জাতীয় ডেস্ক, দিগন্ত বাংলা নিউজ:
বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি (বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল)-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আসন্ন শাহাদতবার্ষিকী উপলক্ষে দেশব্যাপী ব্যাপক ও বিস্তৃত আকারে ৭ দিনব্যাপী বিশেষ রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। আগামী ২৫ মে থেকে শুরু হয়ে এই ধারাবাহিক কর্মসূচি আগামী ১ জুন পর্যন্ত একযোগে চলমান থাকবে বলে দলের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে। আজ সোমবার (১৮ মে) সকালে রাজধানীর নয়াপল্টনে অবস্থিত বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলের এক গুরুত্বপূর্ণ যৌথ সভা শেষে আয়োজিত জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে এই কর্মসূচির বিস্তারিত রূপরেখা তুলে ধরেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।
নয়াপল্টনে আয়োজিত এই সংবাদ সম্মেলনে দলটির শীর্ষ ও অঙ্গ-সংগঠনের বিভিন্ন স্তরের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। রুহুল কবির রিজভী জানান, দলের নীতিনির্ধারণী ফোরামের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সাবেক রাষ্ট্রপতির শাহাদতবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে এই ৭ দিনব্যাপী কর্মসূচি সাজানো হয়েছে। তবে চলমান মে মাসে এই কর্মসূচির মাঝেই মুসলিম উম্মাহর অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল আজহা বা ঈদ উদযাপিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই ধর্মীয় উৎসবের কারণে মাঠপর্যায়ের রাজনৈতিক কর্মসূচির ধারাবাহিকতায় কিছুটা পরিবর্তন আসতে পারে। রিজভী উল্লেখ করেন, ঈদের আনুষ্ঠানিকতা ও ছুটির কারণে নির্ধারিত ৭ দিনের কর্মসূচির মধ্যে দু-একদিন হয়তো কোনো আলোচনা সভা, গণসংযোগ বা অন্যান্য সাংগঠনিক কার্যক্রমে সাময়িক গ্যাপ বা বিরতি দেওয়া হতে পারে। তবে সামগ্রিকভাবে পুরো সপ্তাহ জুড়ে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে দলটির প্রতিষ্ঠাতা প্রধানকে স্মরণ করা হবে।
প্রতিশ্রুতি পূরণ এবং খাল খনন কর্মসূচির আধুনিক রূপরেখা
সংবাদ সম্মেলনে দেশের বর্তমান সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং দলের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে রুহুল কবির রিজভী বলেন, বিএনপি এবং তার নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার সবসময় জনগণের স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে রাজনীতি পরিচালনা করছে। তিনি দাবি করেন, রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসার আগে এবং নির্বাচনের প্রাক্কালে দেশের সাধারণ মানুষের কাছে যে সব প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা প্রতিটি অক্ষরে অক্ষরে এবং সফলভাবে পূরণ করে যাচ্ছে বর্তমান সরকার। সরকারের এই উন্নয়ন ও জনকল্যাণমুখী কর্মসূচিগুলোর বাস্তবায়ন পরিস্থিতি সশরীরে তদারকি করতে এবং তৃণমূলের মানুষের সাথে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করতে দেশের বিভিন্ন জেলা ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রতিনিয়ত ছুটে বেড়াচ্ছেন শীর্ষ নেতৃত্ব।
সংবাদ সম্মেলনে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী 'খাল খনন কর্মসূচি'র প্রসঙ্গটি নতুন করে সামনে নিয়ে আসেন রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেন, বহুকাল আগে এ দেশের কৃষি ব্যবস্থা ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে এবং দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার লক্ষ্যে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দেশব্যাপী যে গণমুখী খাল খনন বিপ্লবের সূচনা করেছিলেন, বর্তমান সরকার ঠিক সেই পথই অনুসরণ করছে। তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন যে, পিতার সেই ঐতিহাসিক ও দূরদর্শী আদর্শিক পথ ধারণ করে দেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশকে পুনরায় কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনে শতভাগ স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে এবং নদী-নালার নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে দেশব্যাপী আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত খাল খনন কর্মসূচি নিরলসভাবে বাস্তবায়ন করে চলেছেন। এই কর্মসূচির মাধ্যমে দেশের প্রান্তিক কৃষকেরা খরা ও সেচ সংকট থেকে মুক্তি পাচ্ছেন, যা দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে একটি অত্যন্ত ইতিবাচক বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসছে।
