া আদায় করেন এবং দেশবাসীর কাছে দোয়া কামনা করেন।
এই বিরল ঘটনার পর গত বুধবার দুপুরে আনাস এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. আতিকুর রহমানের পক্ষ থেকে বিশেষ উপহারসামগ্রী নিয়ে প্রসূতির বাড়িতে হাজির হন সুপারভাইজার মজনু হোসেন। লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার বড়খাতা ইউনিয়নের রমনীগঞ্জ গ্রামে অবস্থিত তাদের বাড়িতে পৌঁছে তিনি শিশুটির জন্য একটি সুন্দর দোলনা, বাচ্চাদের বিছানা, মশারি, সাবান, ক্রিমসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় প্রসাধনীসামগ্রী তুলে দেন। একই সঙ্গে পরিবহন কোম্পানির পক্ষ থেকে ঘোষণা দেওয়া হয় যে, শিশুটি আজীবন এবং শিশুটি বড় না হওয়া পর্যন্ত তার মা আবেদা বেগম ‘আনাস এন্টারপ্রাইজের’ বাসে সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে যাতায়াত করতে পারবেন। ব্যতিক্রমী এই উদ্যোগ এলাকায় ব্যাপক প্রশংসার জন্ম দিয়েছে।
এস.এইচ
আরও পড়ুন: ফেসবুকে আইফোন বিক্রির বিজ্ঞাপন দিয়ে ডেকে নিয়ে পেশ ইমামকে মারধর ও ছিনতাই




একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।