জনগণের ওপর নতুন চাপ: গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর তোড়জোড়, বিইআরসি-র গণশুনানিতে বিতরণ কোম্পানিগুলোর নানামুখী প্রস্তাব
অর্থনৈতিক প্রতিবেদক (দিগন্ত বাংলা নিউজ):
দেশের সাধারণ মানুষ যখন নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের ঊর্ধ্বগতিতে হিমশিম খাচ্ছে, ঠিক তখনই ভোক্তা বা খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম নতুন করে বাড়ানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। দেশের বিদ্যুৎ খাতের সার্বিক পরিস্থিতি ও গ্রাহকদের পকেটের ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি করে এই মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাবের ওপর আনুষ্ঠানিক গণশুনানি শুরু করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। দেশের ছয়টি প্রধান বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির দেওয়া পৃথক পৃথক মূল্যবৃদ্ধির আবেদনের ওপর ভিত্তি করে এই গণশুনানির আয়োজন করা হয়েছে।
আজ বৃহস্পতিবার (২১ মে) রাজধানীর ফার্মগেটে অবস্থিত কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) মিলনায়তনে দুই দিনব্যাপী এই গুরুত্বপূর্ণ গণশুনানি শুরু হয়েছে। আমাদের বিশেষ নিউজ পোর্টাল 'দিগন্ত বাংলা নিউজ'-এর অর্থনৈতিক ডেস্কে আসা তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিতরণ কোম্পানিগুলো তাদের লোকসান ও পরিচালন ব্যয় সমন্বয়ের অজুহাতে ৪ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে, যা অনুমোদন পেলে সাধারণ মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বহুগুণ বেড়ে যাবে।
কোন কোম্পানি কত শতাংশ দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে?
বিইআরসি সূত্রে প্রাপ্ত এবং দিগন্ত বাংলা নিউজ-এর অনুসন্ধানে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, দেশের ছয়টি বিতরণ কোম্পানি গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়াতে যে সমস্ত প্রস্তাব জমা দিয়েছে, তার একটি বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো:
- ১. ডিপিডিসি (DPDC): ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ৬ দশমিক ৯৬ শতাংশ বাড়ানোর আবেদন করেছে।
- ২. ডেসকো (DESCO): ঢাকা স্ট্রাকচারাল বা ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেড খুচরা পর্যায়ে সর্বোচ্চ ৯ দশমিক ৬৭ শতাংশ দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে।
- ৩. পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (REB): দেশের সবচেয়ে বড় গ্রাহক নেটওয়ার্ক থাকা আরইবি বা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলো বিদ্যুতের দাম ৫ দশমিক ৯৩ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে।
- ৪. নেসকো (NESCO): নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেড গ্রাহক পর্যায়ে ৪ দশমিক ১২ শতাংশ দাম বাড়ানোর আবেদন জানিয়েছে।
- ৫. ওজোপাডিকো (WZPDCO): ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড সবচেয়ে বেশি অর্থাৎ ১০ দশমিক ১২ শতাংশ পর্যন্ত দাম বাড়ানোর প্রস্তাব পেশ করেছে।
একই সাথে কোম্পানিগুলোর পক্ষ থেকে পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম সমন্বয়ের বিষয়টিও এই খুচরা দামের সাথে যুক্ত করার জোর আবেদন জানানো হয়েছে।
আরও পড়ুন: জামায়াতকে এ দেশের মানুষ কখনো ক্ষমতায় আনবে না: মির্জা ফখরুল
গণশুনানিতে অংশীজনদের উপস্থিতি ও বিইআরসির বক্তব্য
আজ সকাল থেকে শুরু হওয়া এই গণশুনানিতে বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদসহ কমিশনের অন্যান্য উর্ধ্বতন সদস্য ও কারিগরি মূল্যায়ন কমিটির প্রতিনিধিরা উপস্থিত রয়েছেন। এছাড়া শুনানিতে ছয়টি বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তা ও প্রতিনিধিরা নিজেদের প্রস্তাবের সপক্ষে বিভিন্ন যুক্তি ও তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরেন।