আরও পড়ুন: লেবাননে হিজবুল্লাহর ড্রোন হামলায় ইসরায়েলি প্লাটুন কমান্ডার নিহত
রাজনৈতিক প্রতারণার অতীত এবং বর্তমানের রাজনৈতিক সমীকরণ
বিগত বছরগুলোতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বিভিন্ন দল বা একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের ভূমিকা নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেন বিএনপির এই জ্যেষ্ঠ নেতা। রুহুল কবির রিজভী অভিযোগ করে বলেন, অতীতে দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বা একটি বিশেষ রাজনৈতিক দল বারবার দেশের সাধারণ জনগণের সামনে বড় বড় এবং চটকদার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছে, কিন্তু পরবর্তীতে তারা জনগণের সাথে চরম প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। তিনি উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন, অতীতে একটি দল নির্বাচনী ইশতেহারে দেশের মানুষকে মাত্র ১০ টাকা কেজি দরে চাল খাওয়ানোর ঐতিহাসিক প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর তারা সেই অতি সাধারণ ও মৌলিক অঙ্গীকারটি পূরণ করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে, যার ফলে দেশের সাধারণ ও মধ্যবিত্ত মানুষকে তীব্র অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হতে হয়েছিল।
রিজভী আরও বলেন, বর্তমান সরকারের উন্নয়ন ও জনকল্যাণমুখী বিভিন্ন কর্মসূচি দেখে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো নানা ধরণের সমালোচনা, বিদ্রুপ এবং অপপ্রচার চালাচ্ছে। কিন্তু এই সমস্ত নেতিবাচক প্রচারণা ও রাজনৈতিক কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি সত্ত্বেও দেশের সাধারণ ও সচেতন জনগণকে তাদের অবস্থান থেকে বিন্দুমাত্র টলানো বা বিভ্রান্ত করা যাচ্ছে না। এর প্রধান কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, বিরোধীদের পক্ষ থেকে যেকোনো ধরণের মনগড়া অভিযোগ বা অপবাদ তোলার আগেই সরকার মাঠপর্যায়ে সাধারণ মানুষের জন্য কল্যাণমুখী ও দৃশ্যমান কর্মসূচিগুলো সফলভাবে বাস্তবায়ন করে দিচ্ছে। ফলে জনগণের কাছে সরকারের কাজের স্বচ্ছতা ও বিশ্বস্ততা দিন দিন আরও সুদৃঢ় হচ্ছে।
জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রদর্শন এবং খালেদা জিয়ার ঐতিহাসিক লড়াই
সংবাদ সম্মেলনের শেষ অংশে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনকাল এবং দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় তার অবদান অত্যন্ত গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করা হয়। রুহুল কবির রিজভী বলেন, ১৯৭৫ পরবর্তী এক চরম ক্রান্তিকালে শহীদ জিয়াউর রহমান দেশের শাসনভার গ্রহণ করেছিলেন এবং অত্যন্ত স্বল্প সময়ের মধ্যে তিনি দেশের স্বাধীনতা ও জাতীয় সার্বভৌমত্বকে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিকভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী ও সুসংহত করেছিলেন। তৎকালীন সময়ে সমগ্র জাতির মধ্যে যে চরম হতাশা, রাজনৈতিক শূন্যতা ও বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছিল, সেখান থেকে তিনি অত্যন্ত জাদুকরী ও দূরদর্শী নেতৃত্বের মাধ্যমে জাতিকে এক নতুন আশার আলোয় এবং উজ্জ্বল ভবিষ্যতে উদ্ভাসিত করতে পেরেছিলেন। তার হাত ধরেই আধুনিক ও স্বনির্ভর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল।
জিয়াউর রহমানের এই গৌরবময় রাষ্ট্রদর্শনের পথ ধরে পরবর্তীতে দেশের বহুদলীয় গণতন্ত্র ও সংসদীয় শাসন ব্যবস্থা পুনরুজ্জীবিত করার ক্ষেত্রে বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দীর্ঘ আপসহীন সংগ্রামের ইতিহাস তুলে ধরেন রিজভী। তিনি বলেন, স্বৈরাচারী শক্তির কবল থেকে দেশের গণতন্ত্রকে মুক্ত করতে এবং জনগণের ভোটের অধিকার ফিরিয়ে আনতে বেগম খালেদা জিয়া জীবনের প্রতিটি ধাপে বারবার লড়াই করেছেন এবং জেল-জুলুম ও নানা প্রতিকূলতা সহ্য করেছেন। বর্তমান নেতৃত্বও সেই একই গণতান্ত্রিক চেতনা ও দেশপ্রেমের আদর্শ বুকে নিয়ে দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আসন্ন শাহাদতবার্ষিকীর এই ৭ দিনব্যাপী কর্মসূচির মাধ্যমে বিএনপির তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের মাঝে সেই ঐতিহাসিক রাজনৈতিক আদর্শ ও দেশপ্রেমের শক্তি নতুন করে সঞ্চারিত হবে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।
সূত্র: জাতীয় সংবাদ মাধ্যম


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।