অন্যদিকে, সাধারণ গ্রাহকদের পক্ষে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) সহ বিভিন্ন ভোক্তা অধিকার সংগঠনের প্রতিনিধি, ব্যবসায়ী নেতা এবং বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধিরা উপস্থিত থেকে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর এই একতরফা প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করছেন। ভোক্তা অধিকার প্রতিনিধিদের মতে, বিদ্যুৎ খাতের অপচয়, দুর্নীতি এবং রেন্টাল-কুইক রেন্টাল পাওয়ার প্ল্যান্টের ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
দিগন্ত বাংলা নিউজ-এর বিশেষ অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ
দেশে যখন মূল্যস্ফীতি বা ইনফ্লেশন সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে, তখন বিদ্যুতের মতো একটি জরুরি সেবার দাম বাড়ানো হলে তার বহুমুখী নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। বিদ্যুতের দাম বাড়লে কেবল বাসাবাড়ির বিলই বাড়বে না, বরং শিল্পকারখানায় উৎপাদন খরচ বাড়বে, যার ফলে প্রতিটি উৎপাদিত পণ্যের দাম বাজারে আরও এক দফা বৃদ্ধি পাবে।
দাম বাড়ানোর পেছনে বিতরণ কোম্পানিগুলোর অজুহাত
গণশুনানিতে অংশ নিয়ে বিদ্যুৎ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর (যার মধ্যে রয়েছে বিপিডিবি, ডেসকো, ডিপিডিসি, ওজোপাডিকো, নেসকো এবং পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড) প্রতিনিধিরা দাবি করেছেন, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে দাম বাড়ানো ছাড়া তাদের সামনে আর কোনো বিকল্প নেই। তাদের দেওয়া প্রধান কারণগুলো হলো:
- জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি: আন্তর্জাতিক এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে ফার্নেস অয়েল ও ডিজেলসহ বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রাথমিক জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পাওয়া।
- ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন: মার্কিন ডলারের বিপরীতে বাংলাদেশি টাকার মান ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ার কারণে বিদ্যুৎ আমদানির খরচ এবং বিদেশি ঋণের কিস্তি পরিশোধের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে।
- পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি: সিস্টেম লস এবং বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় কোম্পানিগুলো বড় ধরনের ঘাটতির মুখে পড়েছে।
বিতরণ কোম্পানিগুলোর দাবি, এই বিশাল আর্থিক ঘাটতি পূরণ এবং দেশে নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্মত বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হলে খুচরা বা গ্রাহক পর্যায়ে দ্রুত দাম সমন্বয় করা প্রয়োজন।
পিডিবির পাইকারি দামের শুনানির রেশ
এর আগে গতকাল বুধবার (২০ মে) বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড বা পিডিবির (BPDB) প্রস্তাবিত পাইকারি বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর আবেদন নিয়েও একই স্থানে দিনব্যাপী গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়। পিডিবি পাইকারি পর্যায়ে দাম বাড়ানোর যে প্রস্তাব দিয়েছে, তার ওপর ভিত্তি করেই আজ বিতরণ কোম্পানিগুলো খুচরা পর্যায়ে দাম বাড়ানোর এই শুনানিতে অংশ নিয়েছে।
বিইআরসি জানিয়েছে, দুই দিনের এই গণশুনানি শেষে সমস্ত তথ্য-উপাত্ত, কারিগরি কমিটির মূল্যায়ন এবং ভোক্তাদের যুক্তি বিবেচনা করে আগামী ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে বিদ্যুতের নতুন দামের বিষয়ে চূড়ান্ত আদেশ বা রায় ঘোষণা করা হবে।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর এই প্রক্রিয়া দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে একটি বড় ধরনের ধাক্কা দিতে পারে। সাধারণ মানুষ যেখানে লোডশেডিংমুক্ত নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের দাবি জানিয়ে আসছে, সেখানে সেবার মান না বাড়িয়ে বারবার দাম বাড়ানোর এই নীতি নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সরকার ও বিইআরসি শেষ পর্যন্ত বিতরণ কোম্পানিগুলোর চাপে বিদ্যুতের দাম কতটা বাড়ায়, সেটাই এখন দেখার বিষয়। বিদ্যুৎ খাতের এই মেগা গণশুনানির প্রতি মুহূর্তের আপডেট এবং চূড়ান্ত রায়ের খবর সবার আগে প্রফেশনালভাবে জানতে নিয়মিত ভিজিট করুন 'দিগন্ত বাংলা নিউজ'।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।